ইতিহাসের অংশ সিমিওনেও

আপডেট : ১৮ মে ২০১৪, ২২:৫৩
মাঠের ধারে কালো পোশাকেও কেতাদুরস্ত তিনি। মৌসুম জুড়ে ইউরোপের কোচদের মধ্যে তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা। শনিবার রাতে বার্সেলোনার মাঠে স্পানিশ লিগ জয়ের পর তো এখন আর্জেন্টিনাও অ্যাটলেটিকোর কিংবদন্তি খেলোয়াড় দিয়েগো সিমিওনি তার কোচের ক্যারিয়ারটিকেও আরো বর্ণাঢ্য করেই তুললেন। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের এই কোচ বার্সেলোনাকে তাদের মাঠে শিরোপাবঞ্চিত করার পর জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে পুরো ব্যাপারটাকে বললেন, ‘পিওর হিস্টোরিক’। সিমিওনে এক বাক্যেই তুলে ধরলেন তার দলের অর্জনকে। তবে লা লিগায় রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার একাধিপত্য ভেঙ্গে চলতি মৌসুমে ঘরোয়া থেকে মহাদেশীয় টুর্নামেন্টগুলোতে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পর, কেবল স্পানিশ ক্লাবটির নয়; ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন সিমিওনিও। কোচের ভূমিকায় নামার আগে খেলোয়াড় হিসেবেই তিনি কিংবদন্তি। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে কোপা আমেরিকা জিতেছেন, ১৯৯৪ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপে খেলেছেন আর্জেন্টিনার হয়ে। এমনকি জাতীয় দলের হয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডটিও ছিল একসময়ে তার। অমন ঝকঝকে অতীতের মানুষটিই মাঠের ধারে কখনো হাসছেন, কখনো চিত্কার করছেন আবার কখনোও তীব্র তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছেন সহকারি রেফারির সঙ্গে, কোচ সিমিওনের কথা বললে ভেসে উঠে এমনটাই। মাত্র বছর তিনেক আগে অ্যাটলেটিকোর কোচ হিসাবে জর্জিও মানজানোর স্থলাভিষিক্ত হওয়া এই আর্জেন্টাইনের জাদুর পরশে হঠাত্ করেই রিয়াল-বার্সেলোনার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে উঠে আসে অ্যাটলেটিকো। ক্লাবের হয়ে নিজের প্রথম মৌসুমেই ইউরোপা কাপের অল স্প্যানিশ ফাইনালে অ্যাথলেটিক বিলবাওকে হারিয়ে জিতে নেন কোচ হিসাবে নিজের প্রথম ইউরোপিয়ান ট্রফি। এরপর চেলসিকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে দলকে জেতান উয়েফা সুপার কাপও। কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার র্যাদামেল ফ্যালকাওয়ের সঙ্গে তার দুর্দান্ত রসায়নের ফল নগর প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়ালকে হারিয়ে ঘরোয়া টুর্নামেন্ট কোপা দেল রে জয়। রিয়াল-বার্সেলোনার পরেই তৃতীয় স্থানে থেকে পেছনে থেকে ওই মৌসুমে লিগ শেষ করে সিমিওনের দল। আগের মৌসুমটা যেখানে শেষ করেছিলেন ঠিক সেখান থেকেই নতুনটি শুরু করেন সিমিওনে। খেলোয়াড় হিসাবে অ্যাটলেটিকোতে দারুণ কিছু সময় কাটিয়ে যাওয়া ও ১০৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এই তারকা মৌসুমের শুরুতেই জানিয়ে দেন নিজের লক্ষ্যের কথা। লিগে অ্যাটলেটিকোর আঠার বছরের শিরোপা খরা ঘোচানোর পাশাপাশি ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের জন্যও লড়াইয়ের ঘোষণা দেন তিনি। তখন সিমিওনের এই ঘোষণাকে কেউ কৌতুক বলে উড়িয়ে দিলেও, সেই ধারণা ভেঙ্গে যেতে খুব বেশি সময় নেননি তিনি। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই লা লিগা পয়েন্ট টেবিলে একক অগ্রগামীতা অর্জন করে অ্যাটলেটিকো। এরপর সময় গড়ানোর সাথে বাড়তে থাকে ব্যবধান। শেষ দিকে এসে মালাগার বিরুদ্ধে নিজেদের মাঠে হারে কিছুটা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হলেও শিষ্যদের উপরে পরিপূর্ণ আস্থা ছিল বলেই জানালেন সিমিওনে। যেমনটা ছিল বার্সেলোনার বিরুদ্ধে সর্বশেষ ম্যাচেও। এক গোলে পিছিয়ে থেকেও মোটেই চিন্তিত ছিলেন না জানিয়ে সিমিওনে বলেন, ‘চ্যালেঞ্জটা যত বড়, পারফরম্যান্স ততই ভালো। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা এমনই। দুর্দান্ত একটা মৌসুম ছিল এটা।’ কোচিং স্টাফদের সবাইকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়ে সিমিওনে কথা বলেছেন তার কৌশল নিয়েও। চেলসির বিরুদ্ধে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালের আগে অদ্ভুত এক কৌশলের কথা বলে প্রায় চমকেই দিয়েছিলেন অনেককে। বলেছিলেন, ‘আমরা চাই চেলসির খেলোয়াড়রা আমাদের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে আক্রমণে যাক। কারণ তাহলেই আমরা পাল্টা আক্রমণের সুযোগ পাব।’ প্রায় এক দশক পর রিয়াল-বার্সা বাদে প্রথম অন্য কোন দলের শিরোপা জয়ের পর আবারো বললেন সেই পুরনো কথাই, ‘জেতার কৌশল কেবল একটি নয়। অন্য সবার কৌশলের সাথে হয়তো মিল নেই, কিন্তু তার কৌশলে খেলেও শিরোপা জেতা সম্ভব। দিয়েগো ম্যারাডোনাকে টপকে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়ে সিমিওনে বলেছিলেন, ‘আমি সত্যিই লজ্জিত’। ম্যারাডোনাকে ব্যতিক্রমী উপায়ে সম্মান জানানো সিমিওনে এদিন বললেন, ‘আমাদের এই জয় সবার জন্য বিশেষ কিছু। কারণ এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো আপনি জেতার জন্য ভিন্ন কোন উপায়েও খেলতে পারেন। এটা আসলে নির্ভর করছে আপনার খেলোয়াড়দের চরিত্র কেমন তার উপরে। তারাই ঠিক করে দেবে আপনি কিভাবে খেলবেন। মাদ্রিদ কিংবা বার্সেলোনার চাইতে ভিন্ন একটা পদ্ধতিতে খেলেই আমরা জিতেছি।’ আক্রমণ-রক্ষণের অদ্ভুত এক সমন্বয়ে প্রায় তারকাহীন এক দল নিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের পাশাপাশি লিগ জয়ে সিমিওনের কৌশলেরই স্বার্থকতা এখন প্রতিষ্ঠিত। তাই সিমিওনের দৃষ্টিতে অ্যাটলেটিকোর যেই অর্জন ‘পুরোপুরি ঐতিহাসিক’, সেই ইতিহাসের অংশ সিমিওনে নিজেও।