ফেনীতে গত মঙ্গলবার প্রকাশ্য দিবালোকে যাহা ঘটিয়া গেল তাহাকে আমরা কী বলিব? কোন্ ভাষাতেই বা নিন্দা জানাইব এই নৃশংসতার? ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক গাড়িতে করিয়া ফেনী শহর হইতে ফুলগাজী আসিবার পথে গাড়ি অবরোধ করিয়া প্রথমে তাহাকে গুলি করা হয়। বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ককটেলের। ইহার পর লাঠি ও কিরিচ লইয়া হামলা চালানো হয় তাহার গাড়িতে। চালকসহ গুরুতর আহত অপর তিনসঙ্গী কোনো রকমে প্রাণ বাঁচাইতে সক্ষম হইলেও পেট্রোল ঢালিয়া গাড়িসুদ্ধ গুলিবিদ্ধ একরামকে পোড়াইয়া হত্যা করা হয়। তাঁহার মৃতদেহ চিনিতে পারাও কঠিন হইয়া পড়ে। ঘটনার ভয়াবহতাদৃষ্টে হূদয় উদ্বেলিত হইবে না—এমন মানবসন্তান খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন। পৈশাচিকতা, নৃশংসতা, বর্বরতা—কোনো বিশেষণই এই ক্ষেত্রে যথাযথ বলিয়া মনে হয় না। পাশাপাশি, এই ধরনের নিষ্ঠুরতা যে এইবারই প্রথম ঘটিল তাহাও বলিবার উপায় নাই। বরং অপ্রিয় সত্য হইল, এমনতর নিষ্ঠুরতার সহিতই আমরা বসবাস করিয়া আসিতেছি বত্সরের পর বত্সর। বাসসুদ্ধ মানুষকে পেট্রোল বোমার ভয়ঙ্কর আগুনে পোড়াইয়া মারিবার ঘটনাও ঘটিয়াছে এই দেশে। মানুষ হত্যার যতো বীভত্স ঘৃণ্যতম পন্থা রহিয়াছে সবই প্রয়োগ হইতেছে একের পর এক। আর জনগণকে অসহায়ভাবে তাহা প্রত্যক্ষ করিতে হইতেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্বৃত্তরা ধরাছোঁয়ার বাহিরেই থাকিয়া যাইতেছে। অন্যদিকে, বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদিতেছে। ইহাই যেন ১৬ কোটি মানুষের বিধিলিপি হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
নারায়ণগঞ্জের স্বজনহারা মানুষের মাতম থামিবার আগেই আতঙ্কে-শোকে পাথর হইয়া গিয়াছে ফুলগাজীর মানুষ। ঘটনার পর প্রায় ৪৮ ঘন্টা অতিক্রান্ত হইতে চলিয়াছে। কিন্তু জানা সম্ভব হয় নাই-কাহারা কী উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করিয়াছে। তাই বলিয়া অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ আর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি থামিয়া নাই। যথারীতি রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দ একে অপরকে দায়ী করিয়া চলিয়াছে। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় অভিযোগের আঙুল যাহার দিকে ছিল সেই ব্যক্তিটি হাওয়ায় মিলাইয়া যাওয়ার পর এখন তাহার খোঁজে ব্যাপক কাঠখড় পোড়ানো হইতেছে। ফুলগাজীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু ঘটিলেই বরং দেশবাসী বিস্মিত হইবে। প্রশ্ন হইল, কেন এই নৃশংসতা? শান্তিপ্রিয় হিসাবে একদা যাহাদের খ্যাতি ছিল সেই মানুষগুলি এমন হিংস্র হইয়া উঠিল কেন? সকলেই ইহার জন্য রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং প্রতিকারহীনতা তথা আইনের শাসনের অভাবকে দায়ী করিয়া আসিতেছেন দীর্ঘদিন যাবত্। আইন যে নিজস্ব গতিতে চলিতেছে না বা চলিতে পারিতেছে না, তাহা লইয়া দ্বিমত নাই বলিলেই চলে। ইহার জন্য রাজনৈতিক দলগুলি যতই একে অপরকে দায়ী করুক না কেন—অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয় যে সকল সরকারের আমলেই ইহা ঘটিয়াছে। পরিসংখ্যানের সাক্ষ্যও খুব একটা ভিন্ন নহে। বরাবরই কিছু মানুষ নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করিয়াছে। আচরণ করিয়াছে মধ্যযুগীয় রাজা কিংবা জমিদারদের মতো। নিজ নিজ এলাকায় কায়েম করিয়াছে ত্রাসের রাজত্ব। ইহা যে এমনি এমনি হয় নাই তাহাও সর্বজনবিদিত। কোথায় তাহাদের প্রাণভোমরা তাহাও সর্বসাধারণের অজানা নহে।
সর্বঅনিষ্টের মূলে রহিয়াছে ক্ষমতার অন্ধ আশীর্বাদ। আইন-কানুনের তোয়াক্কা যাহারা করেন না তাহারা জানেন যে, তাহাদের কিছুই হইবে না। কেহই তাহাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারিবে না। কারণ ক্ষমতার বর্মদ্বারা তাহারা সুরক্ষিত। আবার ক্ষমতার বর্মটি সরিয়া যাইবার পর ব্যাঘ্রচর্মপরিহিত এইসব বীরপুঙ্গবদের পুনরায় মূষিকে পরিণত হইতেও আমরা দেখিয়াছি। আবার তাহাদের অপকর্মের ভারে তলাইয়া যাইতেও দেখিয়াছি গোটা দল বা নেতৃত্বের বহু মহত্ অর্জনও। নিকট অতীতের এইসব অভিজ্ঞতা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে দেশ বা রাষ্ট্রের কাণ্ডারিদের। স্থির করিতে হইবে যে, কতিপয় ব্যক্তির লাগামহীন লোভ ও অবিমৃষ্যকারিতার নিকট তাহারা সর্বস্ব জলাঞ্জলি দিবেন কিনা।
