গ্রামভিত্তিক এই বাংলাদেশে ‘গ্রাম ডাক্তার’ কথাটির সংগে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। বাংলাদেশে এরা ‘গ্রাম ডাক্তার’ এবং চীনে ‘বেয়ার ফুট ডাক্তার’ নামে পরিচিত। কালের বিবর্তনে গ্রামনির্ভর এই বাংলাদেশের সভ্যতার পাতা থেকে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে বা মুছে গেছে। কিন্তু গ্রাম ডাক্তাররা আজও এই গ্রামীণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বেশ একটা অংশ জুড়ে আছে। কারণটা জানতে হলে একটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ব্যাপক মানবসম্পদের অভাব রয়েছে। যেমন- বর্তমানে আমাদের দেশে প্রতি দশহাজার লোকের জন্য তিনজন ডাক্তার, নয়জন নার্স, চারজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, চারজন কমিউনিটি হেলথ্ ওয়ার্কার রয়েছে (সূত্র:DGHS স্বাস্থ্য বুলেটিন-২০১৩)। এই অপ্রতুলতার কারণে সরকারি সেবা সুবিধা বেশিরভাগ দরিদ্র জনগোষ্ঠির কাছে পৌঁছতে পারে না। অন্যদিকে বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সেবা পেতে মানুষকে বিশেষ করে দরিদ্র জনসাধারণকে তুলনামূলক বেশি ফি, যাতায়াত খরচ ইত্যাদি নানাবিধ বাধার সন্মুুখীন হতে হয়। এসকল নানামুখী জটিলতার কারণে স্বাস্থ্য যে মানুষের মৌলিক অধিকার সেই সুবিধা থেকে গ্রামের দরিদ্র মানুষেরা নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার এই অপ্রতুলতার চাপে গ্রাম ডাক্তাররা তাই দিনে দিনে হয়ে উঠছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মজার বিষয় হলো এই গ্রাম ডাক্তারদের ডাক্তার হবার যাত্রা শুরু হয়েছে কোন ফার্মেসীর শিক্ষানবিশ হিসেবে, কোন ডাক্তার চেম্বারের বা গ্রাম ডাক্তারের সহকারী হিসেবে কাজ করে, ওষুধের দোকানে ওষুধ বিক্রি করে বা পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রে। এদের অনেকেরই পেশাগত প্রশিক্ষণ বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অনেক কম, চিকিত্সা সেবা প্রদানের বৈধ সার্টিফিকেটও নেই। তারপরেও গ্রামীণ সমাজে গ্রাম ডাক্তারদের ব্যাপক চাহিদা ও জনপ্রিয়তার কারণ হলো এদের কাছে মানুষের সহজ প্রবেশাধিকার, বন্ধুত্বসুলভ আচরণ, কম ফি এবং সরকারি সেবা সুবিধার অপ্রতুলতা ও সহজে অংশগ্রহণের অভাব। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাই এসব কম দক্ষতাসম্পন্ন গ্রাম ডাক্তারদের দিয়েও গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইসিডিডিআর,বি বাংলাদেশের সুদূর প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চল চকোরিয়াতে ২০০৭ সাল থেকে গ্রাম ডাক্তারদের নিয়ে এক গবেষণা কাজ শুরু করে। সেখানে পর পর কয়েকটি জরিপ কর্মে দেখা গেছে গ্রাম ডাক্তাররাও বেশি লাভের আশায় প্রেসক্রিপশনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ লিখছে যাতে রোগীর স্বাস্থ্যের ক্ষতির পাশাপাশি টাকা-পয়সারও অপচয় হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তাদের সেবার গুণগত মান এবং চিকিত্সাবিদ্যায় সীমিত জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন আছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে গ্রাম ডাক্তারদের এই অনস্বীকার্য ভূমিকার কারণে আইসিডিডিআর,বি ১২৫ জন গ্রাম ডাক্তারদের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য কর্মশালার মাধ্যমে এক প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব গ্রাম ডাক্তারদের ‘স্বাস্থ্যসেনা’ নামে আখ্যা দেয়া হয় এবং সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব স্বাস্থ্যসেনাদের কার্যকরী ওষুধ ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা এবং একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা যার মাধ্যমে এই গ্রাম ডাক্তারদের সেবার ন্যূনতম মান নিশ্চিত হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ দেবার চর্চারও নিরসন হবে। পাশাপাশি স্থানীয় নেতা, সরকার প্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ‘মনিটরিং কমিটি’ও গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কের সদস্যদের গ্রাম ডাক্তারদের স্বাস্থ্যসেবার মান তদারক করে একপ্রকার দায়বদ্ধতা তৈরি করা হয়। এই প্রচেষ্টার আওতায় এগারটি গুরুত্বপূর্ণ রোগের ভিত্তিতে একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম তৈরি করে পনেরটি সেশনের মাধ্যমে গ্রাম ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যে রোগগুলোর দ্রুত সেবা পেতে গ্রামের মানুষেরা সাধারণত গ্রাম ডাক্তারদের কাছে যায়। প্রশিক্ষণের পরে সার্টিফিকেটপ্রাপ্তির মাধ্যমে তারা স্বাধীনভাবে সেবা করার সুযোগ পায় এবং সমাজের চোখে ভিন্নভাবে মূল্যায়িত হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে গ্রাম ডাক্তাররা গ্রামীণ স্বাস্থ্য সেবায় অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং অবশ্যই তা উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।
লেখক :আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত
