টিফিন পিরিয়ডে ছুটে যেতাম খেলার মাঠে
নিমাই চন্দ্র চক্রবর্তী
প্রধান শিক্ষক (অবঃ)
রাজশাহী ক্যন্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়
রাজশাহী।
যে স্কুলে আমার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি, সেই স্কুলের নাম ‘আধাইপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, নওগাঁ।’ গ্রামের নাম থেকেই বোধ হয় বিদ্যালয়ের নামকরণ হয়েছিল। আমাদের গ্রামের উত্তর দিকে একটা মাঠ পেরোলেই ছিল আমার জীবনের প্রথম স্কুল। বিদ্যালয় ভবনটির চারপাশে ছিল সবুজের সমারোহ। আমার জন্য পূণ্যক্ষেত্র সেই বিদ্যাপীঠটি কোন প্রথিতযশা প্রকৌশলীর চিন্তা প্রসূত নয়, একেবারেই ঘরোয়া তার গড়ন, অকৃত্রিম সৌন্দর্য। মাটির দেয়াল আর খড়ের ছাউনি। বিশাল খেলার মাঠ আর স্কুলের চারপাশে ছিল নানান রকমের সারিবদ্ধ গাছ। সে সবের মধ্যে ফলের গাছ ছিল বেশি। যেমন: আম, জাম, লিচু, পেয়ারা, তাল। অবকাঠামোগত দিক থেকে দরিদ্র হলেও, স্কুলটি অর্থাত্ স্কুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক- কর্মচারি সবাই ছিলেন সংস্কৃতিমনা এবং সৌন্দর্যসচেতন। সে কারণেই মাটির দেয়ালের একপাশে ছিল ছোট্ট একটি ফুলের বাগান। আমার সময়ে প্রধান শিক্ষক যিনি ছিলেন, তাঁর নাম পরমেশ্বর বর্ম্মণ। তিনি মানুষ হিসেবে অত্যন্ত সাদামাটা ও সরল প্রাণবন্ত মানুষ। শিক্ষক হিসেবে ছিলেন যথার্থ বিদ্বান, বিচক্ষণ ও ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন। শিক্ষার্থীদের জন্য ছিলেন পরম হিতৈষী। আরেকজন শিক্ষক ছিলেন, যাঁকে আমরা থার্ড মাস্টার বলতাম- তাঁর নাম রামলাল মণ্ডল। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন স্কুলের প্রাণ। শিক্ষার্থীদের জন্য নিবেদিত আমাদের রামলাল স্যার লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধূলায় উত্সাহ যোগাতেন। সাংস্কৃতিক বিষয়েও অনুপ্রাণিত করতেন। শিক্ষকগণ কাছে টেনে নিতেন, পড়াতেন-শেখাতেন অতি আপনজনের মতো। কেবল একটা বিষয়ে শিক্ষকগণ ছিলেন আপোসহীন, তা হলো লেখাপড়ার প্রতি অমনোযোগিতা। পড়ায় অবহেলা- অমনোযোগিতা বা ফাঁকি দেখলে বেত্রাঘাতসহ বিভিন্ন কৌশলে শাস্তি দিতেন। শিক্ষকের ‘কানমলা’ খায়নি, এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা নগণ্য। আমাদের ‘থার্ড মাস্টার’ বেশ কড়া মেজাজের , তাই তাঁকে ছেলেমেয়েরা ভয় পেত খুব।
আমি তখন সবেমাত্র প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছি। আমার মনে আছে, প্রথম দিনের ক্লাশে আমাকে স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে দ্বিতীয় শ্রেণি বানান লিখতে বললেন। সেদিন আমি বানানটি লিখতে ভুল করেছিলাম। কপালে জুটলো তিরস্কার আর শাস্তি। নিলডাউন করে রাখা হলো আমাকে। ঐ স্কুলেই আমার জ্যাঠাতো দাদা ‘বিনয় দা’ পড়তেন। তাঁকেও ডেকে বানানটি লিখতে দিলেন। তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে লিখলেন ‘দি—তি’। আমাদের রামলাল স্যার অগ্নিশর্মা হয়ে আমাদের দু’জনকে কান ধরে হিরহির করে টেনে এনে প্রথম শ্রেণিতে বসিয়ে দিলেন। রাগে- দুঃখে- অভিমানে আমি প্রায় কেঁদে ফেলেছিলাম। ডেকে বললেন, তোরা ঠাকুর মানুষ। লেখাপড়া হবে না, বরং পূজা-পার্বন করে যা পাবি ঐ দিয়েই দিন চলে যাবে। আমরা দু’জন তখন এমন হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম যে, আমাদের কান্না শুনে প্রধান শিক্ষক চলে এলেন শ্রেণিকক্ষে। প্রধান শিক্ষক রামলাল স্যারের রাগ প্রশমনের জন্য কাব্য করে বলেছিলেন, ‘ তোদের আশা পূর্ণ হবে তাঁর কৃপা ভরে।’ সেদিন আমাদের হেড স্যার আমাদের উদ্দেশ্যে একটি কথা বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন, তোরা এখন থেকে পড়াশোনায় মনোযোগী হবি, তবেই বড় হতে পারবি। স্যারের ভালোবাসাও পাবি। হেডস্যার তখন ব্ল্যাকবোর্ডে ‘ দ্বিতীয়’ বানান লিখে দিলেন এবং আমাদের দু’জনকে শ্লেটে লিখে নিয়ে বারবার অনুশীলন করতে বললেন। সেই সাথে আর কখনো যেন পড়ালেখায় যেন অমনোযোগী না হই সে বিষয়ে সচেতন হতে বললেন। আমাদের অনুনয়ে রামলাল স্যারকে সম্মত করিয়ে হেডস্যার পরের দিন প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে বসালেন। আমি মনে মনে জপ করতে লাগলাম যে, কবে রামলাল স্যারের হাত থেকে বাঁচবো। আসলে শিক্ষার্থীর প্রতি যথেষ্ট নিবেদিত শিক্ষকগণই কিছুটা কঠোর হয়ে থাকেন এটি বুঝেছি অনেক পরে।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে বসে আছি। রামলাল স্যার ক্লাশে এলেন। আমাদের হূদকম্প শুরু হলো। সেদিন আমাদের কোনো পড়া ধরলেন না। এক্কেবারে শেষের দিকে আমাদের দু’জনকে বললেন, “বল্ দেখি, পৃথিবী গোল না কি উত্তর দক্ষিণে কিছুটা চ্যাপ্টা?” আমরা দু’জনে হাত তুলে সমস্বরে বললাম, স্যার —পৃথিবী গোল। আমাদের বিদ্যা বুদ্ধি দেখে স্যার ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। বললেন, “ দূর হ; দূর হ, দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।” স্যারের কথাগুলো আজো মনে পড়ে। কবিগানে রামলাল স্যারের বেশ খ্যাতি ছিলো। রামলাল স্যারের কবিগানের আসরে আমিও ছিলাম একজন গোপন শ্রোতা। রাতভর কবিগান শুনে পরের দিন ক্লাশের পড়া না পারার জন্য সহ্য করতে হতো রামলাল স্যারের তিরস্কার ও বেত্রাঘাত, কিন্তু বলতে পারতাম না স্যারের গান শোনার কথা।
আমাদের বিদ্যালয়ে আরো দু’জন শিক্ষক ছিলেন, তাঁদের কথা তেমন আর স্মরণে নেই। কারণ ঐ স্কুলে আমি দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্তই ছিলাম।এরপরে মায়ের ইচ্ছেতেই আমি মামার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করি। আমার দ্বিতীয় স্কুল ছিলো গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের পাখেরা গ্রামের ‘ক্রোরগাছা প্রাথমিক বিদ্যালয়।’ কিন্তু শিক্ষাজীবনের প্রথম স্কুলের স্মৃতি আজো আমার শৈশবকে মনে করিয়ে দেয় অনেক বেশি। তখন সাত/ আট বছর বয়স। পড়ার চেয়ে খেলার প্রতি আগ্রহ ছিলো বেশি। তাই টিফিন পিরিয়ডে ছুটে যেতাম খেলার মাঠে। সবার আগে ফুটবলটা নিজের করে নিতাম। মেয়েরা কেরাম কিংবা গোল্লাছুট আর ছেলেরা কেউ হা-ডু-ডু, কেউ ফুটবল আবার কেউ গাছের ডালে। অর্থাত্ একটা আনন্দমুখর পরিবেশ ছিলো আমাদের স্কুলের।
আমার জীবনের প্রথম স্কুলে আমি মেধাবী ছাত্র ছিলাম না, কিন্তু স্যারদের বকাঝকা, নির্দেশনা, জ্ঞানগর্ভ শিক্ষাই পরবর্তীতে আমাকে ভালো ছাত্র হতে শিখিয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে দ্বিতীয় বানান লিখতে না পারার অপমানবোধ থেকেই আমার মধ্যে জেগেছিলো তীব্র অনুশোচনাবোধ। তাই মনপ্রাণ দিয়ে পড়তে লাগলাম। শিক্ষাজীবনের প্রথম বোর্ড পরীক্ষায় আমি মানবিক শাখায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হতে পেরেছিলাম।
