ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিস্ময়কর সাফল্যের মধ্য দিয়া গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ দামোদর দাস মোদী আজ ভারতের চতুর্দশ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করিবেন। নির্বাচনে তাহার দল ভারতীয় জনতা পার্টি এবং উহার নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এ্যালায়েন্সের প্রার্থীরা যে বিপুল ও অবিশ্বাস্য বিজয় লাভ করিয়াছেন সে বিষয়ে বিশ্বব্যাপী বিস্ময়, কৌতূহল, জল্পনা-কল্পনা ইত্যাদি অব্যাহত থাকিলেও দিল্লির মসনদে মোদীর অধিষ্ঠান ভারতবাসীর মনেতো বটেই, এমনকি ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলিসহ বিশ্ব জুড়িয়া নানান আশা-উদ্দীপনা এবং চিন্তা-ভাবনার উদ্রেক করিয়াছে। গণতান্ত্রিক ভারত বুঝিবা তাহার নেতৃত্বে এক নূতন মাত্রা লাভ করিতে যাইতেছে। সুদীর্ঘকাল ভারতবাসীর মানস যেই সকল মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা ও চেতনারভিত্তিতে পরিপুষ্টি লাভ করিয়াছে মোদীর এই বিস্ময়কর উত্থানের ফলে ভারতবাসীর সেই মানসপটে কোন প্রকার মৌলিক কিংবা বিপরীত পরিবর্তন সূচিত হয় কিনা-উহাও সেখানকার জনগণের ভাবনার অন্তর্গত বিষয় হইয়া উঠিয়াছে। আমরা বর্তমান ভারতের এই নব উত্থিত ও জননন্দিত প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাই। ভারতের নির্বাচকেরা একজন দৃঢ়চিত্ত, সফল ও জনদরদী নেতা হিসাবে যেই দায়িত্ব তাহার উপর অর্পণ করিয়াছেন, সেই দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পন্ন করার ব্যাপারে তিনি যত্নবান হইবেন ইহাই যে সেখানকার জনমানুষের প্রত্যাশা- ইহাতে আর সন্দেহ কী! তবে মোদীর এই উত্থান একটি নূতন ভারতের ইঙ্গিত বহন করিতেছে কিনা, উহা দেখিবার জন্য সকলেই অপেক্ষায় থাকিবে নিশ্চয়ই। ভারতের বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রত্যাশা এই যে, প্রধানমন্ত্রী মোদী এমন এক ভারতের গোড়াপত্তন করিবেন যেই ভারত কিনা সেখানকার হতদরিদ্র ও বিপন্ন অযুত-নিযুত মানুষের স্বপ্নের ভারতরূপে সেই স্বাধীনতা লাভের পর হইতেই তাহাদের মনের মণিকোঠায় টিম টিম করিয়া জ্বলিতেছে।
যুগে যুগে এই বিশ্বকে যাহারা নূতনরূপে, নূতন আদলে, নূতন অবয়বে গড়িয়া তুলিয়াছেন, মোদীও তাহাদের একজন রূপে আত্মপ্রকাশ করিবেন। এমনটাই তাহাদের ভাবনা। এই কথাতো অস্বীকার করা যাইবে না যে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে মোদী ও তাহার দল ভারতীয় রাজনীতির দীর্ঘ লালিত ধ্যান-ধারণাকে গুঁড়াইয়া দিয়াছে। সেখানকার মূল রাজনৈতিক সত্তারূপে এতকাল প্রতিভাত সকল বিষয়কেই সম্পূর্ণরূপে উপড়াইয়া ফেলিয়াছেন তিনি। গান্ধী-নেহেরু-প্যাটেল-আজাদের পদাংক অনুসরণে ভারত এতকাল যেই পথে হাঁটিতেছিল এখন হইতে হয়তো সেই পথেরও পরিবর্তন হইতে চলিয়াছে। নির্বাচনের পূর্বে আমরা নরেন্দ্র মোদীর যে অবয়ব এবং ব্যক্তিত্ব দেখিয়াছি, নির্বাচনোত্তর সময়ে সেই ক্ষেত্রে খানিক পরিবর্তনও দিনকে দিন লক্ষণীয় হইয়া উঠিতেছে বৈ কী!
নির্বাচনে জয়লাভের জন্য তখন হয়তো তিনি অনেক কথাই বলিয়াছেন এবং প্রধানমন্ত্রীরূপে তিনি যখন আজ বাস্তবের জমিনে দাঁড়াইয়া গোটা পরিস্থিতি এবং উহার তাত্পর্য মূল্যায়ন করিতেছেন এবং ভবিষ্যতেও করিবেন, সেইক্ষেত্রে সেই মূল্যায়নে দৃশ্যতঃ খানিক ফারাক থাকাটাই তো স্বাভাবিক! সুতরাং, একটি নূতন ভারতের স্বপ্নের অঞ্জন চোখে মাখিয়া যাহারা নরেন্দ্র মোদীর দিকে তাকাইয়া রহিয়াছেন তাহাদের সেই স্বপ্ন পূরণের গুরুদায়িত্ব কাঁধে লইয়া কর্মবীর মোদী নেতৃত্বের ইতিবাচক সকল প্রকার প্রজ্ঞা প্রদর্শনের মাধ্যমে উহা পূরণে ব্রতী হইবেন, এমনটি আশা করা যায়। তাহাদের সেই আশা-প্রত্যাশা পূরণ করিতে মোদীর নেতৃত্বাধীন কাফেলা দৃপ্তপদভারে আগাইয়া যাইবে এমনটি মনে করা অসঙ্গত নহে নিশ্চয়ই!
প্রতিবেশী দেশগুলি মোদীর এই অভূতপূর্ব সাফল্যে বিস্মিত হইলেও তাহাকে অভিনন্দন জানাইতে কেহই কোন কার্পণ্য করে নাই। একমাত্র পাকিস্তান ব্যতিরেকে প্রতিবেশী অন্য সব দেশের সহিত ভারতের বিরোধ খুব বড় ধরনের কিছু নহে। সুতরাং, আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা লইয়া এইসব ছোট-খাটো বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটানো ভারতের নয়া প্রধানমন্ত্রীর জন্য খুব কঠিন ব্যাপার নহে। এইসব বিরোধ বা ইস্যু কাঁটার ন্যায় বিধিয়া থাকিবার মতো কোন ইস্যু নহে। সুতরাং এইগুলির সমাধান করিবার দিকে তাহার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকিবে বলিয়া মনে করা যাইতে পারে।
নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনী উত্থান ভারতের কাঠামোগত কোন বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা কিনা উহা সময়ই বলিয়া দিবে একদিন। তবে আমরা আশা করিব তিনি এতদঞ্চলে শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির আলো প্রজ্বলিত করিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখিবেন। আমরা ভারতের এই নবচেতনায় উজ্জীবিত প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাই, জানাই আবারও অভিনন্দন।
