মানবতার নজরুল, সাম্যের নজরুল

আপডেট : ২৪ মে ২০১৪, ২১:২৭
তিনি সাধারণার্থে বিদ্রোহী কবি, গীতিকার ও সুরকার। তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সাম্যবাদী আদর্শে দীক্ষিত অকুতোভয় তেজদীপ্ত এক জীবন সাধক। তিনি, গানের বুলবুল, উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী কলমযোদ্ধা। তিনি, দুখু মিঞা, জীবনকে দেখিয়াছেন নিদারুণ দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে দীর্ণ-শীর্ণ হইতে। সেই কারণেই হয়তো জীবন প্রত্যুষ হইতেই তিনি ছিলেন বেপরোয়া, বেহিসাবী, প্রাণখোলা। জীবনভর তাঁহার অন্বেষা—‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।’ তিনি অস্থির, তাই চঞ্চল। তাঁহার নিজের কথায়, ‘এই বাঁধনহারা মানুষটি ঘরোয়া আঙিনা পেরিয়ে পালাতে চেষ্টা করেছে। যে নীড়ে জন্মেছে এই পলাতক, সেই নীড়কেই সে অস্বীকার করেছে সর্বপ্রথম উড়তে শিখেই।’ কখনও যাত্রা দল, কখনও লেটোর দলের সঙ্গে ‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগত্টাকে’ পণ করিয়া অক্লান্তভাবে ঘুরিয়া মরিয়াছেন গ্রাম-গ্রামান্তরে। দারিদ্র্যের কশাঘাত কাহাকে বলে, তাহা তাহার মতো আর কোন মহান কবি কী অনুভব ও অবলোকন করিয়াছেন? দারিদ্র্যের শাপকে তিনি শক্তিতে রূপান্তরিত করিয়াছিলেন। দারিদ্র্য তাহার নিকট হইয়া উঠিয়াছিল—‘অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস; উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি, বাণী ক্ষুরধার।’ তিনি কণ্ঠে ঢালিয়াছেন তরল গরল। অমৃত তাহার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই উদ্ধত জিজ্ঞাসা ছিল তাঁহার—‘অমৃতে কি ফল? জ্বালা নাই, নেশা নাই, নাই উন্মাদনা।’ অমরার অমৃত-সাধনা তাহার কাছে দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এই দুঃখের পৃথিবীতে অমৃতব্রত তাঁহার জন্য নহে। দারিদ্র্যের গরলে নীলকণ্ঠ হইবার জন্য, সেই বেদনায় দগ্ধ হইবার জন্যই যেন তাঁহার জন্ম। জীবন-সংগ্রামের পুরাণ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সমাজ-সংস্কৃতি ও মানুষের মানবিকতার অন্তর্নিহিত সত্যজগতে তিনি তাহার দৃষ্টিকে প্রাণচঞ্চল করিয়াছিলেন। সেই চাঞ্চল্যেই তিনি একাধারে হইয়া উঠিয়াছেন কবি, কথাশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ ও সৈনিক। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠের প্রতিফলন মেলে তাঁহার কবিতা ও গানে। বিদ্রোহের মঞ্চে তাঁহার প্রবেশ যেন অগ্নিবীণা হাতে করিয়া, ধূমকেতুর মতো তাহার প্রকাশ। ‘ধূমকেতু’ নামের যেই রাজনৈতিক কাগজ তিনি প্রকাশ শুরু করিয়াছিলেন ১৯২২ সালে, জন্মলগ্নেই ‘ধূমকেতু’র মাধ্যমে তিনি তত্কালীন পরাধীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। ঘোষণা করিয়াছিলেন, পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করিতে হইলে সকলের আগে সবাইকে ‘বিদ্রোহ’ করিতে হইবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাহার বজ্রকম্প দীপ্ততেজ দেখিয়া লিখিয়াছেন—‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু, আঁঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এ দুর্গ শিরে, উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’ স্বদেশী আন্দোলনে নূতন কোনো আশা জাগানিয়া ঘটনা দেখিলে তিনি মাতিয়া উঠিতেন প্রলয়োল্লাসে—ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখির ঝড়। তাঁহার চেতনা লোপজনিত অসুস্থতা প্রকাশ পাইবার কয়েক মাস পূর্বে, ১৯৪১ সালের এপ্রিলে, কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’তে জীবনের শেষ অভিভাষণ পাঠ করিতে গিয়া কবি তাঁহার জীবনের লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করিয়াছেন। সেই অভিভাষণে তিনি বেদনার্ত হইয়াছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব’ দেখিয়া। প্রাণের ভেতরের যে সত্য, যে ধর্ম, তাহার উপর কোনো ধর্ম নাই—তিনি আমাদের সেই চিরন্তন মানবতার গান শোনাইতেছেন নিরন্তর। আজ তাঁহার জন্ম-জয়ন্তীতে আমরা সেই মানবতার, সেই সাম্যের গান গাহি। কামনা করি তাঁর বিদেহী আত্মার অনন্ত শান্তি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন