দেশবাসীর দৃষ্টি এখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘ভালো না খারাপ’-এমন মূল্যায়নের খাতা এখন সবার হাতে। কেউ বলছেন, দেশে ক্রমেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। আবার কেউ বলছেন, দেশে আইন-কানুন বলতে কিছু নেই। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারায় এমন দ্বি-মুখী বক্তব্যে সাধারণ মানুষের আশ্চর্য হওয়ার কথা নয়। কারণ এখানে খুব ভালো হলেও একপক্ষ বলবে খুব খারাপ, আবার খুব খারাপ হলেও একপক্ষ বলবে খুব ভালো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই এমন পরস্পর-বিরোধী। এখানে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে দোষারোপ করতেই বেশি পছন্দ করে। যেকোনো ইস্যুকেই বড় করা হয় নেতিবাচক ভঙ্গিমায়। আবার অনেকেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় দেশকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিতে। এক্ষেত্রে একদল দেশের রাজনীতিকে ঘোলা করতে চায়, কেউ সেই ঘোলা পানিতে বড় মাছগুলো শিকার করতে চান। কিন্তু বর্তমানে গণমাধ্যমের প্রসারতায় জনগণ নিজেরাই সত্যিকার অর্থে ভালো-মন্দ বিচারে উল্লেখযোগ্যভাবে সামর্থ্য হয়ে উঠছে ক্রমেই। রাজনৈতিক দলগুলোর একচেটিয়া মিথ্যাচার, বিভ্রান্তিমূলক কিংবা মন-ভোলানো বক্তব্যে কেউই আর আস্থা রাখেন না।
সম্প্রতি সারা দেশ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় তোলপাড় হয়ে ওঠে। সব মহলে প্রশ্ন ওঠে আইনশৃঙ্খলার নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে। দেশবাসী অপহরণ-গুম-খুন আতঙ্কে বিস্মিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অপহরণ-গুম-খুনের সাথে র্যাব কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে র্যাবের ঊর্ধ্বতন তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের পর আলোচনা এখন অন্য মাত্রা পেয়েছে। অনেকেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে এই ভেবে যে, সরকারের একজন প্রভাবশালীর মন্ত্রীর জামাতা হওয়া সত্ত্বেও র্যাবের ঊর্ধ্বতন গ্রেপ্তারের বিষয়টি আইনের শাসনের নমুনা সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। এমন আইনের শাসনের নজির অব্যাহত থাকলে দেশবাসী আইনের ওপর পূর্ণ আস্থা ফিরে পাবেন। আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি দর্জি দোকানদার বিশ্বজিেক, রাজপথে নৃশংসভাবে হত্যা করার অপরাধে অভিযুক্ত কথিত ছাত্রলীগ নেতাদেরকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এমন দৃষ্টান্ত আরো বেশি পরিমাণে সৃষ্টি হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই ভালো হবে বলে আশা করা যায়। তবে ইদানিং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অন্তর্দ্বন্দ্ব কিংবা প্রতিপক্ষের হামলায় ছাত্রনেতা কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াতে সেখানে অহরহ ঘটছে এমন নির্মমতা। এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড কিংবা রগকাটা, পা-কাটার ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই ভবিষ্যতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষারও দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই ঘোষণা দেন যে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তার নিজের দলের হোক আর অন্য কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীই হোক সবাইকেই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তার পরিবারের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দিয়েছেন, যাতে পরিবারের নাম ভাঙিয়ে কেউ কোনো অপকর্ম কিংবা অন্যায় করতে না পারে। এটিকেও আইনের শাসনের ভিন্নমাত্রার দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
সম্প্রতি অভিযুক্ত র্যাবের কর্মকর্তাদের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে কে বা কারা নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের সাথে জড়িত তা দেশবাসী দ্রুত দেখতে চায়। এমন কোনো দীর্ঘসূত্রিতা যেন তৈরি না হয় যাতে সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অনুরূপ কিছু হয়। বারবার এমন দীর্ঘসূত্রিতার ফলই দেশের মানুষের অনাস্থার অন্যতম কারণ। আশা করি, খুব শিঘ্রই র্যাব সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার নিরসন হবে। তদন্তের মাধ্যমে জানা যাবে, প্রকৃত অপরাধী ও তাদের সহযোগী কারা। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধরা, আইনের আশ্রয়ে আনা ও আইনের পথে মামলাকে এগিয়ে নেয়া এ সবই আইনের শাসনের উদাহরণ। ইতিমধ্যেই আদালতের মাধ্যমে পুলিশ হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। আমরা চাই, যে বা যারাই জড়িত থাক তাদেরই যথাযথ, উপযুক্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক। তদন্তে র্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে র্যাব বাহিনীর সংস্কারে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হোক।
র্যাব গঠনের পর থেকেই অভিযোগ উঠে এসেছে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কিংবা রাজনৈতিকভাবে ফায়দা হাসিলের জন্যই র্যাব গঠিত হয়েছে। অবশ্য র্যাব গঠনের পর এই বাহিনী দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক ভূমিকার কারণেই এই বাহিনীকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ দেয়া হয়েছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় র্যাবের তিন কর্মকর্তার নাম জড়িয়ে যাওয়ায় এখন এই বাহিনী বিলুপ্তির দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিশেষ করে যাদের হাতে (বিএনপি) র্যাবের জন্ম হয়েছিল তারাই আজ র্যাবের বিলুপ্তির প্রশ্ন তুলেছে জোরালো ভাবে। তত্কালীন বিরোধী দলকে দমনের উদ্দেশ্যেই র্যাব গঠিত হয়েছিল এমন অভিযোগও পাওয়া যায় বিভিন্ন মহল থেকে। আবার র্যাব গঠনের পর আইন-শৃঙ্খলায় ব্যাপক উন্নতি হয়েছে এমন দাবি করা হয় বিভিন্ন মহল থেকে। এ কথা স্পষ্ট করে বলা যায়, র্যাব বাহিনী বিলুপ্ত হলে শুধু পুলিশ বাহিনী দিয়েই দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা যাবে না। কারণ পুলিশ বাহিনীর ওপর অনেক আগেই দেশবাসী আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। সম্প্রতি পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে। কিন্তু র্যাবের বিরুদ্ধে কোনো ঢালাও অভিযোগের নজির এখনও সৃষ্টি হয়নি।
ইতিপূর্বে দেশের জঙ্গি তত্পরতা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নানাবিধ ভালো কাজে র্যাবের সাফল্যের প্রশ্নে কারো দ্বি-মত করার সুযোগ নেই।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো র্যাবের জন্মের পর থেকেই এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সম্প্রতি বিএনপি সুস্পষ্টভাবে সরাসরি র্যাব বাহিনীর বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছে। অথচ বিএনপি এই র্যাব বাহিনীর মাধ্যমে অধিক রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে বলে কথিত আছে। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে র্যাবের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ চারদলীয় জোট সরকার র্যাবের সৃষ্টি করে। এর পেছনে রয়েছে, ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে সেনা অভিযানে নির্বিচারে মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা। ২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি জামায়াত জোট সরকার গঠন করার তিন মাস পরই (১৬ অক্টোবর থেকে ৯ জানুয়ারি ২০০৩) অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নামে সারা দেশে অভিযান চালানো হয়। মূলত সেনাবাহিনী এসব অভিযান চালাতো। তখনকার অভিযানে যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটানো হয়েছে, সেগুলোকে ‘হার্ট অ্যাটাক’ নামের গল্প দিয়ে সাজানো হতো। পরবর্তীতে ‘ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের’ নামে অনেক ঘটনা শুনেছি। আর এসব ঘটনার কারণ হিসেবে দায়ী করা যায় এ বাহিনীর যথাযথ জবাবদিহিতার পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া এবং রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের পাল্টাপাল্টি প্রতিযোগিতা। আমরা আশা করবো, রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ইতিবাচক ধারায় ঢেলে সাজাতে র্যাব বাহিনীর পুনর্গঠনের মাধ্যমে এমন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বন্ধ হবে।
এক্ষেত্রে র্যাবকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে সীমিত আকারে সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের আওতায় রাখতে হবে। অনেকদিন থেকেই র্যাবকে তাদের নিজ দায়িত্বের বাইরে কাজের জন্য বরাদ্দ করা হতো। সম্প্রতি বিভিন্ন সিদ্ধান্তে এসব দায়িত্ব থেকে তাদের প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এলিট ফোর্স র্যাব এখন থেকে টহল কিংবা চেকপোস্টের দায়িত্ব পালন করবে না (আমাদের সময়, ১৯ মে ২০১৪)। আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিধিমালা-১৯৭৯ সংশোধিত অনুচ্ছেদের ৬ অনুযায়ী বিশেষায়িত এই বাহিনীকে যে ছয়টি কাজ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে সেগুলো তারা যথাযথভাবে পালন করবে। র্যাবের নির্দিষ্ট ছয়টি কাজের মধ্যে রয়েছে- অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সশস্ত্র জঙ্গি সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, অবৈধ অস্ত্র গোলাবারুদ বিস্ফোরক উদ্ধার, অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সরকার নির্দেশিত যে কোনো অপরাধের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা।
বর্তমানে বিভিন্ন মহল থেকে র্যাব বিলুপ্তির যে দাবি উঠেছে, তা যুক্তিসঙ্গত বল মনে হয় না। কারণ একটি বাহিনীর কয়েকজনের অপরাধের কারণে কোনো পুরো বাহিনীর ঘাড়ে এ অপরাধের বোঝা চাপানো যাবে না। ইতিপূর্বে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দু’একটি অন্যায় কিংবা অপরাধের ঘটনা শোনা গেলেও তাদেরকে বিলুপ্তির কোনো চিন্তা করা হয়নি। এ মুহূর্তে পুলিশের মতো র্যাব বাহিনীকে আলাদা স্বতন্ত্র বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় কিনা সেটি যুক্তিসঙ্গতভাবে ভেবে দেখা যেতে পারে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনা-পরবর্তী র্যাব কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ প্রভৃতি আইনের শাসন কিংবা ন্যায় বিচারের দৃষ্টান্ত হতে যাচ্ছে যার চূড়ান্ত পর্যায় দেশের মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে আনবে।
সম্প্রতি একের পর এক অপহরণের অভিযোগ উঠে আসছে। এমনকি বেশিরভাগ অভিযোগের তীর দেয়া হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে। পরিবেশ আন্দোলনের নেতা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামীর অপহরণ ও পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জের সাতজনকে অপহরণ ও খুনের ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন তোলে। এসব ঘটনার যেমন রহস্যভেদ হচ্ছে না, তেমনি অপহরণ-গুম-খুনও থামছে না। আগের ঘটনাগুলো কোনো সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত জনমনে আতঙ্ক থেকেই যাচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলও ঘটাতে পারে। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তা খুঁজে বের করার দায়িত্বও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কাজেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনার জড়িত থাকার যে অভিযোগ, সে ব্যাপারে বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক বা একাধিক সদস্যের কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া বিচিত্র নয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তিগত অপরাধকে প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের আওতায় ফেলা যুক্তিসঙ্গত নয়।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]
