গত বৃহস্পতিবার বিকালে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার দৌলতপুরের নিকট ঝড়ের কবলে পড়িয়া ডুবিয়া যায় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি মিরাজ-৪। লঞ্চটি ঢাকার সদরঘাট হইতে শরীয়তপুরের সুরেশ্বরের দিকে যাইতেছিল। দীর্ঘ ৪১ ঘন্টা চেষ্টার পর গতকাল সকালে লঞ্চটিকে উদ্ধার করিয়া তীরের কাছাকাছি নিয়া আসা হইয়াছে। ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবরে জানা যায়, এই পর্যন্ত ৫২ জনের লাশ উদ্ধার করা হইয়াছে। তবে এখনও শতাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ রহিয়াছেন বলিয়া কোন কোন মহল হইতে দাবি করা হইয়াছে। বিশেষত লঞ্চটি উদ্ধারের পরও মেঘনা নদীর তীরে খোলা আকাশের নিচে অনেক অপেক্ষমাণ স্বজনের আহাজারি থামিতেছে না। লঞ্চটিকে নদীর তীরে আনিবার পর হঠাত্ করিয়া উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করিবার ঘোষণা দেওয়া হয়। ইহাতে অপেক্ষমাণ ও উত্তেজিত জনতা উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়ে হামলা চালায়। জাহাজটি কাত হইয়া থাকায় এবং আরো লাশ উদ্ধারের সম্ভাবনা থাকায় শেষ পর্যন্ত উপস্থিত জনতার দাবি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে লাশের অনুসন্ধান চালাইয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইয়াছে। প্রত্যেক ব্যক্তি বা লাশের খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত উদ্ধার তত্পরতা বা অনুসন্ধান অব্যাহত রাখাই বাঞ্ছনীয়। ইহার দশদিন আগে পটুয়াখালীর রামনাবাদ নদীতে লঞ্চডুবিতে মারা যায় ১৬ ব্যক্তি।
আলোচ্য লঞ্চডুবির পর মেঘনার তীরে অপেক্ষমাণ ও শোকাভিভূত মানুষের যে ছবি সংবাদপত্র ও টেলিভিশনগুলিতে দেখা গিয়াছে, তাহাতে স্পষ্ট হয় যে, লঞ্চডুবির মত দুর্ঘটনার ক্ষতটি কত বড় ও বেদনাদায়ক! কিছুক্ষণ পরপর একেকটি বীভত্স লাশ উদ্ধার করা হইতেছে আর স্বজনদের কান্নায় ভারি হইয়া উঠিতেছে সেখানকার আকাশ। একই দৃশ্য আমরা প্রতি বত্সরই দেখিতেছি। লঞ্চ বা সড়ক দুর্ঘটনা দেখিতে দেখিতে আজ আমরা যেন শ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছি। প্রতিদিন এই ধরনের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর খবর পাওয়া যাইতেছে, কিন্তু তাহাতে কাহারও টনক নড়িতেছে না। এরূপ দুর্ঘটনা যেন যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। যুদ্ধে যেমন প্রায় প্রতিদিন বড় বড় মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়, তেমনি দুর্ঘটনায়ও প্রত্যহ একাধিক মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হইতেছে। আমাদের প্রশ্ন, এই মৃত্যুর মিছিল থামিবে বা সহনীয় হইবে কখন? তথ্যমতে, এমভি মিরাজ ইহার আগেও দুইবার দুর্ঘটনা কবলিত হয়। লঞ্চটির সলিড ব্যালেস্ট করিবার কথা বলা হইলেও তাহা করা হয় নাই। তাহাছাড়া লঞ্চটির ধারণ ক্ষমতা দিনের বেলায় ২০২ ও রাত্রে ১০২ জন। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় বহন করা হইতেছিল আড়াই শতাধিক যাত্রী। এইসব অনিয়ম যাহাদের দেখিবার কথা, তাহাদের জবাবাদিহিতা আগে নিশ্চিত করিতে না পারিলে এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা যাইবে না। তাই লঞ্চ দুর্ঘটনা রোধে সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ ও তাহা বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
অধিকাংশ লঞ্চডুবির পর উদ্ধার তত্পরতায় দেখা দেয় ধীরগতি। ইহাতে আত্মীয়-স্বজনের অপেক্ষার প্রহর বাড়ে। বাড়ে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ। উদ্ধার তত্পরতায় গতি আসিলে অনেককে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হইতে পারে। এই সংক্রান্ত আমাদের প্রযুক্তি ও উদ্ধারকারী জাহাজের ঘাটতি থাকিলে তাহা দূর করিতে হইবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের উপর কাহারও কোন হাত নাই। কিন্তু জাহাজটি এত সহজে কেন ভারসাম্য হারাইয়া ডুবিয়া গেল তাহা খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। তাহাছাড়া অনেক সময়ে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা পুরাতন নকশার কারণে লঞ্চডুবি হইতে পারে। চালকের অদক্ষতা, অসতর্কতা, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বোঝাই ইত্যাদি কারণেও লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটিতে পারে। এই ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জীবনরক্ষাকারী উপকরণ থাকাও আবশ্যক। সবচাইতে বড় উদ্বেগের বিষয় হইল, এই ধরনের দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হইলেও সেই কমিটির রিপোর্ট অধিকাংশ সময় প্রকাশিত হয় না। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা। এই নেতিবাচক সংস্কৃতি হইতেও আমাদের বাহির হইয়া আসিতে হইবে। নতুবা এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধ বা হ্রাস করা সম্ভব হইবে না। শুধু লঞ্চ মালিক নহে, যাহারা লঞ্চের ফিটনেস সনদপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষের এইক্ষেত্রে কোন ত্রুটি বা অনিয়মের জন্য তাহাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনিতে হইবে। মেঘনায় লঞ্চডুবিতে আমরা শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।
