শব্দ দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক

আপডেট : ১৭ মে ২০১৪, ২২:৩৭
আমাদের চারপাশে হট্টগোল এত বেড়েছে যে বিজ্ঞানীদের অভিমত প্রতি ছয় বছরে হট্টগোল বা নয়েজের মাত্রা দ্বিগুণহারে বাড়ছে, আর এতে আমাদের শ্রবণশক্তি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বিশেষজ্ঞদের মতে- ২০১৫ সালের মধ্যে ১০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে অনেকে স্বাভাবিক শ্রুতিশক্তির অধিকারী থাকবে না। শব্দ প্রতিরোধে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে উঠেছে যার নাম অর্গানাইজেশন ফর ইকনোমিক কো-অপারেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট। সংস্থাটির কাজ হল ইউরোপ ও এশিয়ার ২৬টি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। অবাঞ্ছিত শব্দ প্রতিরোধ ইত্যাদি তাদের কাজের অন্তর্গত। তারা ২৪টি দেশে ২০ বছর সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন সে সব দেশে ইতিমধ্যে মনুষ্যকৃত শব্দ বেড়েছে দ্বিগুণ—এর কারণ মুখ্যত বিমান ও যন্ত্রচালিত যান বৃদ্ধি। এছাড়া একসময় যেখানে গ্রামাঞ্চল ছিল সেখানে নগরায়নের ফলে শব্দের উপদ্রব বেড়েছে। প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, পশু-পাখির সংখ্যা কমছে। শ্রবণশক্তি একটি আশীর্বাদ। দূরের পড়া বাজের শব্দ, ঘন্টাধ্বনি, মাইকের আওয়াজ, পাখির কলতান, বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনা এসব শোনা সম্ভব হয় শ্রবণশক্তির কারণে। ঐতিহাসিকরা বলেন, মানুষের আবির্ভাবের অনেক পূর্বে এ শক্তি প্রাণীদের ছিল। প্রায় ৪০ মিলিয়ন বছর পূর্বে স্তন্যপায়ী সদৃশ সরীসৃপ পেলিকোসার শ্রবণশক্তির অধিকারী ছিল। বয়সের সঙ্গে যদি শ্রবণশক্তির ধার কমে আসে, বৃদ্ধদের কথা শোনাতে জোরে কথা বলতে হয়। একথা সত্যি, এ শক্তিহানির কিছু অংশ ঘটে দৈনন্দিন শব্দ দানব যেভাবে আমাদের কানের উপর অত্যাচার করছে শ্রবণশক্তি হ্রাসের জন্য? এ ব্যাপারে অবশ্য সমীক্ষা করলে বোঝা যেত। অনেক দেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, স্বাভাবিক জনসংখ্যাতে বেশ শ্রবণশক্তিহানি ঘটেছে। শব্দ দূষণ যে মারাত্মক পরিবেশগত সমস্যা, তা বিজ্ঞানীদের স্বীকার্য বিষয়। আমাদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিবেশ এতে বিঘ্নিত হচ্ছে। নয়েজ বা অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ বা হট্টগোল— এর সময়কাল মাপা যায় সময় সংকেতে, পৌনঃপুনিকতা মাপা হয় হার্জ-এ এবং তীব্রতা মাপা হয় ডেসিবেলে। হট্টগোলের প্রকৃতি নানারকম অনবরত হতে পারে, থেমে থেমে হতে পারে অথবা জোর নির্ঘোষে হতে পারে। উঁচু ফ্রিকোয়েন্সি শব্দ নিচু ফ্রিকোয়েন্সি শব্দ অপেক্ষা বেশি বিরক্তিকর। পরিচিত হট্টগোল থেকে অপরিচিত হট্টগোল অধিকতর অপ্রীতিকর। শব্দ দূষণের ফলে যে ক্ষতি হচ্ছে শরীরে, তা মোটামুটি অখণ্ডনীয়। এ হচ্ছে চিন্তার বিষয়। বিজ্ঞানীরা শব্দ দূষণের উত্স খুঁজতে গিয়ে দেখেছেন শিল্প-কারখানা, যানবাহন (আকাশপথ ও স্থলপথ) এবং গোষ্ঠিগত কার্যকলাপ, বিনোদন এবং নির্মাণ কার্যের শব্দ। এছাড়া অবাঞ্ছিত শব্দ কারখানায় শ্রমিকের কার্যক্ষমতা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, হট্টগোলের কারণে যানবাহন দুর্ঘটনা হয়। একজন বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড. সি. হিউজের মতে, অপ্রীতিকর শব্দ অথবা এমনকি অত্যন্ত জোরে প্রীতিকর শব্দ যদি কর্মক্লান্ত দিনের শেষে কাউকে দীর্ঘদিন আহত করে তাহলে তা গুরুতর মানসিক গোলযোগ এমনকি আক্রমণাত্মক আচরণ সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত মদ্যপান, নেশার ওষুধ গ্রহণ, প্রশান্তিদায়ক ও ঘুমের ওষুধ গ্রহণের জন্য হট্টগোল আংশিকভাবে দায়ী। এজন্য অনিদ্রা ও মানসিক ভঙ্গুরতা সৃষ্টি হতে পারে। হট্টগোলের জন্য প্রান্তীয় রক্তবাহগুলোর সংকোচন ঘটতে পারে। হূদরোগ ও উচ্চরক্তচাপ হতে পারে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, হট্টগোলের মধ্যে অনবরত কার্যরত শ্রমিকদের রক্তের কোলস্টেরল বেড়েছে। হট্টগোলের ফলে পেপটিক আলসার, হাঁপানি রোগ এবং একজিমা জাতীয় চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ে। বিজ্ঞানী ডা. ক্রাইটার এবং জন মারির মতে, হট্টগোলের সম্মুখীন হবার মানে হল অতিরিক্ত চাপ বা পীড়নের সম্মুখীন হওয়া। মানবেতর প্রাণীতে দেখা গেছে, হট্টগোল ক্ষুদ্র রক্তবাহগুলোর সংকোচন ঘটে, হরমোন এ ড্রিনালিন উত্সারিত হয়। ৯০ ডেসিবেলের অধিক শব্দ কার্যক্ষমতা হ্রাস করতে সক্ষম। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক দীর্ঘদিন হট্টগোলের মধ্যে থাকলে শ্রুতিশক্তি হানি ঘটতে পারে। আজকাল রাস্তাঘাটে ভারি লরী, যানবাহন বেশি চলছে, রাস্তা চওড়া হয়েছে, শব্দ শোষণের জন্য দু’ধারের গাছপালা সাফ হচ্ছে ফলে শব্দ দূষণ বাড়ছে। রেলস্টেশন এবং এয়ারপোর্টে অবাঞ্ছিত শব্দ বেড়েছে, কারখানায় বেড়েছে হট্টগোল। যেসব স্থান নিঃশব্দ হওয়া উচিত যেমন—হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেগুলো আজকাল কোলাহলমুখর। সর্বত্র যেন হাটবাজার। আমাদের সামাজিক কাজ-কর্ম, বিয়ে, অন্যান্য অনুষ্ঠানে ড্রাম ও মাইকের শব্দে দূষণ কম নয়। রেষ্টুরেন্টে উঁচু ভলিউমে ক্যাসেট বাজালে শব্দ দূষণ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। শব্দ মানুষেরই সৃষ্টি। আর এ শব্দ দানব হয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। দূষিত করছে পরিবেশ। এ থেকে রেহাই পেতে আমাদের নিজেদেরকে অনর্থক হট্টগোল সৃষ্টির পথ থেকে দূরে চলে আসতে হবে। কারণ উত্কট শব্দে আজ আমরা পরিশ্রান্ত। মনে হয় বলি, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য লহ হে নগর’।  লেখক :সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন