বিশ্ব শতকের একেবারে শুরুতে যে অল্প কয়েক জন ইউরোপিয় ভদ্রলোক মিলে সংগঠনটি তৈরি করেছিলেন, তাদের বুকে নিশ্চয়ই স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আজ পৃথিবীর বৃহত্তম সংগঠনের যে রূপ পেয়ে গেছে ফিফা, তা নিশ্চয়ই তারা কল্পনা করার সাহস পাননি! হ্যাঁ, ব্রাজিল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ফিফা যখন তার ১১০তম জন্মদিন পালন করলো, তখন সে আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বের বৃহত্তম, জাতিসংঘের চেয়েও ঢের বড় এবং সম্ভবত সবচেয়ে প্রতাপশালী সংগঠন। ২১ মে তারিখেই রিও শহর থেকে প্রায় নয় হাজার কিলোমিটার দূরে ১৯০৪ সালে ইউরোপের মাত্র সাতটি দেশের প্রতিনিধি মিলে তৈরি করেছিলেন ‘ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনালে ডি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন’ বা ফিফা নামের এই আন্তর্জাতিক ফুটবল সংগঠন। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা। শুরুতে প্রায় তিন দশকের মতো ব্যর্থতার পর নামকাওয়াস্তে এক ‘বিশ্বকাপ’ তারা শুরু করতে পেরেছিল; যেখানে বড় দলেরা কিছুতেই অংশ নিতে রাজী ছিল না। আজ ১১০ বছর পার করে এসে সেই ফিফার সদস্য সংখ্যা এখন ২০৯; জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩! এ ছাড়াও সদস্যদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, নিজের কর্মপরিধি এবং বিশ্বের সবচেয়ে জৌলুসপূর্ণ আয়োজনের জন্য ফিফার শ্রেষ্ঠত্ব মানার বিকল্প এখন আর নেই। সাফল্যের এই তুঙ্গস্পর্শী সময়ে ফিফা এবার বিশ্বকাপের আয়োজন নিয়ে বসেছে ফুটবলের দেশ ব্রাজিলে। এমন সময়ে জন্মদিনকে সামনে রেখে ফিফার ফেলে আসা ১১টি দশক নিয়ে ছোট ছোট গল্প ফিরে দেখেছে ফিফা নিজেই:
যুদ্ধের মাঠে ফুটবল (১৯০৪-১৯১৪)
ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ডস—এই সাতটি দেশের প্রতিনিধিরা বসে ১৯০৪ সালে প্রথম এই আন্তর্জাতিক সংগঠনের যাত্রা শুরু করেছিলেন। প্রথম ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হওয়ার আগেই জার্মানি সদস্যপদ চেয়ে আবেদন করে। এই দশকে ফিফার সেরা সাফল্য বলা হয়, ক্রিসমাস উপলক্ষে তাদের উদ্যোগে বিশ্বযুদ্ধ চলা অবস্থায় জার্মান ও ব্রিটিশ সৈনিকদের একটি ম্যাচে অংশ নেয়া।
ধ্বংসস্তূপ থেকে জুলেরিমে
(১৯১৫-১৯২৪)
বিশ্বযুদ্ধের দাপটে এবং ইংলিশদের বয়কটে ফিফা সংগঠনটা এই দশকে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। অনেকে মনে করছিলেন, এটা আর টিকবে না। ফরাসি এক দু’জন সংগঠক টিকিয়ে রেখেছিলেন ঢিমে তালের সংগঠনের কার্যক্রম। ঠিক এই সময় সংগঠনকে বাঁচাতে যেন আকাশ থেকে নেমে এলেন তৃতীয় সভাপতি জুলে রিমে। প্রথমেই অলিম্পিকে ফুটবল গেমস আয়োজনের দায়িত্ব নেয়ার মতো সাফল্য এনে দিলেন ফিফাকে। বলা চলে দাপুটে জীবন শুরু হলো ফিফার।
প্রথম বিশ্বকাপ এবং উরুগুয়ে
(১৯২৫-১৯৩৪)
১৯২৪ সালে ফিফা আয়োজিত প্রথম অলিম্পিক ফুটবলেই বাজিমাত্ করলো উরুগুয়ে। ৬০ হাজার দর্শকের সামনে ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সোনা জিতলো তারা। ১৯২৮ সালে আমস্টার্ডামে তারা সোনা জিতলো আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে। এরপরই অলিম্পিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ফিফা। শুরু হলো জুলে রিমে বিশ্বকাপ। উরুগুয়েই আয়োজিত এই প্রথম আসরে ধারাবাহিকতা ধরে রেখে বাজিমাত্ করলো উরুগুয়ে। ১৯৩৪ সালে ইউরোপের প্রথম আসরে ইতালি এই স্বাগতিকদের সাফল্য ধরে রাখলো।
বিশ্বযুদ্ধের দাপট
(১৯৩৫-১৯৪৪)
১৯৩৮ সালে ইতালি প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ ধরে রাখলো। কিন্তু এরপরই শুরু হলো লম্বা সময় ধরে ফিফার এক অন্ধকার যুগ। আসলে পৃথিবীই তখন এক অন্ধকার যুগে আচ্ছন্ন; বিশ্বযুদ্ধ। এই দাপটে ১৯৪২, ১৯৪৬ সালের দুটি বিশ্বকাপ আলোর মুখই দেখলো না। বিশ্বযুদ্ধ শেষেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে টানাপড়েনের ফলে বন্ধই ছিল বৈশ্বিক আয়োজন।
মারাকানা ও হাঙ্গেরির কান্না
(১৯৪৫-১৯৫৪)
বিশ্বযুদ্ধের পর আবার বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করতেই পর পর দুটি বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল ফুটবল। ফুটবলতীর্থ ব্রাজিলে প্রথম বিশ্বকাপে, ১৯৫০ সালে শিরোপা জিতলো সেই উরুগুয়ে। তবে এবার ফেবারিট ব্রাজিলকে মারাকানায় কাঁদিয়ে। আর পরের বিশ্বকাপেই ১৯৫৪ সালে সর্বকালের অন্যতম সেরা দল হাঙ্গেরিকে কাঁদিয়ে বিশ্বকাপ জিতলো পশ্চিম জার্মানি।
শুরু হলো ব্রাজিল যুগ
(১৯৫৫-১৯৬৪)
ব্রাজিলকে নিয়ে উচ্ছ্বাসটা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু নিজের মাটিতে ফাইনাল খেলে হতাশ দলটি অবশেষে নিজেকে ফিরে পেল ১৯৫৮ সালে। টানা দুটি বিশ্বকাপ জিতে বুঝিয়ে দিল, তারা ফুটবল বিশ্ব শাসন করতে এসেছে। এই দশকটা ব্রাজিল ছাড়া আলোচিত আফ্রিকার কারণে। এক ঝাঁক আফ্রিকান দেশকে সদস্য পদ দিতে থাকায় এই সময় ফিফার সদস্য সংখ্যা ১০০ অতিক্রম করলো।
আধুনিক বিশ্বকাপের শুরু
(১৯৬৫-১৯৭৪)
ফিফায় যোগ দিতে সবচেয়ে টালবাহানা করা ইংল্যান্ড এই দশকের শুরুতে জিতে নিলো নিজেদের প্রথম ও একমাত্র শিরোপা। তবে দশকের আসল আলোচিত ব্যাপার ব্রাজিলের জুলে রিমে ট্রফি একেবারে নিয়ে যাওয়া এবং ফিফা বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু। ১৯৭০ সালে তৃতীয়বারের মতো জুলে রিমে ট্রফি জেতায় সেটা একেবারেই দিয়ে দেয়া হয় ব্রাজিলকে। আর ১৯৭৪ সালে বিজয়ী জার্মানিকে দেয়া হয় বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। বলা হয় এই সময় থেকেই আধুনিক হয়ে উঠলো ফুটবল।
আর্জেন্টিনার উত্থান
(১৯৭৫-১৯৮৪)
দশকের হিসাব করলে এই সময়েই খাপছাড়া আর্জেন্টিনা প্রথম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের গুছিয়ে নিতে শুরু করে এবং সাফল্যও পায়। সেই প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার পর থেকে সেরা খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে না পাওয়ার দুঃখ ঘুচিয়ে অবশেষে আর্জেন্টিনা এই সময় তিনটি আসরের দুটিই জিতে নেয়। এদিকে ফিফা এই সময়কালে হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া সংগঠন; সদস্য ১৫০-এর বেশি।
ব্রাজিলের প্রত্যাবর্তন
(১৯৮৫-১৯৯৪)
ব্রাজিল তার ইতিহাসের সেরা ফুটবলটা খেলেও আগের দশকটা ধরে ট্রফিশূন্য থাকায় এক অদ্ভুত হাহাকার তৈরি হয়েছিল। এমনকি ‘জোগা বোনিতো’ বা সুন্দর ফুটবলের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠে গেল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সুন্দর ফুটবল থেকে সরে এসেই জিতলো তারা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ। ফিফা এই সময় কালে হয়ে উঠলো আরও বিস্তৃত এক সংগঠন; সদস্য ছড়িয়ে গেল সব মহাদেশের সব অঞ্চলে।
সুন্দর ফুটবল ও শতবর্ষ
(১৯৯৫-২০০৪)
জিদান ও তার সতীর্থদের জাদুকরী ইউরোপীয় ফুটবলের জয় হলো এই দশকে। ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতলো। তার চেয়েও বড় খবর ব্রাজিল আগের মতো ছন্দের ফুটবল খেলে জিতলো তাদের পঞ্চম ট্রফি। এদিকে ফিফার শতবর্ষ পূরণের আগেই সদস্য সংখ্যা ২০০ স্পর্শ করে ফেললো।
আবার ব্রাজিল
(২০০৫-২০১৪)
ব্রাজিল মানে সাম্বা, ব্রাজিল মানে বুনো সৌন্দর্য; ব্রাজিল মানে ফুটবল। এই দশকে নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্পেনের উত্থান হলো, জিদানকে কাঁদিয়ে ইতালি বিশ্বকাপ জিতলো। তার চেয়ে বড় কথা এই দশকে ফিফা তার বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে ফিরে এসেছে ব্রাজিলে। এবার দেখার পালা ব্রাজিল কেমন একটা শুরু করে দেয় নতুন দশকের।
