পাটজাত মোড়কের ব্যবহার জনপ্রিয় করিতে হইবে

আপডেট : ২৪ মে ২০১৪, ২১:২৮
কৃত্রিম মোড়ক ব্যবহারজনিত কারণে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণ রোধকল্পে সরকার পণ্যে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার আইন, ২০১০ প্রবর্তন করিয়াছে এবং ০১ জানুয়ারি, ২০১৪ তারিখে হইতে তাহা কার্যকর হইয়াছে। আইনে বলা হইয়াছে, খাদ্য অধিদপ্তর কর্তৃক সংগৃহীত ধান, চাল ও গম মোড়কীকরণের ক্ষেত্রে ১০০% বস্তা ব্যবহার করিতে হইবে। ইহা ছাড়া রাইস মিল বা চাতাল মালিক ও চালের দোকানদারগণকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে ১০০% পাটের বস্তা ব্যবহার করিতে হইবে। অন্য দিকে বলা হইয়াছে, চলতি অর্থবছরে দেশে উত্পাদিত ও আমদানিকৃত সারের ৫০% অংশকে বাধ্যতামূলকভাবে পাটের বস্তায় মোড়কীকরণ করিতে হইবে। উল্লিখিত আইন অনুযায়ী ধান, চাল, গম, ভুট্টা, চিনি ও সার মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার না করিয়া কৃত্রিম মোড়কের ব্যবহার, বিক্রয়, বিতরণ বা সরবরাহ করিলে বা করিবার অনুমতি প্রদান করিলে অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন। সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাইতে হয়। কৃত্রিম মোড়ক যেমন প্লাস্টিকের বস্তা, পলিব্যাগ মাটিতে পচনশীল না হওয়ায় মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে। ইহাতে ফসল উত্পাদন ব্যাহত হয়, এইসব ক্ষতিকর পদার্থ নালা-নর্দমায় জমিয়া পয়ঃনিষ্কাশনে বাধা দেয়, ফলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। প্লাস্টিক ও পলিব্যাগ নদী, পুকুর, খাল-বিল-ঝিল ইত্যাদি জলাশয়ে জমিয়া পানিকে দূষিত করে এবং ইহার ফলে জলজ প্রাণিজ সম্পদ ধ্বংস হয়। অন্যদিকে কৃত্রিম মোড়কে সংরক্ষণ করিলে খাদ্যের গুণগতমান বিনষ্ট হয়। ইহার পূর্বে বাংলাদেশ সরকার পলিথিন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করিলেও এবং ইহার ফলে পরিবেশের কিছুটা উন্নতি হইলেও, উহার ব্যবহার কখনোই সম্পূর্ণ বন্ধ হয় নাই। বরং নানারূপে পলিথিনের ব্যবহার ফিরিয়া আসিয়াছে। অনেকক্ষেত্রে কাগজ পলিথিনের স্থলাভিষিক্ত হইলেও, এইবার সরকার ভাবিতেছে, বড় ব্যাগ বা বস্তার ক্ষেত্রে প্লাস্টিক ও পলিথিনের স্থলে পাটের বস্তাকে জনপ্রিয় করিতে হইবে। ইহাতে দুই দিক হইতে লাভবান হওয়া সম্ভব: পরিবেশরক্ষার কাজটি হইবে আবার পাটশিল্প রক্ষার সুযোগ তৈরী হইবে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা পাটের ‘জিনোম’ বা জন্মরহস্য আবিষ্কার করিয়াছেন এবং ইহা হইতে পাটশিল্প উপকৃত হইবে বলিয়া আশাবাদ ব্যক্ত করা হইয়াছে। কিন্তু পাটের ব্যবহারই যদি ক্রমশ কমিয়া আসে তাহা হইলে কৃষকরা পাট চাষ করিবে কেন? পলিব্যাগ ও প্লাস্টিকের ব্যবহার পৃথিবীব্যাপী কয়েক দশক ধরিয়াই বাড়িয়াছে। ইহার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে একসময়ের বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী খাত পাট, যাহাকে ‘সোনালি আঁঁশ’ বলা হইতো। আশার কথা, পৃথিবীব্যাপী জৈব দ্রব্যের ব্যবহার বৃদ্ধি ও প্লাস্টিক দ্রব্য বর্জনে সচেতনতা বাড়িতেছে। কিন্তু তাহার পরও আন্তর্জাতিকভাবে পাটের বাজার সম্প্রসারিত হইতেছে না। তাই অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি ব্যতীত আর কোনো বিকল্প নাই। বস্তার ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে পাটনির্ভর করিতে পারিলে পাটশিল্প সত্যি সত্যিই চাঙা হইতে পারে। পাটশিল্প চাঙা হইবার দিকটির পাশাপাশি পরিবেশকে রক্ষা করিবার বাধ্যবাধকতাটি এইক্ষেত্রে অধিক বিবেচ্য বিষয়। কারণ পলিব্যাগ ইতোমধ্যেই আমাদের পরিবেশকে বিপর্যস্ত করিয়া ফেলিয়াছে। মাটির গুণাগুণ দ্রুত কমিতেছে। বড় বড় শহরের সন্নিহিত নদী বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, পদ্মা কিংবা রূপসার তলায় কয়েক স্তরের পলিথিন জমিয়া আছে, হ্রাস পাইতেছে নদীর নাব্যতা, ধ্বংস হইতেছে জলজ প্রাণী। শহরগুলিতে রাস্তার পাশে যত্রতত্র পড়িয়া থাকা কিংবা উড়িতে থাকা পলিথিন টুকরা পুরা পরিবেশকে বানাইয়াছে অপরিষ্কার ও নোংরা। পলিথিনের ব্যবহার কেবল শহর নহে, গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছে। চাল কিংবা সারের বস্তার প্লাস্টিকও পচনশীল নয় এবং ইহা পরিবেশের ক্রমাগত ক্ষতি করিয়া চলিতেছে। তাই আমাদের এইসকল ব্যাগ ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অধিক সচেতন হইতে হইবে এবং ইহার বিকল্প ব্যবহারে অভ্যস্ত হইতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন