শেখ মুজিব নামটি আমি কবে শুনি তা চিন্তা করতে করতে আমি সে প্রথম ক্ষণটি পেয়ে যাই। একদিন আমাদের গ্রামের সরদার হাটে যাই। তখন ক্লাশ থ্রি কি ফোরে পড়ি। আমি চকলেট কিনে খাচ্ছিলাম। বাজারের এক কোণায় কয়েকজন ( ৭/৮ জন হবে) কলেজ পড়ুয়া ছাত্র রাজনৈতিক আলোচনা করছিলেন। আমার দৃষ্টি ঐ দিকে চলে গেল, কেন জানি না ছোট বেলা থেকেই আমি রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা শুনতে আগ্রহী ছিলাম। ওখানে একজন ছাত্র বললেন মওলানা ভাসানী দিয়ে হবে না। উনি গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলেন এবং প্রায় সময় হাসপাতালে ভর্তি হন। পশ্চিম পাকিস্তান যে ভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করে যাছে তা তীব্র আন্দোলন ছাড়া বন্ধ করা যাবে না। আর তীব্র আন্দোলন ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আসা সম্ভব হবে না। তারপর কয়েকজন এক সাথে বলে উঠল একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানই পারবেন পূর্ব পাকিস্তানিদের ঐক্যবদ্ধ করে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে, পূর্ব পাকিস্তান স্বায়ত্তশাসন আনতে একমাত্র শেখ মজিবই গ্রেপ্তার, জেল—জুলুম পরোয়া করে না। ঐ দিন আমি বুঝলাম পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমান নামে একজন আপোষহীন নেতা আছেন যার নেতৃত্বে বাঙালিরা শোষণ থেকে মুক্তি পেতে পারে। শেখ মুজিবকে দেখার জন্য আর তার বক্তৃতা শোনার জন্য খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। স্কুলজীবন থেকেই আমি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা পড়ার সুযোগ পাই। আমাদের বাসায় দৈনিক ইত্তেফাকের সৌজন্য সংখ্যা আসত। আমাদের পেপারটা পোস্ট অফিসের মাধ্যমে আসত। দৈনিক ইত্তেফাক শেখ মুজিবের সমস্ত জনসভার সচিত্র খবর ছাপানো হতো। আমি ঐ জনসভায় শেখ মুজিবের ভাষণ পড়ার সুযোগ পেয়ে গেলাম। শেখ মুজিবকে ছবিতে দেখতে সুযোগ পেলাম। নিয়মিতই পত্রিকাতে শেখ মুজিবের ভাষণ পড়তাম। এর পাশাপাশি মানিক মিয়ার (তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া) ‘মোসাফির’ নামের রাজনৈতিক মঞ্চও পড়তাম। দিনে দিনে আমি পাকিস্তানি থেকে বাঙালি হতে লাগলাম। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ৬ দফা দাবিনামা পেশ করেন। আমি শেখ মুজিবের ৬ দফার ব্যাখ্যা সম্বলিত ও বাঙালিদের উজ্জীবিত করার ভাষণ পড়তাম। আমার ভিতরে আন্দোলনের যোশ এসে গেছে। মানিক মিয়ার লিখন আর শেখ মুজিবের ভাষণ আমাকে পরিষ্কার রূপে বাঙালি বানিয়ে ফেলল।
১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করে আমি বরিশালের বিএম কলেজে ভর্তি হই। শেখ মুজিব তখন জেলে। মোনায়েম খাঁ তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। শেখ মুজিব ১নং আসামি। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা। অভিযোগ শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন আলাদা দেশ বানানোর ষড়যন্ত্র করছিলেন। আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া খান মার্শাল’ল দিয়ে পাকিস্তানের শাসন ভার নিল ও ওয়াদা করল যে তিনি ’৭০ সালেই নির্বাচন দিবেন। আমরা মেনে নিলাম। আমরা নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকলাম। অবশেষে ’৭০-এর নির্বাচন হয়ে গেল। ঐ নির্বাচনে ১৭৯টি আসনের মধ্যে ১৭৭টি আসনে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বধীন আওয়ামী লীগ জয় লাভ করল। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ৯৮ ভাগ ভোট পেয়ে বিজয়ী হলেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী আখ্যা দিলেন। ১৯৭১ সাল ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন ১মার্চ ইয়াহিয়া বাতিল ঘোষণা করল। বাঙালিরা গর্জে উঠল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য সংগ্রাম শুরু করলেন। ২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ইঙ্গিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে বাংলাদেশের পতাকা তোলা হলো। ৭মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকনির্দেশনা দেন। ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু জনতার উপস্থিতিতে তার বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলেন। ২৫ মার্চ রাত ১২টায় পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনে আক্রমণ করল। বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। বঙ্গবন্ধু নির্দেশে পেয়ে সাথে সাথেই রাজারবাগ পুলিশ প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করল। শুরু হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ১০এ এপ্রিল বাংলাদেশের সরকার গঠিত হলো। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ নিলেন। এই সরকার ২৬ মার্চ ’৭১ থেকে কার্যকর হলো। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হলো। মুজিবনগরে শ্লোগান উঠল-জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু, তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব। সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করা হলো। এই মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে শেখ মুজিবের অনুগামী লক্ষ লক্ষ যুবক, কিশোর, কৃষক, বৃদ্ধ জনতা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও ব্যাংকার
