ভালো ফলাফল করিবার পরও অনিশ্চয়তা

আপডেট : ২১ মে ২০১৪, ২২:৫৭
এই বত্সরে এসএসসি পরীক্ষায় রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করিয়াছে। দেশব্যাপী পরীক্ষার্থী ও তাহাদের পরিবারের জন্য আনন্দের সুবাতাস বহিয়া আনিয়াছে এই ফলাফল। কিন্তু এই আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, এইবার এই ভালো ফলাফল অর্জনকারী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তাহাদের পরিবারের সদস্যদের চেহারায় উত্কণ্ঠার ছাপ পড়িবার পালা। কারণ ২৮ মে হইতে আরম্ভ হইতেছে মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হইবার আরেক প্রতিযোগিতা। জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবি শিক্ষার্থীরাও এই অস্বস্তির বাহিরে নহে। কারণ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় আসনসংখ্যা অধিক থাকিলেও সত্যিকারের ভালো মহাবিদ্যালয়ের সংখ্যা কিন্তু অত্যল্প। ফলে এই পর্যায়ের উত্কণ্ঠা জারিত হইতেছে ভালো ও মানসম্মত মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াকে ঘিরিয়া। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্যমতে, সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি ৩ হাজার ৫৪৭টি মহাবিদ্যালয় রহিয়াছে। কিছু সংরক্ষিত আসন ব্যতীত মহাবিদ্যালয়গুলিতে শতকরা ৮০ ভাগ উন্মুক্ত আসন মেধার ভিত্তিতে বা এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী পূরণ হইবে। তবে বলা হইয়া থাকে, দেশে যত সংখ্যক ভালো বিদ্যালয় রহিয়াছে, তাহার এক-দশমাংশও ভালো মহাবিদ্যালয় নাই। এই বত্সর এসএসসি পরীক্ষায় সারাদেশের ১০টি বোর্ডে পাস করিয়াছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৩৩১ শিক্ষার্থী। আর সব মিলিয়া আসন রহিয়াছে ইহার চাইতে অধিক। ফলে আসন লইয়া কোনো সঙ্কট হইবে না। কিন্তু হাতেগোনা ভালো মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি লইয়া তীব্র প্রতিযোগিতা হইবে, জিপিএ-৫ পাইয়াও অনেকে ভর্তি হইতে পারিবে না ভালো মহাবিদ্যালয়ে। এইবার পরীক্ষায় ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ (এ+) পাইয়াছে। জিপিএ ৪-৫ এর মধ্যে (এ) গ্রেড অর্জন করিয়াছে ৫ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। শুধু জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবীদের আসন করিয়া দেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠান ঢাকা এবং দেশের বড় শহরগুলিতে নাই। রাজধানীতে ভালো মানের ১৫ থেকে ১৭টি কলেজে আসন আছে মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার। ফলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ পাইবে না। সবার জন্যই আসন রহিয়াছে, তবুও ললাটে চিন্তার রেখা, ঠিকঠাকমতো ভর্তি হওয়া যাইবে তো? মূল চিন্তা হইলো তথাকথিত ‘ভালো’ মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। মানসম্পন্ন মহাবিদ্যালয় হইবার ক্ষেত্রে যে বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তাহা নাই অধিকাংশ মহাবিদ্যলয়ের। ‘ভালো’ মহাবিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজন ভালো শিক্ষকমণ্ডলী, দক্ষ মহাবিদ্যালয় প্রশাসন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু বেশিরভাগ মহাবিদ্যালয়ই এই পূর্বশর্তগুলি পূরণ করে না। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার সমপ্রসারণ হইতেছে, ভালো-মন্দ মিলিয়া দেশজুড়িয়া বিদ্যালয়ের ছড়াছড়ি, কিন্তু মহাবিদ্যালয়গুলি ফাঁকে পড়িয়া অযত্নের শিকার হইয়াছে। মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা মাত্র দুই বত্সর অধ্যয়ন করে, ইহাও পরিচর্চাহীনতার এক কারণ হইতে পারে। মহাবিদ্যালয়গুলিকে লইয়া নীতিনির্ধারকদের আরও ভাবিতে হইবে। তথাকথিত ‘ভালো’ মহাবিদ্যালয়ের সংখ্যা এত অল্প কেন? আজকাল উপজেলা পর্যায়ে অনেক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছাইয়া গিয়াছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সরকারি পরিষেবা পৌঁছাইয়া গিয়াছে, গ্রাম ও শহরের ব্যবধান কমিয়া আসিতেছে। তাহা হইলে মহাবিদ্যালয়গুলির মান কেন বৃদ্ধি পাইতেছে না? ভালো শিক্ষকের সংকট কেন? মহাবিদ্যালয় প্রশাসনগুলি কেন অধিক দক্ষ হইয়া উঠিতেছে না? এই কতকগুলি স্থলে শিক্ষামন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কাজ করিতে হইবে। পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনিতে হইবে। নামী মহাবিদ্যালয়ে সেরা শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় বলিয়াই তাহাদের ফলাফল ভালো হইতেছে। আবার অনেক মহাবিদ্যালয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো প্রশাসন ও দক্ষ শিক্ষকমণ্ডলী থাকিবার পরও ফলাফল ভালো হইতেছে না, কারণ মেধাবি শিক্ষার্থীরা সেইখানে ভর্তি হয় নাই। এই আস্থার সংকট দূর করিয়া কিভাবে প্রত্যেকটি মহাবিদ্যলয়কেই ‘ভালো’ মহাবিদ্যালয়ে পরিণত করা যায়, তাহা লইয়া আমাদের সকলকেই কাজ করিতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন