বাসা থেকে রাস্তায় নেমেছি কাছেই বন্ধুর বাসায় আড্ডায় যাব বলে। তেমন একটা মানুষের চলাচল নেই আবার সুনসানও নয়। রাত তখন নয়টা। রাস্তার পাশ ধরে হাঁটছিলাম। বোধহয় একটু আনমনা ছিলাম। না হয় আঁতকে উঠলাম কেন একটু এগুতেই একটা কালো মাইক্রোবাস দেখে! টিনটেড গ্লাসে ঘেরা, ফুটপাতের পাশের দিকটায় দরজা আধা-খোলা অবস্থায় দাঁড়িয়ে। আমি ভাবলাম, ঐ খোলা দরোজার পাশ ঘেঁষে আমি হাঁটব কি না! আমি দাঁড়িয়ে গেলাম, সামনে আর এগুচ্ছি না, বিশেষত ঐ খোলা দরোজার পাশ দিয়ে। একটু কাছে গিয়ে আবারও পিছু হটলাম এবং লাগোয়া বাড়ির গেটের মধ্যে ঢুকলাম। গেটের গ্রিলের ফাঁক দিয়ে মাইক্রোটিকে লক্ষ্য করছিলাম। এই প্রথম একটি টিনটেড গ্লাসে ঘেরা কালো মাইক্রোবাস দেখে আমি ভড়কে গেলাম গা ছম-ছম করা ভয়ে। অবাক হলাম নিজের অবস্থানকে ঘিরে। কারণ, এই আমি জীবনে বহুবার উচ্চারণ করেছি, ‘ভয় কাকে বলে আমি জানি না’। সত্যি বলছি, আমার জীবনে তেমন ভয়-ডর বলতে কিছু নেই সাধারণ বা উচ্চ-সাধারণ ভীতির ক্ষেত্রগুলোতে। দশ বছর বয়সে সাপের লেজ ধরেছি; সেটা যুদ্ধের বছর, অনেক দুষ্টামিতে কেটেছিল সেই নয়টি মাস। ওই বয়সে সবই মজার মনে হয়। কেউ একজন শিখিয়েছিল, পানির ঐ সাপটিতে বিষদাঁত থাকে না। বড়দের সাথে নদী সাঁতরে পার হওয়ার প্রতিযোগিতায় আমিও নেমেছিলাম সেই ছোটবেলায়। নিজের সাহসের ফিরিস্তি না দেই আর।
মাইক্রো বাসটির ভিতরে নজর দেয়ার চেষ্টা করি। দেখি, সামনে পিছনে মিলে চারজন বসে আছে। স্বাস্থ্য খেয়াল করছিলাম, সুঠামদেহী কি না, ছোট করে চুল কাটা কিনা এসব। ড্রাইভার সিটের পাশে, একজন বাইরে দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছিল যেন কেউ একজন পাশ থেকে হেঁটে যেতেই হেঁচকা টানে ভিতরে নিয়ে তুলবে। গাড়ির পিছনটা এসে খুললো সেই ড্রাইভার সিটের লোকটি। তাঁকে দেখে মোটেই ড্রাইভার মনে হচ্ছিল না। হাফ-শার্ট বের করে পরা। কোমরের দিকটা পিছন দিক থেকে উঁচু কিনা তাও খেয়াল করছিলাম। গাড়ির পিছনে কম্বল ও চাদরের মত বেশ কিছু কাপড় দেখতে পেলাম। আমার মনে হচ্ছিল এই মাইক্রোর সবকিছুই ‘সেই কাজ’ উপযোগী। আমার ভিতরে আরও একবার কম্পন অনুভব করলাম। তারপর আবারও ভাবলাম, হতে পারে এটা সেই এসাইনমেন্টের জন্যই এখানে এসেছে, তাতে আমার কি? আমি তো কোনভাবেই সেই প্রোফাইলের নই, তবে আমার আর এত দুশ্চিন্তা কেন!
কোনভাবেই কোন প্রোফাইলের সাথে আমার ম্যাচিং নেই। আমি তো নই কোন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিবিদ। নই কোন দখলদার গ্রুপ বা ব্যবসায়ের অংশীদার বা ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী, চাঁদাবাজ গ্রুপের নেতা বা নেতার বিশেষ সহযোগী। অথবা বিশেষ কোন ব্যক্তি, যার কাছে বিশেষ কোন তত্ত্ব-উপাত্ত আছে যা প্রকাশ পেলে কোন বিশিষ্ট মহলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে! এমন সব ভাবছিলাম। ভাবনায় কি আর তেমন সময় ব্যয় হয় বলুন! আমার লিখতে ও আপনাদের পড়তে যা একটু সময়।
হঠাত্ একটি সালাম আমার বিক্ষিপ্ত চিন্তার পতন ঘটাল। ফ্ল্যাটের একজন সিকিউরিটি গার্ড, সে আমাদের ফ্ল্যাটে ছিল কিছুদিন আগেও। ‘স্যার, কারও জন্য অপেক্ষায় আছেন’ জানতে চাইলে, আমার মুখ থেকে সত্যটা বেরিয়ে গেল। বললাম, ওই মাইক্রোটি দেখ, কেমন যেন লাগছে আমার। বলল, ‘আমি দেখে আসি’।
যাই হোক, আমি বেরিয়ে পড়ি রাস্তায় আমার পথে, সেই ভেবেই যে, আমি কেন হবো? আবার ভাবি, হয়ত আমি নই, তারপরও আমি ফেঁসে যেতে পারি যদি ঘটনাটির সাক্ষী আমি হয়ে যাই কোনভাবে। এই ভেবে রাস্তা পার হই একটু দ্রুতই। যেন বিশেষ কোন তাড়া আছে। পিছন ফিরে তাকাই দু’একবার। সামনেই রাস্তার মোড়, সেখানে গিয়ে আবারও একটু সময় অপেক্ষা করি, লক্ষ্য করি, মাইক্রোটি এখনও ওখানে আছে কি না বা আমার দিকে আসছে না তো!
বন্ধুর বাসায় পৌঁছে খানিকক্ষণ আনমনা ছিলাম বোধহয়। সবার একসাথে প্রশ্ন,“কি রে, এতক্ষণ কি করলি?” শুনে সম্বিত ফিরে পেলাম। মনে হল, এতক্ষণ আমি যেন স্বপ্নের মধ্যে ছিলাম, কোন ঘোরের মধ্যে ছিলাম।
প্রিয় পাঠক, আমাদের চিন্তা-চেতনার ও দুশ্চিন্তার নতুন দিক বিশেষভাবে উন্মোচিত হল। আমাদের আর্থ-সামাজিক কাঠামোতে এটা বড়ই বেমানান। উন্নীত গণতন্ত্রকে হেঁচকা টানে কালো মাইক্রোতে তুলে চোখ বেঁধে, মুখে টেপ লাগিয়ে দিন দিন গহীন অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কারা এবং কেন?
লেখক : কবি ও চিকিত্সক
