ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৩ মে ২০১৪, ২২:১৬
রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার উচিত কি উচিত নহে, ইহা লইয়া সচেতন সমাজ, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক বিদ্যমান। বস্তুত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগাইয়া জনসমর্থন অর্জনের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইবার জন্য এক পক্ষকে যেমন ধর্মকে প্রধানতম হাতিয়ার হিসাবে বাছিয়া লইতে দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ অন্যপক্ষগুলিকেও তেমনি আবার ইহার বিরোধিতা করিতে দেখা যায়। ধর্মের এইরূপ ব্যবহারকে কেন্দ্র করিয়া বহু আলোচনা-সমালোচনা স্থান পাইয়াছে সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও দর্শন বিষয়ক বই পুস্তকে। ধর্মের ব্যাপক প্রভাবের বিপরীতে কালে কালে গড়িয়া উঠিয়াছে তুমুল রাজনৈতিক আন্দোলন। পক্ষান্তরে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় বিধিবিধানের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবহার নিশ্চিত করিবার জন্য ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সমর্থকগণও রাষ্ট্রের উপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চাপের সৃষ্টি করিয়াছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলিকেও তাহাদের নির্বাচক-সমর্থক গোষ্ঠীর প্রত্যাশিত বিষয়সমূহকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করিতে দেখা যায়। এইখানে লক্ষণীয় যে, প্রায় প্রত্যেকটি সমাজেই রাজনৈতিক পক্ষগুলি, তাহারা যাহাদেরই সমর্থনপুষ্ট হউক না কেন, ধর্মীয়ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মাশ্রিত বিষয়গুলিকে ঢালাওভাবে উপেক্ষা করিতে পারে না। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরোধীগণ তাহাদের এইরূপ মতের সমর্থনে যেই যুক্তিগুলি প্রায়শই উপস্থাপন করিয়া থাকেন সেইগুলি হইল—যেইহেতু প্রতিটি ধর্মের অনুসারীগণ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করিয়া থাকেন, তাই কোনভাবেই তাহারা অন্য ধর্মের প্রতি কোনরূপ সহনশীলতা প্রদর্শন করিতে বাস্তবিক কারণেই অপারগতা প্রকাশ করিতে পারে। প্রতিটি দেশেই যেইহেতু একাধিক ধর্মালম্বী বিদ্যমান তাই এইরূপ অসহনশীলতা বর্তমান থাকিলে সংখ্যালঘুরা নানামাত্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়িতে পারে। কাজেই রাষ্ট্রের উচিত নহে ধর্মের ভিত্তিতে পরিচালিত কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো প্রকার উত্সাহ প্রদান করা। রাষ্ট্র বরং এইক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করিলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা হইবে নির্বিঘ্ন, কোনোরূপ চরমপন্থা উত্থানের সুযোগও সৃষ্টি হইবে না। কিন্তু যাহারা মনে করেন ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত তাহারা যুক্তি দেন যে, ধর্ম রাষ্ট্রকে ন্যায় নীতির ভিত্তিতে চালাইতে সক্ষম এবং সে কারণেই সংখ্যালঘুদের কোনভাবেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিবার সম্ভাবনা নাই। গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলে দেখা যাইবে, বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রেই রাজনৈতিক দলগুলি ধর্মীয় সহানুভূতি ব্যবহার করিয়া নিজেদের সমর্থক বৃদ্ধি করিতে কখনই পরান্মুখ নহে। দলের রাজনৈতিক দর্শন, ধর্মনিরপেক্ষতা হইলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ প্রয়োগ করিয়া তাহারা উহাদের বিরাগভাজন হইতে চাহে না। কোন কোন রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হইলেও ইহার সমাজ প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করিতে ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হয়। অতি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলিকেও দেখা গিয়াছে, ধর্মপরায়ণদের চক্ষুশূল কোন ব্যক্তিকে কাছে টানিয়া নিজেদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করিতে চাহে না। কাজেই, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে যতই আইন করিয়া বন্ধ করিবার প্রচেষ্টা চলুক, ইহা কার্যত ততটাই সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি করিবে। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই ধর্মীয় বিষয়গুলি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করিয়া রাষ্ট্র পরিচালনা করিতে পারে না, তাহা যত উন্নত ব্যবস্থাই হউক না কেন। কিন্তু এইসকল রাষ্ট্রে এই উপমহাদেশের মতো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি লইয়া কাহাকেও এতটা উচ্চবাচ্য করিতে দেখা যায় না। তাই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারকে একতরফা সমালোচনা করা বৃথা। ইহা বন্ধ করিতে কোনোরূপ আইনবিধি প্রণয়ন বরঞ্চ নেতিবাচক ফলাফল বহিয়া আনিতে পারে। এইক্ষেত্রে প্রয়োজন সামাজিক প্রচেষ্টা, কেননা বিশৃঙ্খলতাকে আইন দ্বারা সুশৃঙ্খল করা গেলেও মত বা চিন্তা আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নহে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন