[আ ন্ত র্জা তি ক ]

ছক ভেঙে সৌহার্দ্যের বার্তা

আপডেট : ২৩ মে ২০১৪, ২২:০২
এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন বাইরে, দিল্লিতে, দিল্লির আশপাশে উত্তাপ ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়ার ইঙ্গিত, গরম আরো বাড়বে। গাছের একটি পাতাও নড়ছে না, বাতাস নেই, মেঘের চিহ্ন নেই আকাশে। অশোক রোডে, বিজেপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের খাসমহল ভেতর থেকে বন্ধ। নিশ্ছিদ্র। দেওয়ালে হাসছেন বিশাল প্রতিকৃতির অটল বিহারি। তিনি এখন কোথায়, কেউ বলছে না। বৈদ্যুতিক মাধ্যমে, সংবাদপত্রেও তাঁর আলোকচিত্র ভেসে উঠছে না। তিনি কি অসুস্থ? চলত্ শক্তিহীন, স্বরহীন, স্মৃতিহীন? শাইনিং ইন্ডিয়ার প্রবক্তার হদিস নেই কেন? এ রকম নানা প্রশ্ন জাগছে, শুধু আমার নয়, আরো অনেকের। ভেতরেও ‘অটল হাসির বিরহে’ জেগে উঠছে হাহাকার। এটাই স্বাভাবিক। দরজা বন্ধ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী আর তার ‘সতীর্থ’দের শপথ অনুষ্ঠান নিয়ে বৈঠকের পর বৈঠক চলছে। আমাদের অনুমান স্বরাষ্ট্র, বিদেশ, অর্থ ও মানব সম্পদ মন্ত্রকের উজ্জ্বলতর মুখ ইতিমধ্যে ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু সবার মুখে কুলুপ। এখানে মোদীই শেষ কথা। আমোদিত অস্বস্তি হাওয়া বিজেপির অন্দরে একটু-আধটু কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন, অস্বস্তি উঁকি দেয়নি, তা নয়; দিয়েছে। কিন্তু আমোদিত গাম্ভীর্যে, সবই হাওয়া। যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতার স্বীকৃতির আশ্বাস পেয়ে মহাভারতের কৃষ্ণের ভূমিকায় অবতীর্ণ প্রবীণ আদভানি। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক যোশিজিও মোহন সুরে নরেন্দ্র ভাইয়ের বাঁশি বাজাচ্ছেন। দলের সম্মান রক্ষা আর প্রতিশ্রুতিতে সুষমামণ্ডিত বোধ করছেন আদভানির একজন স্নেহধন্যা। ভোটে হেরে গেলেও অরুণ প্রাতের তরঙ্গে বিমোহিত আইনজীবী জেটলি অর্থাত্ একজনের বিজয় রথের উত্তাপে নিঃশেষিত সব দ্বৈরথ আর চাপা বিদ্রোহ। হাসছে শুধু মোদীর নেতৃত্বের দেদীপ্যমান দক্ষতা। কলমে তেল নয় কালি লেখকের এসব শব্দ চয়নকে তোয়াজের ভাষা ভাবলে অন্যায় করা হবে। কলমে তেল নেই, সত্যের কালি দিয়েই লিখি, সংবাদ লেখার সময় আমির অথবা আমার মতামত কখনো মূল্যে অমূল্য হতে পারে না। হওয়া উচিতও নয়। এখানে কে ঘনিষ্ঠ, কে দূর-নিকটের অনাত্মীয় বা অপছন্দের ব্যক্তি, এসবকে আমল দেয়া ঠিক নয়। রাজনীতিতে, নির্বাচনে, সংসদীয় কাজকর্মে প্রবলতম শত্রুও যদি পুণ্য করে, রেকর্ড ভাঙতে থাকে, তা বলতেই হবে। না বললে, পাঠক ক্ষমা করবেন না। বলবেন, লোকটা মিথ্যাবাদী, দেখেও না দেখার ভান করে অন্ধ সেজে বসে আছে। সংবাদ-কর্মে যথাসম্ভব নির্মোহ নিরপেক্ষ থাকা প্রয়োজন। বিলম্বিত বোধোদয়? এই যে, ভোটের আগে ক্রমশ ঝড়ো হাওয়া তুলে দেশের নবপ্রজন্মের ভেতরে আর বাইরে নরেন্দ্র ভাই ক্রমশ প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছেন। এই যে ভোটে, ম্লান করে দিয়েছেন আগের সব রেকর্ড, তাঁর পূর্ব পরিচয়কে সামনে রেখে তাঁর বিলম্বিত বোধোদয়কে যদি অস্বীকার করি, তা অবশ্যই মিথ্যা দর্শন বা দৃষ্টিভ্রম বলে বিবেচিত হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে নরেন্দ্র ভাইয়ের রেকর্ডের ফিরিস্তিটা কী শুনি। এক এক করে নিঃসঙ্কোচে বলতেই পারি—এক, হিন্দু মহাসভা থেকে জনসংঘ হয়ে ভারতীয় জনতা দলের বিবর্তনের আঁকাবাঁকা ইতিহাসকে কখনো এতোটা ব্যক্তিনির্ভর হতে দেখা যায়নি। এই লক্ষণের ভালো-মন্দ দুদিকই আছে। দুই, অধিক সন্ন্যাসীর গাজনে আর মতানৈক্যে সিদ্ধান্তহীনতার বাড়তি আশঙ্কা। তিন, সুলক্ষণ একটাই, স্বাস্থ্যময় মতভেদকে গুরুত্ব দিয়ে একজনই সরকারে নির্দিষ্ট অভিমুখ রচনা করবেন। সম্ভবত একজনই জোটের চেয়ারম্যানের পদ নিজের আয়ত্তে রাখতে চাইছেন নরেন্দ্র ভাই। তার মানে, একই সরকারের দুটি বা তিনটি ক্ষমতা কেন্দ্র টিকিয়ে রাখার আগ্রহ তাঁর নেই। এ ব্যাপারে সোনিয়ার কংগ্রেস বা পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট যে স্টাইলে কাজ করতো, সে ধারাবাহিকতা মোদী সরাসরি পাল্টে দিতে চাইছেন। কংগ্রেসের সভাপতি এবং এনডিএ চেয়ারপার্সন সোনিয়া গত ১৪ বছর ক্ষমতা বলয়ের প্রধান উত্স হয়ে উঠেছিলেন। বাংলায় দীর্ঘদিন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান এবং সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকের পদ নিয়ন্ত্রণ করতেন একই ব্যক্তি। প্রয়াত অনিল বিশ্বাসের আমলে গড়ে উঠল তিনটি ক্ষমতা বলয়। অনিল রাজ্য সম্পাদক, বিমান বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান আর বুদ্ধদেব মুখ্যমন্ত্রী। সংবেদনশীল বুদ্ধদেব স্বাধীনভাবে কতটা কাজ করতে পেরেছেন, তা একমাত্র তিনিই বলতে পারেন। ‘রেজিমেন্টেশন’ নয়, গণতন্ত্রে ক্ষমতার উত্স অবশ্যই জনগণ। তাঁরা ভোট দেন জনপ্রতিনিধিকে, কখনোই ক্ষমতাকে নয়। বিকেন্দ্রীকরণের নামে ক্ষমতার আলাদা আলাদা বারান্দায় যদি মতান্তরকে ঘিরে মনান্তর তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তাহলে দলবাজি, গোষ্ঠীবাজি চেপে বসে। বহুমুখী কংগ্রেস অথবা যে কোনো অসংগঠিত আঞ্চলিক দলের ক্ষেত্রে এ কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু কমিউনিস্ট অথবা আরএসএস-এর মতো সংঘবদ্ধ সংগঠন থেকে যে রাজনীতি জেগে ওঠে, সেখানে মতান্তর ভারী হতে থাকলে শাসন, সুশাসন ব্যাহত হতে বাধ্য। নরেন্দ্রভাই এতোদিন রাজ্য চালিয়েছেন। সেখানে সাফল্য বা ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা একরকম। দেশ পরিচালনার পরিসরে এই প্রথম তিনি। তিন ‘পাওয়ার সেন্টার’কে নিয়ে কাজ করতে হবে বলেই শুরুতেই তিনি প্রবল সতর্ক। মতাদর্শগত সংগঠনকে উপেক্ষা করার মতো লোক নন। ইত্তেফাকের এই কলমেই আমরা প্রশ্ন তুলেছি, মোদিকে কতটা সঙ্গ দেবে সংঘ পরিবার? আরএসএস ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে, সরকারের দৈনন্দিন কাজে তাঁরা হস্তক্ষেপ করবেন না। মোদিই আর তাঁর সহযোগীরা স্বাধীনভাবেই দেশ চালাবেন। ব্যবহারিক রাজনীতিতে মোদী যত স্বনির্ভর হতে পারবেন, ততই দেশের মঙ্গল। তিনি যে কৌশলপ্রিয়, একথা সবাই জানে। সাংগঠনিক মতাদর্শ থেকে তাঁর বিচ্যুতি অসম্ভব। ভোটের ফল প্রকাশের পর, তাঁর বিস্ময়, তাঁর স্বনিয়ন্ত্রিত আবেগ আর ভাষণ, তাঁর শারীরিক ভাষা, বেনারস যাত্রা, কয়েকটি ঘোষণা এবং বিরোধীদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার বার্তা লক্ষ্য করুন। এতেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে তাঁর ভবিষ্যত্ রাজনীতি এবং দেশ পরিচালনার সুপরিকল্পিত খসড়া। এক, ভোট গোনা শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আহমেদাবাদে লক্ষ জনতার সামনে হাজির হয়ে বললেন, আমার ওপর তামাম গুজরাটিদের অধিকার। এই অধিকার তাঁরা দেশের মানুষকে উপহার দিয়ে আমাকে ১২৫ কোটি জনতার নেতা বানিয়েছেন। বিনম্রচিত্তে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আহমেদাবাদের সভা শেষ করেই ছুটলেন বরোদার বিজয় সমাবেশে। বললেন, কোন ভাষায় বলব? উল্লসিত জনতা নিরুত্তর। আবার প্রশ্ন, গুজরাটির সঙ্গে হিন্দি চলবে? সমস্বরে সায় দিল গণকণ্ঠ। বললেন, আপনারাই আমাকে মানুষ করেছেন। আপনাদের আশীর্বাদই দেশের সব শ্রেণির, সব মানুষের, সব সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আমার কাঁধে অর্পণ করেছে। দুই সমাবেশের ভাষণেই বুঝিয়ে দিলেন, পরিচিত, বিতর্কিত, ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। পরদিন ছুটলেন বেনারসে। গঙ্গাকে মা বলে সম্বোধন করে বললেন, কাশীকে আধ্যাত্মিকতার রাজধানী করবো। দিল্লিতে ফিরেই শুরু হয়ে গেল তাঁর ভিন্নতর কর্মযজ্ঞ। দলের একান্ত বৈঠকে স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিলেন, একই সরকারে দুটি পাওয়ার সেন্টার থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। এনডিএ’র চেয়ারম্যান আর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব একজনের হাতেই থাক। এই প্রস্তাবে কারো কারো অস্বস্তি দেখা দেয়, অচিরেই স্বস্তিতে তার রূপান্তর ঘটল। মন্ত্রিসভা গঠনের অব্যক্ত রূপরেখাতেই ভেসে উঠল তাঁর মতামতের গুরুত্ব। এখানেও সুনিশ্চিত জয়। দলের সংসদীয় বৈঠকে যখন একে একে বলতে উঠলেন লালকৃষ্ণ আদভানি, সুষমা স্বরাজ, মুরলি মনোহর যোশী সবাই একবাক্যে, এক স্বরে স্বীকার করে নিলেন যে, ইতিহাস গড়লেন নরেন্দ্রভাই। একক নেতৃত্বের ম্যাজিকে, ভারতে এই প্রথম নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অকংগ্রেসি সরকার গড়ে উঠছে। দিন কয়েক আগে আবছা বিদ্রোহে, অভিমানে যাঁদের মুখ অংশত মেঘলা দেখাচ্ছিল, তাঁদের হূদয় জয়ে রাজনাথ-অরুণের দক্ষতা এবং মোদীর নেপথ্য ভূমিকাও আরেকটি রেকর্ড। সংসদে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত মাননীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির অতীত রাজনীতি থেকে নরেন্দ্র ভাইয়ের রাজনীতির দূরত্ব আসমান-জমিনের তফাতের সমতুল্য। কিন্তু তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিত্বের সুষমা সবসময় এ রকমই। রাজনীতির ময়দানে যখন তিনি প্রবল প্রতিপক্ষ, তখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক রক্ষার পরিসরে, দেশপ্রধানের নিরপেক্ষ ভূমিকায় তিনিই তাঁর একমাত্র দৃষ্টান্ত। যথাসময়েই রাইসিনা ভবনে ভাবী প্রধানমন্ত্রীকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানালেন প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রপতি। তাঁর হাতে তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রীত্বের নিয়োগপত্র। এর আগে দেশের সংসদ কক্ষে প্রবেশের আগে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন গুজরাট সন্তান। গোটা দেশ দেখল, অনুচ্ছারিত ভঙ্গিতে, দেহের ভাষায়, বিনম্রচিত্তে গেয়ে উঠলেন, ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা...’। এটাও এক ব্যতিক্রম। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ভেনু রাজমনি আর এই লেখকের বন্ধুত্ব খুবই নিবিড়। আত্মীয়তার সীমা দুজনেই কখনোই লংঘন করেনি। করব বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রপতি আর হবু প্রধানমন্ত্রীর বাক্যালাপ নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করিনি। কিন্তু সাংবিধানিক প্রধান এবং রাষ্ট্রনায়কের সাক্ষাত্কারে যে ভাবাবেগ তাঁকে সেদিন স্পর্শ করল এবং ভেনুর সাংবাদিক সম্মেলনেও তাঁর রেশ উপচে পড়ল। এটিও আরেক অভূতপূর্ব ঘটনা। এতোদিন দূর থেকে, বিশেষ করে গুজরাট দাঙ্গার পর থেকে, ভোটের প্রচারে এসে ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে দায়িত্বহীন মন্তব্য শুনে যাঁকে প্রবল বিরুদ্ধ, জাতি বিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িকতা দুষ্ট মনে হচ্ছিল—আজ তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বলে এতো কথা, এতো বাক্য বিস্তার করতে হচ্ছে। এসব উদ্ভট, হাস্যকর চিন্তা যদি কারো মস্তিষ্কে উদিত হয়, তাঁর সম্পর্কে কোনো কটূবাক্য উচ্চারণ করবো না। কিন্তু আমার প্রিয় পাঠককে রাজনৈতিক বাস্তবতার এবং বাধ্যবাধকতার একটি সত্য নিঃসঙ্কোচে জানাতে চাইব যে, সম্ভবত দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্বে প্রথম বৃহত্তম গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত পূরণ করবেন গুজরাটের দামোদর দাস। এ ব্যাপারে তাঁর দুটি মনোভাব পেশ করছি। প্রথমত, ছন্নছাড়া, বিরোধীদের প্রতি যে সৌহার্দ্যমূলক অবস্থান ঘোষণা করেছেন, তা সচরাচর দেখা যায় না। দক্ষিণের জয়ললিতা আর পূর্বের মমতা জোট বেঁধে বিরোধী দলের আসন দাবি করবেন, এরকম শোনা যাচ্ছিল। মমতা বুদ্ধিমতী, আবেগতাড়িত মহিলা। তাঁর এবং মোদীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বয়স প্রায় সমান। সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েও বঞ্চিত বাঙালি জাতিসত্তার লড়াইয়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতীক মমতার ক্ষোভের আগুন নেভেনি। তাঁর বহুত্ববাদী সংস্কৃতি-প্রীতি আর রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। জয়ললিতার তামিলনাড়ুতে প্রতিপক্ষ দুর্বল। নরেন্দ্রভাই-এর চিঠি পেয়েই তিনি আপ্লুত। মমতা তাঁর ঘোষিত অবস্থান থেকে নড়বেন না। পরিস্থিতি তাঁকে নড়তে দেবে না। অন্যান্য আঞ্চলিক দল কী করবে, এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। ভেসে গিয়ে, মিশে যাবে দামোদরের স্রোতে? বামপন্থীরা আরো বেশি বেকায়দায়। বাংলায় তাঁদের আসন মাত্র ২। ত্রিপুরাতেও ২। সারাদেশে ৯। এতোবড়ো বিপর্যয়ে তাঁদের চিরশত্রু ওয়াশিংটনও ভাবেনি। একবার হেরে গেলে ‘রেজিমেন্টেড ফোর্স’ কখনো কখনো যে আর ফিরতে পারে না—ইতিহাসের এই বাস্তবতাই কী ভারতে অনিবার্য হয়ে উঠছে? মোদীর দমকা হাওয়ায় ভেসে উঠবে পরাজিত এতো মুখ—কে জানত? প্রীতিময় বিদেশ নীতি আসন্ন? ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী দেশগুলোর দাদাগিরির সঙ্গত-অসঙ্গত অভিযোগ সামাজিক উত্তেজনাকে, সন্তাসবাদকে প্রায়ই ইন্ধন যোগায়। সম্ভবত এই অনাকাঙ্ক্ষিত অধ্যায়ের সমাপ্তি চাইছেন মোদী। এই ধারণার, এই অনুমানের কারণ সার্ক-এর অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তাঁর অকৃপণ আমন্ত্রণ। সার্ক থেকেও নেই। নামেই এখন তার অস্তিত্ব। আমাদের প্রত্যাশা, সার্ক-এর পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে ভারত এবং জঙ্গিদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলবে সামাজিক শক্তির প্রবলতম ভিত। সাম্প্রদায়িকতা সন্ত্রাসের অন্যতম উত্স। এক দেশের দস্যু আর মানবদেহী রাক্ষসেরা প্রতিবেশীর অপশক্তির মিত্র। যেসব দেশ জঙ্গিবাদ রপ্তানি করে, উপদ্রুত উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মের অধর্মীয় মৌলতন্ত্রকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেয়, তাদের প্রতি সম্প্রীতির বার্তা পাঠিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরেক নজির গড়লেন। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান আর আফগানিস্তানেরও হয়তো কেটে যাবে অস্বস্তি, বাড়বে স্বস্তিবোধ। কারণ, নতুন সরকারের নেতৃত্বে সোহার্দ্যময় বিদেশ নীতি গড়ে উঠবে বলে যে প্রত্যয় আর প্রত্যাশার জন্ম হচ্ছে, তাতে ভূখণ্ডের সব স্রোত মিশে যাবে সীমান্তহীন সমুদ্রে। তৈরি হবে মানবিকতার আধুনিকতার পরিভাষা। এই আশাবাদের কারণ নরেন্দ্রভাই-এর প্রস্তাবিত নেতৃত্ব। নিজের সব পূর্ব পরিচয় আর বিতর্কিত সত্তাকে আপাতত আড়াল করে, সম্ভবত নব্যভারত নির্মাণের কারিগর হয়ে উঠতে চাইছেন তিনি। এই কলমে দিন কয়েক আগেই আমরা প্রশ্ন তুলেছি, কোন্ পথে হাঁটবেন সদ্য নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান? সংকীর্ণতার গলি দিয়ে? না সূর্যোদয়ের স্বপ্ন নিয়ে? প্রশ্নে এই প্রত্যাশাও ছিল যে, হয়ত নিন্দিত আর প্রশংসিত অতীতকে নিঃশব্দে এড়িয়ে তাঁর নাটকীয় শৈশবের মতো, ক্রম-উত্থানের মতো, শাসকের ধর্ম, রাজধর্ম পালনে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের (পার্সনাল চয়েস) চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেবেন সামাজিক আকাঙ্ক্ষাকে। আমৃত্যু রবীন্দ্রনাথ মঙ্গলবোধের কথা বলতেন, দেশ গঠনে বিশেষের চাইতে নির্বিশেষকে রাজনৈতিক তাত্ক্ষণিকতার বদলে সমাজের চাহিদা পূরণের স্বপ্নকে লালন করে গেছেন—এসব হিতাকাঙ্ক্ষা মোদীর পক্ষে কতটা আয়ত্ত করা সম্ভব, তা বলার সময় আসেনি। বলবে তার আগামী দিনের ব্যবহারিক রাজনীতি এবং ‘টিম মোদী’র নেটওয়ার্ক। কিন্তু একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, ইতিমধ্যে তাঁর নেতৃত্ব আগের বহু রেকর্ড অতিক্রম করে ভাবাবেগ তাড়িত নতুন প্রজন্মকে মোদীময়তায় আবিষ্ট করে তুলেছে। এই মুহূর্তে এটাই বাস্তবতার নির্মেদ, নিষ্কাশিত চেহারা। লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক ‘আরম্ভ’ পত্রিকা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন