স্মরণ

গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী কে.এম. চাঁদ মিয়া

আপডেট : ২৫ মে ২০১৪, ২২:২৮
প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী কে.এম. চাঁদ মিয়া গত ২৪ মে মৃত্যুবরণ করেন। আমাদের সঙ্গীত জগতে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল তারকা। এদেশের পল্লীসঙ্গীত ও রাজনীতি বিষয়ক গণসঙ্গীত রচনায় তিনি ছিলেন তুলনাহীন। শুধু গান রচনা, সুরারোপ ও সঙ্গীত পরিবেশনেই তার খ্যাতি ছিল না, বেতার ও টিভির অনেক সঙ্গীত আলেখ্য তিনি পরিচালনা করেছেন। তবে মঞ্চে গণসঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমেই তার সঙ্গীত জীবনের শুরু। তখন তিনি স্কুলের ছাত্র। সেই ১৯৫৪ সালের কথা। সামনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন। মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু ও মোল্লা জালালউদ্দীন এসেছেন গোপালগঞ্জে কোটালীপাড়ার কুশলার মাঠে। নির্বাচনী জনসভা। কিশোর চাঁদ মিয়া ঐ জনসভায় নিজেই গান রচনা করে এবং গেয়ে সবাইকে অবাক করে দেন। খুশি হন মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু, মোল্লা জালালউদ্দীনসহ উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা। খুব খুশিই শুধু হলেন না জাতীয় নেতৃবৃন্দ, সে রাতেই বঙ্গবন্ধু কিশোর চাঁদকে নিয়ে গেলেন তাঁর তত্ত্বাবধানে। থাকা, খাওয়া ও লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেন নিজে। কিশোর চাঁদের আশ্রয় জুটলো বঙ্গবন্ধুর টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে। গান রচনা, সভায় গান গাওয়া ও পড়াশোনাই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ। পড়াশোনা শেষ করে কে.এম. চাঁদ মিয়া পূর্বের ইপসিক-খুলনা এবং ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে চাকরি গ্রহণ করেন। চাকরির পাশাপাশি তিনি সঙ্গীত চর্চা চালিয়ে যান। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময় কে. এম. চাঁদ মিয়া যে সকল গণসঙ্গীত রচনা এবং পরিবেশন করেছিলেন, তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গানের প্রথম কলি— ‘চাষি মরছ না খাইয়া, আজ দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করি স্বাধীনতা পাইয়া, পরগারের নৌকা বন্ধু এলো রে, তোরা আয় চাষি ভাই, আয় তাঁতী ভাই, আয় দুখি ভাই, আয় রে ছলছলাছল কলকলাকল চলরে তরি বাই, তরির কর্ণধার আজ শেখ মুজিবুর, জালেমশাহি খতম করতে আয় ছুটি সব আয় রে’... প্রভৃতি। ১৯৭১ সালে কে. এম. চাঁদ মিয়া মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই তখন সঙ্গীত রচনা করতেন এবং পরিবেশন করতেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়েন। পরবর্তীকালে তাকে নিয়ে অনেক গান রচনা করেন। মূলত লোকসঙ্গীতের ধারায় পল্লীগীতি ও সমকালীন বিষয়কে নিয়ে গান রচনায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সাদাসিধে এই মানুষটি সবার কাছে ছিলেন ভীষণ প্রিয়। সবাই তাকে ‘চাঁন ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন। নিরহঙ্কারী এই মানুষটি জীবদ্দশায় কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। অথচ আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী থেকে কাজ করেছেন। আর তাঁর রচিত পল্লীগীতি ও দেশাত্মবোধক গান নীনা হামিদ, রথীন্দ্রনাথ রায়, ইদ্রমোহন রাজবংশী, মলয় কুমার গাঙ্গুলি, বিপুল ভট্টাচার্য, কিরণচন্দ্র রায়, সুফিয়া মনোয়ার, চন্দনা মজুমদার, ফুলরেণু দাস প্রমুখ গেয়ে মানুষের মন জয় করেছেন। কে. এম. চাঁদ মিয়া ১৯৪২ সালের ১ ডিসেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলাধীন পবনার পাড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। দৌলতপুর বি.এল. কলেজ থেকে আই.কম. এবং আজম খান কমার্স কলেজ থেকে বি.কম. পাস করেন। এরপর খুলনা সিটি ল কলেজে আইন বিভাগে অধ্যয়ন করেন। তিনি তখনকার ইপসিক অফিসে খুলনায় চাকরিতে যোগদান করন। একই সাথে চাকরি ও গান লেখার কাজ চালিয়ে যান। পড়াশোনার মধ্যেও গানের প্রতি তাঁর ছিল অত্যন্ত আগ্রহ। তিনি স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করে অনেক সুনাম অর্জন করেন। তাঁর রচিত বেশক’টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। আমরা তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। লেখক: শিশু সাহিত্যিক