প্রসঙ্গ লঞ্চডুবি :কেন এই মর্মান্তিক সলিল সমাধি

আপডেট : ২১ মে ২০১৪, ২২:২০
বাড়ি ফিরছিলেন শরীয়তপুর সদর উপজেলার আব্দুর রাজ্জাক কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক আসাদুজ্জামান মিন্টু। এমভি মিরাজ ৪ লঞ্চে চড়ে তাঁর এই ফেরা। তাঁর সাথে ছিল উপজেলার বালাখানা গ্রামের বাড়িতে নির্মাণাধীন মসজিদের জন্য বড় ভাইয়ের দেয়া দুই লাখ তেত্রিশ হাজার টাকা। শরীয়তপুর সুরেশ্বর যাওয়ার পথে গজারিয়া উপজেলার দৌলতপুরে মেঘনা নদীতে এমভি মিরাজ ৪ ঝড়ের কবলে পড়ে। জীবনের অন্তিম মুহূর্ত বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন আসাদুজ্জামান। মুঠোফোনে বড় ভাইকে সাথে সাথে ঝড়ের খবর দিয়েছেন। লঞ্চটি যখন ডুবে যাচ্ছিল তখন বড় ভাইকে মুঠোফোনে বলেছিলেন, লঞ্চের দ্বিতীয় তলায় ৪ নম্বর কেবিনের ড্রয়ারে টাকার ব্যাগটি রেখে গেলাম। আমি যদি মরে যাই, তোমরা আমার লাশ ও টাকার ব্যাগটি উদ্ধার কোরো!’ সংবাদপত্রের মাধ্যমে জীবনের এমন অন্তিম উক্তি পড়ে ভেবেছি জীবনের প্রস্থান কতটা নাটকীয় ও মর্মান্তিক হতে পারে। বাড়ি ফিরতে চেয়েও আসাদুজ্জামান জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারেননি। ডুবে যাওয়া লঞ্চ এর দ্বিতীয় তলার ৪ নম্বর কেবিন থেকে অবশেষে গত শনিবার বিকেলে আসাদুজ্জামানের মরদেহ ও টাকার ব্যাগটি উদ্ধার করা হয়। একজন আসাদুজ্জামানকে নিয়ে স্রষ্টার যে জীবন নাট্য তাতে সংশোধন. পরিবর্তন, পরিবর্ধন কোন কিছুই কোনভাবে কারোর পক্ষে করা সম্ভব নয়। কারণ স্রষ্টা সেই ক্ষমতা নিজের হাতেই রেখেছেন। কাউকে দেননি। কিন্তু স্রষ্টা প্রাণী মাত্রই এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যেন প্রতিটি প্রাণী নিজেকে, নিজেদেরকে রক্ষা করে চলতে পারেন। ভাবতে পারেন। চলবার পথ আবিষ্কার করতে পারেন। সেই সুবাদে প্রাণীকুলে আছে জীবন রক্ষার বিস্তর আয়োজন, প্রস্তুতি। সৃষ্টকর্তা সব ক্ষমতা নিজের ভেতর রেখেও প্রাণীকে জীবনমুখী করে রাখবার ব্যাকুলতা দিতে কার্পণ্য করেননি। বস্তুত জীবন আসা ও যাওয়ার মাঝের সময়। এই সময় নির্ধারণ প্রাণী মাত্রই ভিন্ন। সৃষ্টিকর্তার তারপরও ইচ্ছাই শেষ কথা। সব সত্য মেনে প্রতিকুলতাকে জয় করবার চেষ্টার নামই জীবন। তাই জীবন যখন অনাকাঙ্ক্ষিত সমাপ্তিতে নুইয়ে পড়ে তখন জীবন ঘিরে অবহেলা, উদাসীনতাগুলো প্রকট হয়ে দেখা দেয়। জন্ম হয় অসংখ্য প্রশ্নের। তখন সবই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে এমন কঠিন ও অবিনশ্বর সত্যকে মেনে নিতেও কষ্ট হয়। সমপ্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত নৌ-দুর্ঘটনার একটি তথ্য প্রতিবেদনে শিহরিত হতে হয়। তিন দশকে সাড়ে তিনশ নৌ-দুর্ঘটনা ! হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। যার নেপথ্যের কারণ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে ধারণ ক্ষমতার অধিক যাত্রী বহন, নির্মাণ ত্রুটি, লঞ্চ চালকদের অবহেলা, বিরূপ আবহাওয়াকে গুরুত্ব না দেয়া, নৌ-পথে লঞ্চের প্রতিযোগিতা ও সংঘর্ষ । উল্লিখিত কারণগুলো অসম্পূর্ণ রয়ে যায় যদি তার সাথে বড় দু’টি কারণ যুক্ত না হয়। যার একটি হল, অধিকাংশ মালিক মানবিক নন, সম্পূর্ণ অসত্ বাণিজ্যিক মানসিকতার এবং দ্বিতীয়টি হল. নৌ-পরিবহন ও নৌ-পথ সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, অজ্ঞতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা। এ দুটো কারণ অন্যসব কারণের জন্য দায়ী। লঞ্চ কিভাবে যাত্রী বহন করবে, কতটা বহন করবে. কিভাবে চলবে, কতটা দক্ষ চালক লঞ্চ চালাবে, লঞ্চের ফিটনেস আছে কিনা, ইত্যাদি বিষয়গুলো দেখার, সিদ্ধান্ত দেবার সত্ ও স্বচ্ছ দায়িত্ব মালিক ও নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের। যদি কেউ নিয়মে না থাকেন, নিয়ন্ত্রণে না থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দুর্ঘটনা ঘটে যাবার আগেই ব্যবস্থা নেয়া কর্তব্য। লঞ্চ ডুবে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের মৃত্যু ও নিখোঁজ হবার সংখ্যার মতই অসংখ্য শোকবাণী, আফসোস উচ্চারিত হয় নানা মহল থেকে। গঠিত হয় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি। তদন্ত কার্যক্রম চলে আয়োজন ও আনুষ্ঠানিকতার ঘোরপ্যাঁচে। কিন্তু দায়ী ব্যক্তিরা রেহাই পেয়ে যায় তদন্তের মারপ্যাঁচে। আর সেই সূত্র ধরেই যাত্রী নিয়ে ডুবন্ত লঞ্চ নিজে বেঁচে গিয়ে পুনঃজনমের স্বাদ পায়। পরিচিতি লাভ করে আবার নতুন নামে। কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে ৩ বার নিমজ্জিত ‘এমএল সাটিল’ তারই একটি দৃষ্টান্ত। প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যায় যে, গত ৩ দশকে নৌ-দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এমন কোন নজির বিআইডব্লিউটিএ এর কাছে নেই। তার মানে নৌ-দুর্ঘটনা নিছক একটি ঘটনা সংশ্লিষ্টদের কাছে, কর্তৃপক্ষের কাছে। যেখানে মর্মান্তিক মৃত্যুগুলো, নিখোঁজ হবার কষ্টগুলো যেন কেবলই স্বজনদের ! আবার নিমজ্জিত লঞ্চ উদ্ধারের জন্য নেই আধুনিক জলযান। দীর্ঘদিন পর ৩৬৫ কোটি টাকায় কোরিয়ার ডকইয়ার্ডে নির্মিত দুটো জলযান ‘প্রত্যয়’ ও ‘নির্ভীক’ কেনা হয়। এই দুই জলযান এমভি মিরাজ ৪ উদ্ধার কাজে ব্যবহূত হয়। যদিও এই জলযানের কার্যক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ একটি ছোট্ট লঞ্চ উদ্ধারে তার সময় লেগেছে প্রায় ৪০ ঘন্টা। তবুও বলতে হয় লঞ্চডুবির দেশে এও কম নয়। জীবিত মানুষের সন্ধান না মিললেও ডুবন্ত লঞ্চের সন্ধান পাওয়া গেছে। অন্তত লঞ্চ মালিক তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন অদূর ভবিষ্যতে। মাত্র কিছুদিন আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি লঞ্চ ডুবে যাওয়ায় প্রাণহানির ঘটনায় সেই দেশের সরকার প্রধান পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্র প্রধান বিষয়টির জন্য সাধারন মানুষের কাছে বারবার ক্ষমা চেয়েছেন। এটা কি জাতি ও দেশের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা? নাকি ব্যর্থতার অনুশোচনা? হয়ত তারও বেশি কিছু। নাহ্, এমন কিছু প্রত্যাশা করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে যা চাই তাহল, সাধারণ মানুষের জীবনবাজি নিয়ে খেলার খেলোয়াড়দের কঠিন শাস্তি। সংবাদ মাধ্যমগুলোর সাহায্যে জানা যায় এমভি মিরাজ ৪ এর যাত্রীদের জীবনের এ করুন পরিণতি, পরিসমাপ্তির ঘটনায় বাকরুদ্ধ হতে হয়। জন্মই মৃত্যুকে নিশ্চিত করে। এ চরম সত্যকে অস্বীকার বা এড়িয়ে যাবার উপায় নেই, পথও নেই। কিন্তু আসাদুজ্জামানের মত অনেকের অপ্রত্যাশিতভাবে ডুবে গিয়ে মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। কে চায় এমন মৃত্যু ? টাইটানিক মুভি দেখেছিলাম। প্রেম, ভালবাসায় আচ্ছন্ন জীবনের বাঁচবার আকুল অস্থিরতা, মৃত্যুর দুয়ারে না পৌঁছানোর আহাজারি শুনেছি। টাইটানিক দেখে মনে হয়েছিল মুভিই দেখছি, আদৌ সত্য নয় যেন। পানিতে ডুবে যাবার করুণ, মর্মান্তিক মুহূর্ত কেমন হয় তা অনুমান, উপলদ্ধি ও ধারণালাভ সত্তেওও টাইটানিককে মুভি হিসেবেই দেখতে হয়েছে। মুভির নেপথ্যের সত্য ঘটনাও মুভি কেন্দ্রিক লেগেছে। জানি না কেন এ রকম মনে হত। কিন্তু এমভি মিরাজ ৪ ও একজন আসাদুজ্জামান এর সংবাদ পড়ে মনে হচ্ছে আমি নিজেই যেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী। আমিও ঐ লঞ্চে ছিলাম। এ রকম মনে হবার কারণ কি? কারণ খুঁজে পাইনি। শুধু অনুভব করেছি জীবনের অতি মর্মান্তিক পরিসমাপ্তি। অহরহ ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একদিন চূড়ান্ত বাস্তব হয়ে উঠবে। আমরা সবাই তলিয়ে যাব গভীর জলে। লাশ হয়ে ভেসে উঠব। কিংবা উঠব না। নিখোঁজ হয়ে সংবাদ শিরোনাম হব। এত্তসব ঘটনা ঘটবে যদি সংশ্লিষ্টরা সততার পরিচয় না দেন। লেখক :উন্নয়ন কর্মী