[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

ভারতে বিজেপির বিজয় এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

আপডেট : ১৯ মে ২০১৪, ২২:১১
অবশেষে নবনির্বাচিত সরকার হিসাবে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসছে বিজেপি। বিজেপি এর আগেও ঐ দেশের ক্ষমতায় ছিল। ভারতে গণতন্ত্র তখনো ভেঙে পড়েনি। এখনো পড়বে না। দেশটির নির্বাচন কমিশনের মতে, ভারতীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভায় মোট ৫৪৩ আসনে অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচনে ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া গেল ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছিল। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর গত ১৬ মে ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আকৃতির দিক থেকে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের লোকসভার নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো ছাড়াও জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই বিশ্বজুড়ে। লোকসভার নির্বাচনে এবারে ভারতে মোট ভোটার সংখ্যা ৮১ কোটি ৪৫ লাখ। আর ভারত জুড়ে কেন্দ্র সংখ্যা ৯ লাখ ৩০ হাজার। ভারতের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে সমীক্ষা বা বিশ্লেষণ চলেছিল অনেক। ভোট গণনার পূর্বে সিএনএন-আইবিএন এবং সিএসডিএস পরিচালিত এক জরিপে বলা হয়েছিল, নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ২৩৪ থেকে ২৪৬টি আসন পেতে পারে। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ পেতে পারে ১১১ থেকে ১২৩টি আসন। জরিপের এই তথ্য অনুযায়ী এনডিএর অর্ধেক আসন পাবে ইউপিএ। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই ভারতের লোকসভার নির্বাচনে বিজেপি’র সফল বিজয় আমাদেরকে নতুন একটি দিক-নির্দেশনা দিতে যাচ্ছে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার যে ভারতের মত বিশাল একটি দেশের সরকার পরিবর্তন দেশটির সাথে আন্তর্জাতিক, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে তেমন একটা পরিবর্তন আনবে না। অর্থাত্ পররাষ্ট্রনীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসলেও এর মূলনীতিতে খুব একটা পরিবর্তন আসবে না বলে ধারণা করা যায়। আসা করা যাচ্ছে যে, আমেরিকার মতো ভারতের নতুন সরকারও অতীত পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ঠিক রাখবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অন্যতম কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা। কারণ, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশকে ভারতের খুবই প্রয়োজন। সে কারণে ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর একটি বৃহত্ অংশ প্রতি বছরই ভারতে অনুপ্রবেশ করে বলে ভারতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু এর সংখ্যা নিয়ে ভারত সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি মাধ্যমগুলো যে তথ্য দিয়ে থাকে তার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের দ্বিমত থাকলেও অনুপ্রবেশ যে হচ্ছে তা অস্বীকার করছেন না কেউ। শুধু বাংলাদেশ সরকারই নয়, ভারতের আশ-পাশের যে ক’টি রাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোক ভারতে প্রবেশ করে তাদেরকে ভারতের জনগণ থ্রেট মনে করে। গত ৩০ মার্চ আসামের করিমগঞ্জে এক নির্বাচনী জনসভায় বিজেপি’র সভাপতি রাজনাথ সিং বলেন, গত ৪০ বছর ধরে আসামসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশ থেকে একটি বিশেষ সমপ্রদায়ের লোক অনুপ্রবেশ করেছে। ভোটের রাজনীতির স্বার্থে ভারতের কিছু রাজনৈতিক দল এ কাজে উত্সাহ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন রাজনাথ সিং। কীভাবে এতো লোক ভারতে প্রবেশ করেছে বিজেপি ক্ষমতায় এলেই তা খতিয়ে দেখা হবে বলে বিজেপি প্রধান জানিয়েছিলেন। বিজেপি’র সভাপতি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের হিন্দুরা নিগৃহীত হলে বিজেপি তাদের বিষয়টি অবশ্যই সহানুভূতির সঙ্গে দেখবে। দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে তাদের শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। আর তাই ধারণা করা হচ্ছে যে, মোদী সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি বেশ জোর দিয়ে বিবেচনা করবে। বিজেপি’র নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দিল্লির সিংহাসনে বসছেন নরেন্দ্র মোদী? পাঁচ সপ্তাহের ম্যারাথন ভোট পর্বের শেষে শুক্রবার ১৬ মে ভোট গণনার প্রথম চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই ফলাফলের যে ছবিটা উঠে আসছিল, তাতে আর কোনো সংশয় ছিল না যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট দিল্লিতে সরকার গড়তে চলেছে, আর প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী? বাস্তবেও তাই হল। লক্ষ্নৌ আসনে জিতেছেন বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিং ও কানপুর থেকে প্রবীণ নেতা মুরলি মনোহর যোশী? গুজরাটে ২৬টি আসনের মধ্যে সবকটি বিজেপি’র ঝুলিতে? রাজ্যের বদোদরা আসনে মোদী জিতেছেন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায়? গান্ধীনগর থেকে জিতেছেন বিজেপি’র বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আদভানী? দিল্লির সাতটি আসনের সবক’টি এখন বিজেপি’র দখলে? কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির নাম-গন্ধ নেই? পশ্চিম ভারতের মহারাষ্ট্রে ৪৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি জোটের দখলে ৪৭টি আসন? তবে দক্ষিণ ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের দুর্গ এখনো বিজেপি’র অধরা? তামিলনাড়ুতে জয়ললিতার এআইএডিএমকে রমরমা? কেরালাতে সবে পা রাখতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি? দিল্লির বিজেপি সদর কার্যালয়ে এখন চলেছে বিজয় উত্সব? ব্যান্ডপার্টি, বাজি পটকা, লাড্ডু, ফুলের ছড়াছড়ি? ভারতের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিজেপি? তবে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি’র সরকার গঠনের তত্পরতার মাঝে উঠে এসেছে হিন্দুত্ববাদী সংঘ পরিবারের ভূমিকা? নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী হবার সম্ভাবনা তৈরি হতেই হিন্দুত্ববাদী সংঘ পরিবার নিজেদের চাল চালতে শুরু করেছে? অবশ্যই যাতে মোদীর সরকার গঠিত হবার পর, সংঘ পরিবারের গুরুত্ব যেন খাটো না হয়? বরং তাদের দাবি বাস্তবায়নের জন্য চাপ আসে? এই যেমন অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ, জম্মু-কাশ্মীর সংক্রান্ত সংবিধানের ৩৭০ নং ধারার বিলোপসাধন এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা ইত্যাদি? সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ প্রসঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ৩৭০ ধারা মুছে ফেলা হলে কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে থাকবে কি-না বলা মুশকিল? ওদিকে সংঘ পরিবার মনে করে, বাবরি মসজিদের নিচে যে মন্দির ছিল তার অস্তিত্ব প্রমাণিত? সংবিধানের ৩৭০ ধারা একটা অস্থায়ী ব্যবস্থা মাত্র? আর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এক নির্দেশিক নীতি, যাকে বলে ‘ডায়রেক্টিভ প্রিন্সিপাল’? এই তিনটি বিতর্কিত ইস্যুর সমাধান করতে হবে ভারতীয় সংবিধানের এখতিয়ারের মধ্যেই? এসব দাবি থেকে সরে আসার দরুন বিজেপিকে কঠিন মূল্য দিতে হয়েছিল ২০০৪ সালের নির্বাচনে, এমনটাই মনে করে সংঘ পরিবার? বিজয়ী মোদীর প্রথম অগ্নিপরীক্ষা হবে সতর্কভাবে পা ফেলা, যাতে সংঘ পরিবারের সঙ্গে কোনোমতেই সংঘাতের আবহ তৈরি না হয়? পাশাপাশি সামপ্রদায়িক উত্তেজনা যাতে দেখা না দেয়, সেটাও দেখতে হবে মোদী সরকারকে? গত ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি’র মোট ভোট ছিল ২০%। এবার গণনায় এটা ৫৩%, বিপরীতে কংগ্রেসের জোটসহ হিসাবে এবার সম্ভাব্য ৬১ আসন বা ২৩% ভোট। আবার যেগুলো ছোট এবং নতুন গঠন করা রাজ্য (যার আসল অর্থ এগুলো সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল, ফলে তাদের প্রতিবাদ-চিত্কারের ফলে প্রথম অর্জন আলাদা রাজ্য- মানে আলাদা করে কেন্দ্রীয় রিসোর্স অ্যালোকেশন বা কেন্দ্রের হাতে থাকা সম্পদের ভাগ নেয়ার উদ্যোগ) সেসব রাজ্যে দেখা গেছে, সবগুলো আসন একচেটিয়া বিজেপি’র পকেটে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল এই লেখার সময় পর্যন্ত আসেনি। তবে ফলাফলের যে ধারা দেখা যাচ্ছে, তাতে উত্তরাঞ্চল সাতটির মধ্যে সাতটিতে বা ছত্তিশগড় ১১টির মধ্যে নয়টি, ঝাড়খন্ডে ১৪টির মধ্যে ১২টি। এর অর্থ মোদী-উত্থান বা ব্যবসা-বিনিয়োগের প্রতীক মোদীর উঠে আসার অর্থ তাত্পর্য তারাও বুঝেছে। তাই ঢেলে জিতিয়েছে। বিজেপি’র সবসময়ের খারাপ অবস্থার জায়গাগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণের কেরালা বা তামিলনাড়ু অন্যতম। এক পশ্চিমবঙ্গে তুলনামূলক ভালো বলতে হবে- এই প্রথম এক আসনের বদলে বিজেপি’র অর্জন দুই আসন। আর মমতার তৃণমূল কংগ্রেস খুবই ভালো করেছে। তার মুসলিম নির্বাচনী আসন দখলের নীতি-কৌশল কাজ করেছে এবং ফলও দিয়েছে; মোট ৪২ আসনের মধ্যে একাই ৩৪ আসন পকেটে পুরতে পেরেছেন তিনি। ওদিকে কেরালায় বিজেপি শূন্য আসনেই থেকে গেছে। আর তামিলনাড়ুতে গত ২৫ বছরের ধারাবাহিকতায় বিজেপি বা কংগ্রেস-ধরনের কোনো সর্বভারতীয় দলের স্থান সেখানে নেই, সেটাই বজায় থেকেছে। দুই ডিএমকে দলের পাল্টাপাল্টি সব আসন পাওয়ার রেওয়াজে এবার পালা জয়ললিতার আন্না-ডিএমকের। তার পকেটে ৩৭ আসন, মোট ৩৯ আসনের মধ্যে। আর বাকি দুটো বিজেপি’র। তবে এবার অন্য ডিএমকের (নেতা করুণানিধির) ভরাডুবির ক্ষেত্রে এক বিশেষ ইস্যু ছিল। কারণ থ্রিজি বা মোবাইল লাইসেন্স বিতরণে অর্থ-দুর্নীতি আদালতে প্রমাণিত হওয়ায় করুণানিধির মন্ত্রী এখন জেলখানায়। সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ ফলাফল এসেছে উত্তর প্রদেশে। মোট ৮০ আসনের মধ্যে ৭৩ আসন বিজেপি জোটের পকেটে। শুধু এতটুকুই নয়, এর আর একটি বিশেষ অর্থ আছে। মায়াবতীর বিএসপি কোনো আসন পায়নি, আর সমাজবাদী দল, যারা রাজ্য সরকারে আছে, তারা পেয়েছে মাত্র পাঁচ আসন। এই দুই দলকে পরাজিত করার তাত্পর্য হলো- এরাই কংগ্রেসের সাথে হর্স টেডিংয়ে জোট করার হুমকি দিত। অথবা তৃতীয় জোটের মূল উপাদান হতো। ফলে সবচেয়ে বেশি আসনের রাজ্য, উত্তর প্রদেশে ৭৩ আসন মোদীর জয়লাভের জন্য নির্ধারক। অন্যদিকে বিহার। বিহারে ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের আঞ্চলিক দল জেডিইউ নির্বাচনের আগে বিজেপি জোট ত্যাগ করেছিল। কিন্তু ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, নীতিশ কুমারের ১৮ আসন নিয়ে গেছে বিজেপি। বিহারের মোট ৪০ আসনের ৩১ আসন লাভ করেছে বিজেপি। এবার আসা যাক, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে। ভারতে কে ক্ষমতায় আসল আর আসল না তা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে প্রবল আকাঙ্ক্ষা জন্মে। কারণ, ভারতের রাজনীতির উত্থান-পতন বাংলাদেশের রাজনীতির সমীকরণ পাল্টাতে পারে। আর সে কারণেই ভারতে ক্ষমতার পালা বদলের সম্ভাবনার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতির হিসেব-নিকেশ চলছে বেশ জোরেশোরে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গবন্ধু পরিবার ও ভারতের গান্ধী পরিবারের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশেষ করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ সম্পর্ক আরো গভীর হয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং ভারতের কংগ্রেস প্রধান সোনিয়া গান্ধীর সম্পর্কটা সেই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের চাইতে এ দুই পরিবারের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্কই বেশি জোরালো। যতটা জানা যায়, ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা গান্ধী পরিবারের আতিথেয়তায়ই ভারতে অবস্থান করেছিলেন। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আসার পূর্ব পর্যন্ত গান্ধী পরিবারে পারিবারিক সদস্যের মতোই ছিলেন বলে ধরে নেয়া হয়। একদিকে পারিবারিক সম্পর্ক আর অপরদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ভালো থাকায় কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের মতের মিলও রয়েছে যথেষ্ট। সে কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বাইরেও আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধু পরিবারের স্বার্থ রক্ষায় কংগ্রেস এক পায়ে দাঁড়িয়ে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ওই নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ১৯৩টি সংসদীয় আসনে জয়লাভ করে। আর জামায়াতে ইসলামীসহ চারদলীয় জোট মিলে পায় ২১৬টি সংসদীয় আসন। জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। ওই সময় ভারতে বিজেপিই ক্ষমতায় ছিল। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভারতের সমর্থন বিএনপি’র পক্ষেই ছিল। সূত্রমতে, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি বিজেপি সরকারের সঙ্গে দেয়া অনেক অঙ্গীকারই রক্ষা করতে পারেনি। ফলে ভারত সরকারের সঙ্গে তত্কালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের দূরত্ব বাড়তে থাকে। আর এরই সুযোগ গ্রহণ করে তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র ১৪ মাসের মধ্যেই ভারত প্রশাসনের গ্রীন সিগন্যাল পান এবং সে দেশ সফরে যান। ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে বৈঠক হয়। বৈঠকের আগেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ভারত-বাংলাদেশ এর মধ্যে তত্কালীন সময়ে কী বিষয়ে আলোচনা গুরুত্ব পেতে পারে সেই সম্পর্কে শেখ হাসিনাকে একটি ধারণা দেন। একই সঙ্গে ওই সময় বিজেপি সরকারের কাছে বাংলাদেশ ইস্যুতে সম্ভাব্য একটি এজেন্ডা সম্পর্কেও তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে অগ্রিম নোট দেয় ভারতীয় গোয়েন্দারা। আর তারই ভিত্তিতে শেখ হাসিনা তত্কালীন ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং বৈঠকটি বেশ ফলপ্রসূ হয়। ওই বৈঠকে ভারতের তত্কালীন সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনার যে সমঝোতা হয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরবর্তী ঘটনাগুলো ঘটে। আর বর্তমানেও আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে ক্ষীণ আশার সঞ্চার হচ্ছে এ ভেবে যে, যেহেতু বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি’র সঙ্গে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা এখনো বহাল আছে এবং সে কারণে বিজেপি এখন ক্ষমতায় এলেও বিএনপি’র কোনো লাভ হবে না। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ উল্টো হতে পারে। কারণ, ইতোমধ্যে ভারত তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। অপরদিকে বিজেপি’র নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। ওই সময় বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী ও বিজেপি’র শীর্ষ নেতা ছিলেন লালকৃষ্ণ আদভানীরা। আর এখনকার বিজেপি’র নীতি-নির্ধারণী কর্মকাণ্ডে সেই বাজপেয়ী বা আদভানীদের মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই। এখন একচ্ছত্র কর্তৃত্ব যার, সেই নরেন্দ্র মোদী কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে ছিলেন ওই সময়। তিনি মাত্র একজন স্থানীয় নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাই মনে করা হচ্ছে, এখনকার বিজেপি নেতৃত্ব এখনকার প্রেক্ষাপটেই ফরেন পলিসি নির্ধারণ করবেন। ২০০১ সালে বিএনপি ও বিজেপি একই সময় ক্ষমতায় থাকাকালে বিজেপি’র সঙ্গে বিএনপি’র দূরত্ব বাড়লেও একটি সহজ গাণিতিক সূত্র বিবেচনা করলে বিএনপি-বিজেপি সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আর সেই সূত্রটি হচ্ছে শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব। ভারতে রাজনৈতিক কারণে বিজেপি’র প্রধান শত্রু হচ্ছে কংগ্রেস। বাংলাদেশের বিদেশি বন্ধুরাও ভারতে বিজেপি’র বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমারা ভারতে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে। বিএনপি এবং বিজেপি’র সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে কূটনীতিকদের একটি অংশ মধ্যস্থতা করছেন বলেও বাতাসে খবর ভাসছে। যদি তা-ই হয় এবং এ প্রক্রিয়া সফল হয় তাহলে বিজেপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের জন্য বিশেষ কোনো ঝুঁকি যে নেবে না এটা অনেকটা স্পষ্ট করে বলা যায়। অবশ্য ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার পঙ্কজ শরণ এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্বস্ত করার জন্য বলেছেন, ভারতে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে বিদেশ নীতির কোনো পরিবর্তন হবে না। কেন্দ্রীয় সরকার মূল পলিসি নির্ধারণ করবে, হাই কমিশনার বা রাষ্ট্রদূতরা তা বাস্তবায়ন করবে এটাই চিরাচরিত নিয়ম। ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসবে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিজেপি’র সাথে অতীতে বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী দলের অতীত সম্পর্ক ভাল থাকলেও ভারতের নতুন সরকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তাকেই বেশি অগ্রাধিকার দিবে বলে আশা করা যায়। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বরাবরই সীমান্ত সমস্যাসহ সন্ত্রাসবাদের মতো বিষয়গুলো বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রে বেশ সফলতার পরিচয় দিয়েছে। তাছাড়া সীমান্ত সমস্যাসহ অন্যান্য বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধানের ব্যাপারেও বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বেশ তত্পর। তাই ধারণা করা যাচ্ছে যে, ভারতের বিজেপিও বাংলাদেশের সাথে তার নিজ দেশের সম্পর্ক অটুট রাখার চেষ্টা করবে এবং সন্ত্রাসবাদ দমনসহ অন্যান্য বিষয়ে একসাথে কাজ করবে। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা-১৩৪২

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন