রিয়ালের ‘লা ডেসিমা’

আপডেট : ২৫ মে ২০১৪, ২২:০৪
লড়াকু রিয়াল মাদ্রিদ দীর্ঘ ১২ বছর পর আবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি ঘরে তুললো। অবসান হলো মৌসুমের পর মৌসুম ধরে ‘লা ডেসিমা’ বা দশম শিরোপার জন্য তাদের হন্যে হয়ে ফেরা দিনগুলো। গত শনিবার রাতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দেশ পর্তুগালের লিসবনে দীর্ঘ সময় পিছিয়ে থেকেও আক্রমণের পর আক্রমণে নগর প্রতিদ্বন্দ্বি অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে দিশেহারা করেই ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটটি তুলে নেয় রিয়াল। রিয়াল এমন একটি ফাইনাল জিতলো যাতে অ্যাটলেটিকো জয় থেকে কয়েক সেকেন্ড দূরে ছিল; কিন্তু দিয়েগো গোডিনের ৩৬ মিনিটের গোলে নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষে ফাইনালটি যখন ইনজুরি সময়ে গড়ালো সে সময়েই আঘাত হেনে সমতা ফেরান সের্জিও র্যামোস। এরপরই অ্যাটলেটিকোর প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে একে একে আরো তিন গোল করেন গ্যারেথ বেল, মার্সেলো ও রোনালদো। অ্যাটলেটিকোকে অবশ্য খেলার ফল দিয়ে বিচার করা যাবে না। কেননা ৯০ মিনিটের খেলায় কোচ দিয়েগো সিমিওনির স্বপ্ন ছড়ানো দলটি সমানেই পাল্লা দিচ্ছিল; কিন্তু একবার খেলাটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে তারপর খেই হারিয়ে ফেলে অ্যাটলেটিকো। দৃশ্যত শেষ দিকে বড় বাজেটের পড়শিদের ধার ও ভার কোনটার সাথেই স্নায়ুর লড়াইয়ে কুলিয়ে উঠতে পারেনি দুই সপ্তাহ আগে দুই জায়ান্ট রিয়াল ও বার্সেলোনাকে টেক্কা দিয়ে স্প্যানিশ লিগ জেতা দলটি। এই রাতে মূলত রিয়াল অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াসের একটা ভুলের সুযোগকে কাজে লাগিয়েই গোডিনের হেডে এগিয়ে গিয়েছিল অ্যাটলেটিকো। এটি ছিল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ৫৯ বছরের ইতিহাসে একই শহরের দুই ক্লাবের প্রথম লড়াই; কিন্তু অভিজ্ঞতার বিচারে যোজন যোজন এগিয়ে থাকা রিয়াল এ লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি। বরং বিরতির পর বেনফিকার এস্তাদিও দ্য লুজে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে। তারপরও গোল পেতে তাদের ইনজুুরি সময়ের তৃতীয় মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল। র্যামোস কর্ণার থেকে কড়া হেডে গোলটি করেন। গোলটির পর অ্যাটলেটিকো একটা মামুুলি দলে পরিণত হয় এবং এরপর বিশ্বের সবচাইতে দামি ফুটবলার বেল ১১০ মিনিটে হেডে রিয়ালকে এগিয়ে দেন। আট মিনিটের মধ্যে মার্সেলো দলকে ৩-১ গোলে এগিয়ে দেন। তখন বাকি থাকে কেবল রোনালদোর গোল করা। কেননা পর্তুগাল অধিনায়ক রোনালদোর রাজধানীতে হচ্ছিল খেলাটি। সেই সুযোগটিও মেলে ১২০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে রোনালদোর পাঠানো বল জালে গেলে। এটি ছিল এবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তার ১৭তম গোল। তালিকায় তিনিই সবার উপরে। প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এটিই কারো এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোল করার ঘটনা। গোলদাতা হওয়ার লড়াইয়ে এবার তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা অবশ্য অনেক পিছিয়ে। তার ঠিক পেছনেই আছেন প্যারি সেন জার্মেইর ইব্রাহিমোভিচ যার গোল কেবল ১০টি। সেমিফাইনাল থেকে বাদ পড়া বার্সেলোনা তারকা মেসি (আট গোল) এবার এ লড়াইয়ে অনেক পিছিয়ে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি জয়ের সুবাদে রিয়াল এবার ‘ডাবল’ পেয়ে মৌসুম শেষ করলো। লা লিগায় তৃতীয় হওয়া দলটির অপর অর্জন কোপা ডেল রে। কোচ অ্যানচেলোত্তিও এ জয় দিয়ে অমরত্বের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন। কেননা সর্বশেষ জয়টি তাকে তুলে আনলো তিনটি ইউরোপীয় শিরোপা জেতা লিভারপুল কোচ বব বেইসলির কাতারে। গোলরক্ষক ও অধিনায়ক ক্যাসিয়াসেরও এটি তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়। তিনি ক্লাবের আগের দুইটি অর্জন ২০০০ ও ২০০২ সালের জয়ের সময়ও দলে ছিলেন। অ্যানচেলোত্তি পরে বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন কাজটি ছিল খেলাটিতে সমতা ফেরানো। কারণ ওই মুহূর্তে কাজটা ছিল আমাদের জন্য কঠিন। তারা মাঠে জায়গা বের করতে দিচ্ছিল না এবং খুবই ভাল খেলছিল। ওই গোলটিই আমাদের শক্তি দেয়।’ র্যামোস তার খেলার মোড় পরিবর্তনকারী লক্ষ্যভেদটি নিয়ে বলেন, ‘আমার দেয়া গোলগুলোর মধ্যে এটিই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। অদম্য এক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে আমরা ইতিহাস গড়েছি।’ তার সমতা ফেরানো গোলটির পর ক্যাসিয়াস পোস্ট থেকে ছুটে গিয়ে প্রায় মাঝ মাঠে মার্সেলোর সাথে কোলাকুলি করেন তার ভুলটি শুধরে যাওয়ায়। বেলের গোলের পর রিয়াল শিবির তো জয় উদযাপনই শুরু করে দেয়। আর রোনালদো তো জার্সি খুলে তার পেশীবহুল শরীরের প্রদর্শনীতে মেতে উঠেন। অবশ্য বিরতির আগে-পরে বেল যে দুইটি গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন সেগুলো কাজে লাগাতে পারলে অতটা উত্তেজনার আগুনে পুড়তে হতো না সমর্থকদের।