[ ব ই আ লো চ না ]

ঘুরে দাঁড়াতে হবে চিন্তা-উদ্দীপক এক গ্রন্থ

আপডেট : ১৮ মে ২০১৪, ২১:৫৭
ঘুরে দাঁড়াতে হবে — মইনুল হোসেন সৈয়দ তোশারফ আলী অনুদিত ও সম্পাদিত (ঢাকা সিটি পাবলিশিং হাউস লিমিটেড ২০১৪), পৃ-১১৮ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মোটাদাগে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উন্নয়নশীল বলা যেতে পারে। কিন্তু বিপরীতে আমাদের রাজনীতি তো আজও অনুন্নত থেকে গেল, এবং যার নানামাত্রিক সূচকভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা আছে প্রবন্ধগুলোতে। আর এখানেই লেখকের পারঙ্গমতা স্বীকৃত হওয়া উচিত। রাজনীতি যদি উন্নয়নশীল/ উন্নত হতো তাহলে অর্থনীতিও যথার্থ উন্নয়নশীল বা উন্নত হতো চিন্তা- উদ্দীপক শিরোনামের এই সংকলনে গ্রন্থিত আছে আঠাশটি প্রবন্ধ। বলা বাহুল্য, প্রবন্ধগুলো বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির চালচিত্র সম্পর্কিত। লেখক ব্যারিস্টার মইনুল পেশাদার রাজনীতিক নন; কিন্তু পারিবারিক সূত্রে এবং স্বকীয় চেতনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি রাজনীতি সচেতন এবং রাজনীতির অন্তর্ভেদী পর্যবেক্ষকও বটেন। এমন পর্যবেক্ষণের ফসল সংকলিত প্রবন্ধসমূহ। প্রবন্ধসমূহে বর্ণিত আছে আমাদের অনুন্নত ও গোষ্ঠীস্বার্থ উপযোগী, কিন্তু জনস্বার্থ উদ্ধারে অনীহ রাজনীতির বয়ান। আমাদের রাজনীতি নিয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত অনিবার্য হয় প্রবন্ধগুলোর পাঠ ও অনুধ্যান থেকে। একজন নিষ্ঠ পাঠক সংকলনটি পাঠ করে আমাদের চলমান রাজনীতির নেতিবাচক মর্মার্থ নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবেন। একই সমান্তরালে তিনি ভাববেন রাজনীতি ও অর্থনীতির অসঙ্গতিপূর্ণ আন্তঃসম্পর্কের গোড়ার কথা, অবশ্য বাংলাদেশে অনালোচিত। বিষয়টি একটু তাত্ত্বিক হলেও সোজাসাপটা এবং সরলরৈখিক কিছু বলা যায়। অর্থনেতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ অভিমত অনুযায়ী একটি উন্নয়নশীল দেশ; কিন্তু যা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। কারণ প্রগতি (growth) ও উন্নয়ন (development) সমার্থক নয়। সমতাভিত্তিক প্রগতি (growth with equity) উন্নয়ন, শুধু প্রগতি নয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতি হয়েছে, কিন্তু যাতে সমতার উপাদান হাজির নেই। তবুও যাহোক, মোটাদাগে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উন্নয়নশীল বলা যেতে পারে। কিন্তু বিপরীতে আমাদের রাজনীতি তো আজও অনুন্নত থেকে গেল, এবং যার নানামাত্রিক সূচকভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা আছে প্রবন্ধগুলোতে। আর এখানেই লেখকের পারঙ্গমতা স্বীকৃত হওয়া উচিত। রাজনীতি যদি উন্নয়নশীল, উন্নত হতো তাহলে অর্থনীতিও যথার্থ উন্নয়নশীল বা উন্নত হতো। সুতরাং রাজনীতির উন্নয়নশীলতা অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিবেচ্য হবার দাবিদার। কিন্তু প্রবন্ধগুলো পাঠ পাঠককে আমাদের অনুন্নত, এমনকি অসুস্থ রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন করে। এমন রাজনীতি সংক্রান্ত লেখকের কিছু দৃষ্টি-আকর্ষণী মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। যেমন ‘সরকার যেখানে গণতন্ত্র চর্চা করে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে ধৈর্যশীল আচরণ করে এবং সমঝোতার মনোভাব দেখায়, সেখানে হিংসার রাজনীতি স্থায়ী হতে পারে না। হিংসাকে ধরে রাখতে হলে ব্যাপকভিত্তিক অনন্দ ক্রোধ ও তিক্ত অনুভূতি থাকা চাই। কিন্তু যেখানে দুর্নীতি চালু রাখতে গিয়ে দুর্নীতি রক্ষার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়, পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করতে হয়, সেখানে তো গণতন্ত্র অচল হতে বাধ্য।’ (পৃ-৯) বা ‘ব্যর্থ রাজনীতির বিপদ থেকে অচিরে মুক্তি না পেলে আমাদের পক্ষে সুন্দরতর ও নিরাপদ ভবিষ্যত্ নির্মাণ করা সম্ভব হবে না। অক্ষম নেতৃত্ব সহিংসতার তাণ্ডব বিস্তারেই সক্ষম। দেশটির ঘুরে দাঁড়ানোর কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।’ (পৃ-১৭) বা ‘আমাদের রাজনীতির বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক এবং যা সুবিবেচনাপ্রসূত তাকে অবজ্ঞা করা।’ (পৃ-৩৯) অবশ্য লেখক শুধু তীর্যক ও নেতিমূলক বয়ানের মধ্যেই সীমিত থাকেননি; শেষ প্রবন্ধে ব্যর্থ ও গণবিরোধী রাজনীতির অচলায়তন অতিক্রম করার লক্ষ্যে আট দফা সুপারিশ করেছেন, যা রাজনীতিবিদের প্রণিধানযোগ্য। বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল নানামাত্রিক ও সার্বিক মুক্তির জন্য। কিন্তু এমন মুক্তি যে অনর্জিত তার প্রমাণ বিরাজমান রাজনীতির বাস্তবতা ও সংকলিত প্রবন্ধগুলো। লেখক:অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন