আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭২ সালের ২৫ মে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণক্রমে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পদার্পণ করেন সপরিবারে। দিনটি আমাদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয় এবং এক আনন্দঘন মুহূর্তের শুভক্ষণ। আমরা হয়েছিলাম আবেগে উদ্বেলিত, ভাবে বিহ্বল কখন অতি কাছে গিয়ে দেখতে পাবো আমাদের প্রিয় কবিকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের রক্তঝরা ভয়াবহ দিনগুলোতে কবির গান, কবিতা আমাদেরকে শুধু সাহস দেয় নাই, দিয়েছে প্রেরণা শক্তি ও প্রেরণা, বিজয়ের তীব্র বাসনা এবং জাতি ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে এক সঙ্গে যুদ্ধ করার চেতনা।
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের কাছে শুধু বিদ্রোহী কবি নয়, সংগ্রাম ও স্বাধীনতার কবি, সাম্যবাদের কবি, তুর্জনিনাদের কবি, নির্যাতিত মানুষের কবি। যুদ্ধের প্রাক্কালে অগ্রগামী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে নজরুলের গান ও কবিতা সাহস দিয়েছে প্রতি পদক্ষেপে। “এই শিকল পরা ছল” “আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে” অথবা ”রাজবন্দীর জবানবন্দী”র কথা ও ভাষা মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছে অফুরন্ত প্রেরণা ও সাহস। তাই কাজী নজরুল আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয়ের কবি। ফিরে এসেছেন স্বাধীনতার পর বিজয়ের বেশে জাতীয় কবি রূপে স্বজনদের মাঝে, স্বাধীন বাংলাদেশে এবং চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন স্বাধীনভূমিতে আমাদের হূদয়ের সবটি জায়গা জুড়ে।
কবি চেয়েছেন উত্পীড়িতের ক্রন্দনরোল থাকবে না পৃথিবীতে, অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ বিদায় নিবে ধরাধাম থেকে। বিশ্ব হবে প্রীতিপ্রেমের পূণ্যভূমি এবং তখনেই তিনি হবেন শান্ত বা পরিতৃপ্ত। তাই তিনি লিখেছেন—” মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত /আমি সেইদিন হবো শান্ত / যবে উত্পীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, /অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না-/বিদ্রোহী রণক্লান্ত /আমি সেইদিন হবো শান্ত।”দেশপ্রেমিক কবি নজরুল শোষকের শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে তার লেখনিকে ব্যবহার করেছেন অস্ত্র ও বুলেট রূপে। অন্যায়, অবিচার,, অসাম্য ও অসত্যের বিরুদ্ধে তিনি লেখনির মাধ্যমে শুরু করলেন প্রচণ্ড বিদ্রোহ, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। নজরুলের কবিতা, “বিদ্রোহী” “ধুমকেতু”, “আনন্দময়ীর আগমনে” তদানীন্তন স্বদেশীদের করেছিল অনুপ্রাণিত, জনগণকে করেছিল উদ্বুদ্ধ এবং ব্রিটিশ শাসনকে করেছিল ভীত। ব্রিটিশ সরকার কবিকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কারারুদ্ধ করে। কবিকে আলীপুর জেল থেকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করে অসম্মান ও নির্যাতন করা হয়। কবি অনশন শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাতে উদ্বিগ্ন হয়ে কবিকে অনশন ভঙ্গের অনুরোধ করেন।
শুধু জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নয়, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, অপশাসন নিমুর্লের অভিযানে এবং সামাজিক কুপমুন্ডকতা ও ধর্মীয় গোড়ামী পরিহার করে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কবি নজরুল ছিলেন পুরোধা। কবি ছিলেন তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। যখন নারীরা অন্তরালে বন্দী, তখন তিনি বলেছেন-
“ সাম্যের গান গাই- / আমার চক্ষে পুরুষ-রমনী কোনো ভেদাভেদ নাই। /বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর /অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। ”
১৯৪২ সালে কবি নজরুল দুরারোগ্য এক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অবশিষ্ট জীবন নির্বাক রয়ে গেলেন। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন কিন্তু স্বাধীনতা প্রাপ্তির আনন্দ লিখে যেতে পারেননি। ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরশায়িত হন। অগণিত বাংলা ভাষাবাসীর হূদয়ে চির অম্লান হয়ে রইলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল। আজকের এই দিনে কবির চরণে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। একইসঙ্গে আশা করি, সরকার জাতীয় কবির সম্মান রক্ষার্থে অনেক পরিকল্পনা নিবেন, বিনিয়োগ করবেন প্রচুর। কবি নজরুল আমাদের জাতির অহংকার। বেসরকারি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ কবি প্রতিভাকে ব্যাপক প্রচারে ভূমিকা গ্রহণ করবেন, এ হচ্ছে আমাদের প্রত্যাশা ।
লেখক: প্রধান উপদেষ্টা, অগ্নিবীণা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, ঢাকা
