আমরা অনেকেই হয়ত জানি না প্রতিদিনের কি কি ভুলের কারণে আমরা আমাদের মূল্যবান দাঁতগুলোকে অকালে হারিয়ে ফেলছি। আমাদের যদি একজোড়া জুতা ব্যবহারের জন্য থাকে এবং তা যদি ঠিকমতো যত্ন না করি তবে এই জুতা রক্ষা করার জন্য খরচের চাইতে চার গুণ বেশি খরচ করে ফেলি মেরামতের জন্য তেমনি দাঁতের যত্নের ব্যাপারেও আমরা একইভাবে চিকিত্সায় খরচ করি। প্রতিরোধের সহজ সস্তা নিয়মগুলো না মানার কারণে একটি দাঁতকে চিকিত্সা করে বাঁচাতে কয়েক হাজার টাকা খরচ করি। আজ আমি দাঁতের যত্নে বিশেষ কয়েকটি ভুল সংশোধন করে সময়মত সঠিকভাবে যত্ন নেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরতে চাই । যেমন :
১. দাঁত ব্রাশ অনেকক্ষণ এবং অতি জোরে জোরেঃ
আপনি যদি অনেকক্ষণ ধরে ব্রাশটি দাঁতের উপর ঘষতে থাকেন তবে এই দাঁতের উপর শক্ত আবরণ এনামেল ক্ষয় হয়ে যাবে। কয়েকদিনের মধ্যে তখন আপনার দাঁত অতিরিক্ত ঠাণ্ডা পানি বা গরম পানিতে শিরশির করবে, খেতে পারবেন না কোনো কিছু্ । এর ফলে মাড়ি থেকে দাঁত সরে আসবে। সুতরাং বাজারের নরম ধরনের ব্রাশ দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে উপর থেকে নিচে সকল দাঁত আস্তে আস্তে পরিষ্কার করতে হবে।
২. প্রতিদিন বেশি পরিমাণে এ্যাসিডিক ফুড খাওয়া ঃ প্রতিদিন সোডা, কমলার রস, মদ, খেলাধুলার সময় ব্যবহূত পানীয়,ক্যান্ডি এবং কমলা ইত্যাদি খাবারে থাকে প্রচুর এ্যাসিড। একটি বরফের টুকরা যেমন পানিতে ছেড়ে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে গলে অদৃশ্য হয়ে যায় তেমনি আমাদের দাঁতের সবচেয়ে শক্ত এনামেল ও কিন্তু এই ধরনের এ্যাসিডিক ফুডের কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। যদি এসব খাদ্য খাওয়ার সাথে সাথে পানি বা চিজ জাতীয় খাদ্য খাওয়া না হয় তবে মুখের ভিতর লালার PH লেভেল কমে গিয়ে দাঁতের ক্ষয় শুরু হবে। যদি কমলা বা আনারস জুস খাওয়ার সময় স্ট্র ব্যবহার করা যায় তবে কিছুটা রক্ষা হয়। তবে সবচেয়ে ভাল হয় এই জাতীয় ফলের রস খাওয়ার পর ভালভাবে কুলিকুচি ও সেই সাথে দাঁত ব্রাশ করা যায়।
৩. দাঁতকে অতিরিক্ত সাদা করার চেষ্টা ঃ আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে দাঁতের রং পরিবর্তন হয়। এগুলো আর সাদা থাকে না । কিন্তু এই দাঁতকে সাদা করার জন্য যদি অতিরিক্ত ব্লিচিং করা হয় তবে দাঁতের এনামেল বা আবরণ এ্যাসিডের আক্রমণের শিকার হয় এবং এনামেলের আবরণ ফেটে একটু ফাঁকা হয়ে যায় ফলে দাঁত শিরশির করে।
৪. নিয়মিত দাঁত ব্রাশ ও ফ্লসিং না করা ঃ প্রতিদিন অন্তত দু’বেলা সকালে নাস্তার পর ও রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত ৩ থেকে ৪ মিনিট দাঁত ব্রাশ করা প্রয়োজন। সেইসাথে দাঁতের ফাঁক থেকে ময়লা খাদ্যকণা বের করে আনার জন্য ডেন্টাল ফ্লসে (একধরনের সিল্ক সূতা) ব্যবহার করা ভালো। যদি আপনার কর্মস্থলে দাঁত ব্রাশ না থাকে তবে বাসার মতো করে সেখানেও একসেট টুথব্রাশ, পেস্ট ও ফ্লস রাখুন। কারণ অনেক সময়ে অফিসেই নাস্তা বা মধ্যাহ্ন ভোজন বা রাতের আহার সারতে হয় । তখন সেখানেও যাতে দাঁত ব্রাশ করতে পারেন সেই ব্যবস্থা রাখাটাও জরুরি । তবে ব্রাশের আগে অবশ্যই ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করবেন, পরে নয়। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ ও ফ্লস না করলে সহজেই দাঁতের গর্ত বা ক্যাভিটি হয় এবং ব্যথা ও প্রদাহ থেকে আরও জটিলতা সৃষ্টি হয়। সুতরাং দাঁত ব্রাশ ও ফ্লস করা প্রয়োজন প্রতিদিন অন্তত ২ বার ।
৫. বছরে অন্তত একবার দাঁত পরীক্ষা করা ঃ বিজ্ঞানসম্মতভাবে নিয়মিত বছরে অন্তত একজন অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনকে দিয়ে দাঁতের স্কেলিং করানো যেমন জরুরি তেমনি দাঁতগুলো পরীক্ষা ও সেইসাথে মুখের বিভিন্ন অংশের পরীক্ষা করানোও জরুরি। তাতে মুখ দাঁতের সামান্য গর্তকে ফিলিং করিয়ে যেমন রক্ষা করা যাবে তেমনি একটি প্রি-ক্যান্সার ঘা বা প্রদাহকে ক্যান্সারের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যাবে। অতএব Prevention is better than Cure. প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধই শ্রেয়, সস্তা ও নিরাপদ ।
লেখক :সাম্মানিক সিনিয়র কনসালটেন্ট, বারডেম
ডিপার্টমেন্ট অব ডেন্টাল সার্জারী
E-mail : [email protected]
