গত রবিবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হইয়াছে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রত্নসম্পদ ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ ও এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াইতে এই ধরনের দিবস পালনের যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না। বর্তমানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পালনীয় দিবসের যেমন সীমা নাই, তেমনই দিবস পালনেরও বিরাম নাই। প্রতি মাসেই বিভিন্ন দিনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা দিবস পালিত হইতেছে। আজ আন্তর্জাতিক মা দিবস তো কাল বিশ্ব সেবিকা দিবস; আজ মে দিবস তো কাল নারী দিবস; আজ পরিবেশ দিবস তো কাল শিশু কিংবা শিশুশ্রম দিবস। সরকারি, বেসরকারি এবং সামাজিক নানা প্রতিষ্ঠান সভা-সেমিনার-শোভাযাত্রা করিয়া এইসব দিবস স্মরণ করিতেছে এবং জনগণকে স্মরণ করাইয়া দিতেছে, তাহাদের সচেতনতা বাড়াইতে সচেষ্ট হইতেছে। একইভাবে, বিভিন্ন সংবাদপত্র দিবসগুলির নিয়মিত সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি বিশেষ ক্রোড়পত্র ছাপাইতেছে, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া সম্প্রচার করিতেছে বিশেষ বুলেটিন ও অনুষ্ঠানমালা। এমনকি সামাজিক মাধ্যমগুলিও সরব হইয়া উঠিতেছে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে। একই দিনে একাধিক ‘বিশেষ দিবস’ও পালিত হইতেছে। সপ্তাহ খানেক আগে পালিত হইল আন্তর্জাতিক মা দিবস; মা দিবস পালনের ব্যাপকতা আমাদের নজর কাড়িলেও, আমরা হয়তো অনেকে খেয়ালও করি নাই যে সেইদিন পরিযায়ী পাখি দিবসও পালন করিয়াছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বিশেষ দিবস পালনের রেওয়াজ বহুদিনের। তবে, তথ্যের অবিরাম প্রবাহের এই কালে বিশেষ দিবসের খবর যেমন দ্রুতগতিতে সকলের গোচরীভূত হইতেছে, তেমনই তাহা পালনের আনুষ্ঠানিকতাও বাড়িয়া চলিয়াছে। বলিতে গেলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়া আমাদের ক্যালেন্ডারের পৃষ্ঠাগুলি ভরিয়া উঠিয়াছে বিশেষ দিবসের চিহ্নে। নিশ্চয় বিশেষ দিবস পালনের মাধ্যমে সেই বিষয়ে সচেতনতা কিছুটা বাড়িতেছে। কারণ দিবসগুলি পালনের মূল লক্ষ্যই হইল বিভিন্ন বিষয় বা ইস্যু ধরিয়া ‘বিশেষ দিবস’টির ঐতিহাসিক তাত্পর্যকে স্মরণ করা এবং তাহার মাধ্যমে সমাজপ্রগতির জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু আমরা ইহাও খেয়াল না করিয়া পারি না যে, অনেকক্ষেত্রেই দিবস পালন নিছক অনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হইয়াছে। প্রতি বত্সর সাক্ষরতা দিবস পালনের পরেও নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা কিছুতেই কমিতেছে না; শ্রমিক দিবস পালনের পরেও শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হইতেছে না; প্রতি বত্সর নারী দিবস পালনের পরেও নারী নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বাড়িয়া চলিয়াছে; ঘটা করিয়া বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের পরেও আমরা সমানভাবেই পরিবেশ ধ্বংসে মত্ত হইয়া রহিয়াছি। বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে, উত্সবমুখরতায় বিশেষ দিবস পালনের পরেই আমরা সেই বিশেষ বিষয়টি বেমালুম ভুলিয়া যাইতেছি।
বিশেষ দিবস পালন নিরুত্সাহিত করা আমাদের উদ্দেশ্য নহে। তবে, আমরা নিরুত্সাহিত করিতে চাহি সেই বিস্মৃতিপরায়ণতাকে, যাহা কেবল দিবস পালনের তাত্ক্ষণিক আনুষ্ঠানিকতাকেই গুরুত্ব দেয়। যাহা উদযাপনকালে আমাদের মনে সচেতনতার আভাস জাগিলেও আনুষ্ঠানিকতা শেষেই বুদবুদের মতো মিলাইয়া যায়; যাহা সেই দিবসের তাত্পর্য আত্মস্থ করিয়া অগ্রসরতার পথে শক্তি যোগায় না। নিশ্চয় সচেতনতা বাড়াইতে দিবস পালনের গুরুত্ব রহিয়াছে। কিন্তু তাহা যেন কেবলই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত না হয়। বরং তাহার অন্তর্নিহিত তাত্পর্য আত্মস্থ করিয়া আমাদিগকে নিরন্তরভাবে ব্যক্তিগত জীবনে, সমাজে, প্রকৃতিতে এবং রাষ্ট্রে নিজেদের কর্তব্য পালনের প্রতি দায়িত্বশীল হইয়া উঠিতে হইবে।
