সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিক্ষানবিস চিকিত্সকরা সেবক-সেবিকাদের যেইভাবে আহত করিলেন, তাহাতে মনে হইতে পারে দেশের চিকিত্সক সমাজের ভবিষ্যত্ আঁধারময়। কেননা, এই আপাত বিচ্ছিন্ন ঘটনাসমূহের সহিত জড়াইয়া রহিয়াছেন শিক্ষানবীস চিকিত্সকেরা। তাহাদের প্রজন্মই তো আগামী কয়েক দশক সম্মান ও দাপটের সহিত বড় চিকিত্সক হইয়া উঠিবে। তবে এইরূপ একপেশে সরলীকরণ না করিয়া এই ঘটনাসমূহকে বরং আরেকটু গভীরে তলাইয়া দেখিবার চেষ্টা করা যাক।
সম্প্রতি চিকিত্সকদের সহিত সাংবাদিক, সাধারণ ছাত্র ও সর্বশেষ নার্সদের মধ্যে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহা আপাত বিচ্ছিন্ন হইলেও তাহার অন্তস্থে রহিয়াছে সমাজেরই ভিতরে বাসা বাঁধিয়া থাকা দৈন্য। প্রথম কথা হইল, প্রতিটি ঘটনাতেই দোষীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হইতেছে চিকিত্সকদের। তাহারাই যেন নূতন প্রজন্মের সবচেয়ে অসহিষ্ণু প্রতিনিধি! একমাত্র তাহারাই যেন পান হইতে চুন খসিবার মতো ঘটনাতেও তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া ওঠে! তাহাদের প্রতি একপেশে ধিক্কারের অনলবর্ষণের মানুষেরও অভাব নাই। কিন্তু আমরা যদি আমাদের দৃষ্টিখানি আরও প্রসারিত করি, আরও বিস্তৃত করি, তবে স্পষ্টতই দেখিতে পাইব—এই অসহিষ্ণুতা, এই অরাজকতা আমাদের সমাজেরই আরও গভীরে ছড়াইয়া পড়িয়াছে বেশ কয়েক যুগ ধরিয়া। যেই অস্থির, অসহিষ্ণু মানসিকতায় নিরন্তর দূষিত হইতেছে এই দেশের মানুষের বোধ-বিবেচনা, তাহা হইতে কে-ই বা মুক্ত? চিকিত্সকদের সামাজিক স্থান অনেক ওপরে বলিয়া সম্ভবত তাহারা সামান্য কিছু করিলেই বড় করিয়া ‘খবর’ হয়। কিন্তু তাহাদের তুলনায় অধিক অন্যায় ও অরাজকতা নিরন্তর তৈরি করিতেছে এই সমাজেরই আরও নানান শ্রেণীর মানুষ। কী যেন এক দুর্বিষহ অনিয়ম অব্যবস্থাপনা ও দুরাচারের বৃত্তে আটকা পড়িয়া ফুসিতেছে আমাদের তরুণ সমাজ। তাহারা জন্ম হইতেই যেন সুকান্তের কবিতার মতো দেখিতেছে ‘ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’! সেই সকল অন্যায় অরাজকতা দেখিয়াই বড় হইতেছে তাহারা। যেই সমাজ যেইরূপ পরিবেশ তৈরি করিয়া রাখে তাহার সন্তানেরা তো সেইরূপ আচরণই করিবে। তাই বিষণ্ন হইতে হয় এই ভাবিয়া—আমাদের দেশে যেন কী এক বিষম সময় আসিয়াছে—সকলের মস্তিষ্কের কড়াই যেন উত্তপ্ত হইয়াই থাকে সর্বক্ষণ। সেই মাথা গরমের কোনো শ্রেণী বর্ণ পেশা নাই। মহামারির মতো ছড়াইয়া পড়িতেছে এই ভাইরাস।
মানুষ যে আর দশটা প্রাণী হইতে শ্রেষ্ঠ, তাহার ছাপ রাখিবার দায়ভার কোনো একটি পেশার মানুষের একার নহে। বরং তাহার দায়দায়িত্ব সকলেরই। এই প্রসঙ্গে ‘সমাজ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা আমাদের ভাবায়—মানুষ জীবনসংগ্রামে জয়ী হইয়া আজ সমস্ত জীবরাজ্যের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত হইয়াছে। বস্তুত সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানবিক গুণাবলীরও বিকাশ ঘটিয়াছে। সভ্য মানব মানবিকতার যে মই দিয়া উপরে উঠিয়াছে সে-মইটা আজ পদাঘাত করিয়া ফেলিয়া দিতে চাহে। ভিতরে পাশবিকতার যে-অংশটা আছে সেটাকে দূর করিতে পারিলে বাঁচে। কিন্তু তাহা সহজে দূরে যাইতে চাহে না; এবং আমাদের সংযত সামাজিক জীবনে শত সহস্র দুঃখকষ্ট এবং জটিল সমস্যার সৃষ্টি করে।
সুতরাং নবীন প্রজন্মের এমত অসহিষ্ণু আচরণ হইল গভীর অসুখের উপসর্গ মাত্র। তাহাদের সৃষ্ট এমত অরাজকদৃশ্যের গভীরেই রহিয়াছে প্রকৃত রোগের ঠিকানা। তাহার নিরাময় সম্ভব না হইলে এই ধরনের ঘটনা উত্তরোত্তর বাড়িবে বৈ কমিবে না। ইহার কার্যকারণ নিহিত রহিয়াছে সামাজিক বিধি-ব্যবস্থার গভীরে। সংশোধন দরকার সেখানেই।
