আজও অন্ধকার আফ্রিকা

আপডেট : ২৩ মে ২০১৪, ২১:৪৯
কেসি আফিয়ার কথাটা শুনে পেলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হয়েছেন। পেলে একবার বলেছিলেন বিংশ শতকের মধ্যেই আফ্রিকান কোনো একটা দেশ বিশ্বকাপ জিতবে। যদিও এক যুগেরও বেশি সময় আগে সে ‘ডেডলাইন’ পার হয়ে গেছে। তারপরও আফিয়া যে এবার সাহস করে বলেছেন, তার দল বিশ্বকাপ জিততেই ব্রাজিল যাবে, এটা শুনেই পেলের সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। কারণ, আরও কয়েক বিশ্বকাপের মধ্যে আফ্রিকার কোনো দেশ যে এই ট্রফিটাতে হাত ছোঁয়াবে এমন ইঙ্গিতও দূর দিগন্তে নেই। এখন পর্যন্ত ১২টি বিশ্বকাপে কখনোই আঁচড় কাটার মতো কিছু করে যেতে পারেনি আফ্রিকান কোনো দেশ। মাঝে-মাঝেই নাইজেরিয়া, ঘানা, ক্যামেরুন রোমান্টিক একটা পারফরম্যান্স করেছে, কিন্তু সেটা বিশ্বকাপ কাঁপিয়ে দেয়া কিছু নয়। অথচ ইউরোপিয়ান ফুটবলে এই মহাদেশের খেলোয়াড়দের যে দৌরাত্ম্য তাতে একটা-দুটো দাপুটে দল এই মহাদেশ থেকে আশা করাই যেতো। কিন্তু মুশকিল হলো ইউরোপ কাঁপানো দ্রগবা, ইতোদের কখনোই বিশ্বকাপে বা জাতীয় দলের হয়ে সেভাবে পাওয়া যায় না। এমনকি জর্জ উইয়াহরাও পারেননি এমন কিছু করতে। কেন এমন হয়? কেন আফ্রিকানদের ইউরোপ পারফরম্যান্সের ছোঁয়া বিশ্বকাপে লাগে না? সাবেক-বর্তমান অধিকাংশ খেলোয়াড় একবাক্যে এই সমস্যার কারণ হিসেবে আফ্রিকান দেশগুলোর কর্মকর্তাদের বিলাসিতা, অসংগঠকসুলভ আচরণ ও খেলোয়াড়দের প্রতি বিরাগকে দায়ী করছেন। ক্যামেরুনের স্ট্রাইকার স্যামুয়েল ইতো যেমন পরিষ্কার বলেছেন, ‘আমাদের এই অঞ্চলের একমাত্র সমস্যা হলো আমাদের লিডাররা। তারা খেলোয়াড়দের একদম সম্মান করে না। আসলে আমরা যতোক্ষণ নিজেদের খেলোয়াড়দের সম্মান দিতে না শিখবো, ততোক্ষণ বাকি বিশ্বের কাছ থেকে সম্মানটা পাবো না।’ ইতিহাস বলে এই কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণে, আফ্রিকানরা অমিত সম্ভাবনা নিয়েও তেমন কিছু অদ্যাবধি করতে পারেনি। আজ পর্যন্ত এই মহাদেশের কোনো দল কোয়ার্টার ফাইনাল পার করতে পারেনি। গত ১২টি আসরে তিনটি দল—ক্যামেরুন, সেনেগাল ও ঘানা শুধু কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছে। আরও হতাশার ব্যাপার হচ্ছে আজ পর্যন্ত কোনো আসরে একই সঙ্গে দুটি আফ্রিকান দল প্রথম পর্ব পার করতে পারেনি। বাস্তবতাই বলছে, এবারও অন্তত সাফল্যের বিচারে সেই সম্মান নিয়ে ফেরার কথা নয় মহাদেশটির কোনো দলের। এবার বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করবে আলজেরিয়া, ক্যামেরুন, ঘানা, আইভরি কোস্ট ও নাইজেরিয়া। এরই পাঁচটি দলে কোনোটিই দ্বিতীয় পর্বে খেলার কোনো নিশ্চয়তা অন্তত পাচ্ছে না। যদিও ঘানার কোচ আফিয়া বলেছেন, ‘ঘানা খুবই শক্ত দল। আমি বিশ্বাস করি, আমরা অনেক দূর যাবো-এমনকি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নও হতে পারি আমরা।’ কিন্তু আফিয়ার কথায় ভুলে লাভ নেই। গত বিশ্বকাপে ভালো পারফরম করা এই দলটিকে এবার গ্রুপপর্বে জার্মানি ও পর্তুগালের মুখোমুখি হতে হবে। এদের কাউকে ফেলে ঘানার দ্বিতীয় পর্বে যাওয়াটা খুবই মুশকিল হবে। আইভরি কোস্টকে দ্বিতীয় পর্বে যেতে গেলে কলম্বিয়া, গ্রিস, জাপানের চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে। আর্জেন্টিনা, বসনিয়া ও ইরানের শক্ত চ্যালেঞ্জ আছে নাইজেরিয়ার জন্য। ক্যামেরুনের লড়তে হবে ব্রাজিল, মেক্সিকো ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে এবং আলজেরিয়ার লড়াই বেলজিয়াম, রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে। ফলে এবারও এই মহাদেশের কোনো দল দ্বিতীয় পর্বে না গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আফ্রিকানদের এই হতাশা অনেকদিন ধরেই কাছ থেকে দেখছেন জন বার্নেস। জ্যামাইকার বংশোদ্ভূত এই কৃষ্ণাঙ্গ ইংলিশ তারকা কর্মসূত্রে এখন জোহানেসবার্গ ও আফ্রিকান শহরগুলোতে ফুটবল দেখেন এবং প্রশাসন সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন। তিনি বলছিলেন, ‘প্রথমত আফ্রিকান খেলোয়াড়রা ইউরোপে খেলার সময় যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখে, সেটা জাতীয় দলেও দেখাতে হবে। এটা না থাকার একটা বড় কারণ অবশ্যই গড়পরতা কর্মকর্তাদের বাজে আচরণ।’ এই বাজে আচরণের প্রমাণ অনেক সময় সংবাদপত্রেও আসে। খেলোয়াড়দের বেতন নিয়ে টালবাহানা, দলে হস্তক্ষেপ, ফলাফল নিয়ে সরাসরি খেলোয়াড়দের সঙ্গে বিরোধ- এসব চলেই। এমনকি কর্মকর্তারা নিজেরা ফেডারেশনের টাকায় বিলাসবহুল বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করেন, ভালো হোটেলে থাকেন। একই সফরে খেলোয়াড়রা ইকোনমি ক্লাসে ঘোরেন, ভালো হোটেল পান না; এমন ঘটনাও ঘটে। এই রকম ঘটনাগুলোর সত্যতা তুলে ধরেই কিংবদন্তী লাইবেরিয়ান তারকা, জর্জ উইয়াহ বলছিলেন, ইউরোপ থেকে শেখার সময় এসেছে। সাবেক এই বিশ্ব, ইউরোপিয়ান ও আফ্রিকান সেরা খেলোয়াড় বলছিলেন, ‘কর্মকর্তাদের নয়, খেলোয়াড়দেরই বিমানের বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করা উচিত; কারণ মাঠে তারাই লড়ে। আর খেলোয়াড়দের এই সম্মান নিশ্চিত করতে আফ্রিকান ফেডারেশনগুলোতে সাবেক খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। ইউরোপে সাবেক খেলোয়াড়রা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করেন। আর এখানে খেলার বাইরের এই আবেগ না বোঝার কিছু লোক ফুটবল শাসন করে।’ কর্মকর্তাদের এই আচরণের ব্যাপারে দারুণ একমত আলজেরিয়ার বসনিয়া বংশোদ্ভূত কোচ ভাহিদ হালিহোদচিস। তিনি এটাও দেখেছেন যে, রাজনীতিবিদ এসব কর্মকর্তা রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের স্বার্থে জাতীয় দলকে ব্যবহার করতে চান। আর এসবে তিক্ত হয়ে অনেক প্রতিভাধর খেলোয়াড় জাতীয় দল ছেড়ে চিরতরে ইউরোপেও চলে যান। এই পর্যায়ে অবশ্য হালিহোদচিস আফ্রিকান খেলোয়াড়দের মানসিকতা নিয়েও একটু প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মনে করছেন, পুরো অবস্থার জন্য এখানকার খেলোয়াড়দের স্বার্থপর মানসিকতাও দায়ী, ‘এই খেলোয়াড়রা নিজেদের নাম তৈরি করে ইউরোপের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়, বড় একটা চুক্তি পেতে চায়। ফলে এখানে দলগুলোর টিমওয়ার্ক খুব কম। খুব কম খেলোয়াড়ই দলের হয়ে খেলতে চায় এখানে।’ তাহলে এই সব কিছুর শেষ কোথায়? আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন্সের প্রধান ইসা হায়াতু বলছিলেন, ‘আমি তো মনে করি, এবারই ফাইনাল বা সেমিফাইনালে আফ্রিকার এক বা একাধিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে।’ সেটা হলেই তো নতুন দিন শুরু হয়!