স্বপ্ন ওদের আকাশ ছোঁয়ার

আপডেট : ১৯ মে ২০১৪, ২২:০৯
নিজে পড়ে অন্যকে পড়িয়ে কেউ, বাবার সাথে তরকারি বিক্রি করে, কেউ মাকে সাহাস্য করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ইউসেপ-বাংলাদেশ এর সুবিধা বঞ্চিত শ্রমজীবী শিশুরা। শ্রমজীবী এ শিশুরা প্রমাণ করেছে সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে তারাও কোন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার নয়। দারিদ্র্য ও নানা সমস্যার মাঝে থেকেও শুধুমাত্র অদম্য চেষ্টা আর স্কুলের সহযোগিতায় কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে ২০১৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় শতকরা ৯৯.৫৯% ভাগ পাসের হারসহ শীর্ষস্থান দখল করেছে ইউসেপ টেকনিক্যাল স্কুলের শিশুরা। অবহেলিত এ শিশুরা রেখেছে মেধার স্বাক্ষর। শুধু তাই নয় কারিগরি শিক্ষায় প্রথম পাঁচটি আসনই সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের প্রতিষ্ঠানের দখলে। তাই স্বপ্ন এখন ওদের আকাশ ছোঁয়ার। কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে দেশের সকল স্কুলের মধ্যে, প্রথম চারটি স্থানই ইউসেপ টেকনিক্যাল স্কুলগুলো অর্জন করেছে। ইউসেপ মহসিন খুলনা টেকনিক্যাল স্কুল প্রথম স্থান, ইউসেপ মিরপুর টেকনিক্যাল স্কুল ঢাকা দ্বিতীয় স্থান, এ কে খান-ইউসেপ কালুরঘাট টেকনিক্যাল স্কুল চট্টগ্রাম তৃতীয় স্থান এবং ইউসেপ রাজশাহী টেকনিক্যাল স্কুল পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে। এ বছর ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং রাজশাহীতে ইউসেপ-বাংলাদেশের চারটি টেকনিক্যাল স্কুল থেকে মোট ২৪৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি (কারিগরি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে ২৩৫ জন জিপিএ-৫ এবং ৯ জন জিপিএ-৪ ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হয়। এবার ইউসেপ টেকনিক্যাল স্কুলসমূহের পাসের হার শতকরা ৯৯.৫৯ ভাগ। ইউসেপ মহসিন খুলনা টেকনিক্যাল স্কুল থেকে ৫৯ জনের সকলে জিপিএ-৫ অর্জনের মাধ্যমে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে। ইউসেপ মিরপুর টেকনিক্যাল স্কুল ঢাকা থেকে ৬৭ জন জিপিএ-৫ এবং ১ জন জিপিএ-৪ সাফল্য নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। একইভাবে চট্টগ্রামের এ কে খান-ইউসেপ কালুরঘাট টেকনিক্যাল স্কুল থেকে ৫৫ জন জিপিএ-৫ এবং ৫ জন জিপিএ-৪ পেয়ে তৃতীয় এবং ইউসেপ রাজশাহী টেকনিক্যাল স্কুল থেকে ৫৪ জন জিপিএ-৫ এবং ৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৪ পেয়ে ৫ম স্থান লাভ করেছে। ওদের কথা: হালিমা আক্তার ফজরের নামাজ পড়ে ঘরের কাজ সেরে একটু বই নিয়ে বসতো। তারপর স্কুল। সাড়ে আটটা থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা অবধি ক্লাস সেরে বাড়ি ফিরে খেয়ে যেতো টিউশনিতে। জেনারেল মেকালিক্যাল বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া হালিমা বলেন, আমরা গরীব হয়ে ভাল ফলাফল করে সম্মানজনক কাজ করতে চাই। গরীব হয়ে এই রেজাল্ট সৌভাগ্যের বিষয়। তবে শুধু সৌভাগ্য নয় অনেক পরিশ্রমের এই রেজাল্ট হাসিনাকে আজ পলিটেনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এমনই স্বপ্ন দেখছে একই প্রতিষ্ঠানের একই রেজাল্ট করা আল আমিন। আল-আমিনের বাবা যাত্রাবাড়ি ফুটপাতে সবজি বিক্রি করেন। আল আমিনও স্কুল পড়াশুনার বাইরে একজন সবজি বিক্রেতা। আল-আমিন বলে স্কুল থেকে পড়াশুনা বাবদ মাসে নয় টাকা করে পেত। এক হাজার টাকা দেয়ার কথা থাকলেও একশ’ টাকা জমা করে ২৭ মাস পর দেয়া হত। এই টাকা যেমন তার বই-খাতা কিনতে সাহায্য করেছে, তেমন সে বাড়ি ভাড়া, বাবাকে সবজি কেনার কাজে সহযোগিতা করেছে। সব মিলিয়ে সে স্বপ্ন দেখতে পেরেছে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার। অভিভাবকরাও স্বপ্ন দেখছেন: জিপিএ-৫ পাওয়া আইয়ুব আলীর বাবা কালাম মাতাব্বর রঙ মিস্ত্রী। নিজে ছোট কাজ করলেও জিপিএ-৫ পাওয়ায় ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখার সাহস পাচ্ছেন। এমনই কথা বলেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের ক্লিনার জিপিএ-৫ পাওয়া আফরিন আযাদের মা বেবী বেগম। তিনি বলেন, নিজে কষ্ট করি মেয়েটা অনেক কষ্ট করেছে। এখন তা সার্থক। আরো স্বার্থক হবে মেয়েকে সমাজের সম্মানজনক স্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে। কর্তৃপক্ষ যা বলেন: ইউসেপ-বাংলাদেশ, শ্রমজীবী শিশুদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কর্মরত সমাজকল্যাণমূলক একটি প্রতিষ্ঠান, যারা বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের দুস্থ শ্রমজীবী শিশুদের, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং কর্ম সংস্থান সেবার মাধ্যমে দক্ষ জণশক্তিতে রূপান্তরিত করে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক জাকি হাসান ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের সমাজ আজও কারিগাি শিক্ষাকে সেভাবে মূল্যায়ন করে না। কিন্ত এই শিশুগুলো তাদের জীবন বদলে ফেলছে এই শিক্ষার মাধ্যমে। সুবিধা বঞ্চিত এই শিশুদের পরিবেশ, মা-বাবা সব মিলিয়েই তাদের কঠিন জীবন। তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে ভাল ফল করার মূলে মানবিক কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষকরা তাদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল। তাদেরকে যখন বিশেষ করে পড়াশুনায় আগ্রহী করেন তখন তারা শিক্ষকের বিশ্বাসকে বাস্তবায়িত করে খুশি করার জন্য প্রত্যয়ী হয়। তিনি বলেন, গতবছর ১৯৫৭টি স্কুল কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে অংশ নেয়। এবছর তা বেড়ে হয় ১৯৮৭টি তাই সুযোগ বাড়ছে। জাকি আরো বলেন, সরকার ২০১২ সালে সরকার ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট পলিসি করেছেন। সে পলিশি বাস্তবায়নের জন্য কাউন্সিল করা হয়েছে। এখন বাজেটে কারিগরি শিক্ষার জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সাধারণ স্কুলের মতো কারিগরি স্কুলগুলোর সহযোগিতায়ও সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে বিদেশি প্রজেক্ট বন্ধ হলেই এমন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে বাধ্য।