কয়েকদিন পরেই ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য সরকারের বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপিত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে যে, এবারের জাতীয় বাজেটের আকার হতে যাচ্ছে ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার চেয়েও বেশি। বাজেটের আকার, আয়ের উত্স, শুল্কহারের হ্রাস-বৃদ্ধি, বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ইত্যাদি বিষয়সহ বাজেটের খুঁটি-নাটি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, তর্ক-বিতর্ক, দেন-দরবার চলছে পুরোদমে। আমলা-কর্মচারীরা হিসাব মেলাতে ক্লান্তিহীন গলদঘর্ম দিন (ও রাত) কাটাচ্ছে। বাজেটের এসব খুঁটি-নাটি বিষয়ের প্রতি দেশবাসীর দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা হয়েছে। সেভাবেই বাজেট নিয়ে আলোচনার তোলপাড় চলবে বেশ কিছুদিন ধরে। কিন্তু বাজেটের আসল বিষয় নিয়ে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক সামান্যই হবে। সেই আসল বিষয়টি হলো বাজেটের আর্থ-সামাজিক লক্ষ্য ও অর্থনৈতিক দর্শনগত ভিত্তির কথা। বাজেটের অর্থনৈতিক-সামাজিক দর্শনের ক্ষেত্রে একটি প্রধান প্রশ্ন হলো— পুঁজিবাদ না সমাজতন্ত্র, কোনটা হবে বাজেটের লক্ষ্যাভিমুখ? কোনটা হওয়া উচিত বাজেটের দিক-দর্শন? এ প্রশ্নের সঠিক জবাবের জন্য আমাদেরকে যেতে হবে ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের’ কাছে। মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণীর মাঝেই রয়েছে এ প্রশ্নের দ্ব্যর্থহীন স্পষ্ট জবাব। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদের মাঝে এ জবাব অনেকটা খুঁজে পাওয়া যাবে। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের পঞ্চদশ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উত্পাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং ... নাগরিকদের জন্য... (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিত্সাসহ জীবন-ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;...”। এখানে স্পষ্টতই ‘পরিকল্পিত অর্থনীতির’ কথা বলা হয়েছে। ‘অবাধ খোলাবাজার অর্থনীতির’ পথ-নির্দেশ করা হয়নি। তাছাড়া ‘অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিত্সা...’ ইত্যাদি ‘জীবন-ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা’ করাটাকে ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসবের ব্যবস্থা ‘ব্যক্তিমালিকানাধীন বাজার ব্যবস্থার’ উপর ন্যস্ত করার কথা বলা হয়নি। বিষয়টির আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক।
প্রশ্ন হলো, কি ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্য? এক্ষেত্রে অবশ্য প্রথমেই যে প্রশ্নটি মীমাংসা করে নেয়া দরকার তা হলো, মুক্তিযুদ্ধের আদৌ কোনো অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্য ছিল কী?
একথা সবাই স্বীকার করবে যে, বাঙালি জাতির এযাবত্কালের শ্রেষ্ঠ অর্জন হলো তার মুক্তিযুদ্ধ। ‘মুক্তি’ লাভের প্রয়াসে তার এই ‘যুদ্ধ’ কোনোমতেই একটি প্রশ্নবিদ্ধ ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ তত্পরতা ছিল না। তা ছিল অনেক বছরের অসংখ্য সংগ্রাম-আন্দোলনের প্রক্রিয়ায় তিল-তিল করে গড়ে ওঠা একটি প্রগতিশীল বিপ্লবী ধারার জাতীয় মুক্তির লড়াই। পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে তার পূর্বাংশে অর্থাত্ পূর্ব পাকিস্তানে একই চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নতুন নামের (বাঙলাস্থান নামও তো হতে পারত) একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চেতনা-ধারা। তাতে প্রবিষ্ট ছিল রাজনৈতিক, মতাদর্শিক, সামাজিক মাত্রিকতার সাথে সাথে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নীতি-লক্ষ্য-উপাদান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারা হলো এসব উপাদানের সম্মিলিত প্রকাশ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারা মোটেই কেবল কোনো বিমূর্ত বায়বীয় বা শ্লোগান ভাবাবেগের বিষয় শুধু নয়। তার রয়েছে সুনির্দিষ্ট রূপ ও উপাদান। সংবিধানে এবং আরো নির্দিষ্ট করে বললে, সংবিধানে ঘোষিত চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মাঝেই ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার মূর্ত প্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা এই চারনীতির সম্মিলনে রচিত একটি একক ও অখণ্ড সত্তা। এটাকে খণ্ডিত করা যেতে পারে না। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে চার নীতির কোনো নীতিকেই বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের মূলনীতি নিয়ে আজ আলোচনায় যাওয়া হচ্ছে না। শুধু সমাজতন্ত্র নিয়েই এই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে।
সমাজতন্ত্রকে বাদ দেয়া অথবা পুনঃসংজ্ঞায়িত করার কথা তোলা হয়েছে। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির কথা তুলে ‘সমাজতন্ত্র’ বাদ দেয়ার অর্থ দাঁড়াবে মুক্তিযুদ্ধের ধারার গুরুতর অঙ্গহানি ঘটিয়ে তাকেই পরিত্যাগ করা। সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকা বা না-থাকার উপর রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ থাকবে কি থাকবে না তা নির্ধারিত হওয়া উচিত বলে যদি যুক্তি তোলা হয়, তাহলে একই যুক্তিতে দেশের স্বাধীনতা অর্জনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা থেকে কাউকে বিরত রাখার কারণ থাকে না। সোভিয়েতের উপস্থিতির বিশ্ব বাস্তবতায় সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রকে বিফল করে, মার্কিন সপ্তম নৌবহরের প্রত্যক্ষ আগ্রাসনের বিপদকে মোকাবিলা করে, ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির দ্বারা শক্তিশালী হয়ে এবং তার সুযোগে মিত্রবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তা আকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত করে আমরা যেভাবে নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলাম, বর্তমানে সোভিয়েতের অনুপস্থিতিতে কি সে বিজয় সেভাবে সম্ভব হতো? তাহলে কি পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতার কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল বিজয়কে আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে? দেশকে কি তাহলে পাকিস্তানি গোলামি ও সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের কাছে তুলে দিতে হবে?
পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য যে বদলে গেছে, সে কথা ঠিক। কিন্তু সমাজতন্ত্র তো নিঃশেষ হয়নি। চীন, কিউবা, ভিয়েতনাম প্রভৃতি সমাজতান্ত্রিক দেশ টিকে আছে। ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়াসহ ল্যাটিন আমেরিকা একের পর এক দেশ সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য ঘোষণা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। নেপালে, ভারতের ত্রিপুরায় সমাজতন্ত্রের পক্ষের দল ক্ষমতাসীন। তাছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশে সমাজতন্ত্রের পক্ষে কমিউনিস্ট, বামপন্থি ও প্রগতিবাদী শক্তি প্রবল প্রতিকূলতার মুখেও মানবমুক্তির লক্ষ্যে বহুমুখী ধারায় তাদের সংগ্রাম জোরদার করছে। আগপিছ করে, আঁকাবাঁকা পথে সমাজতন্ত্রের শক্তি ও আন্দোলন আবার উজ্জীবিত হয়ে উঠছে। তারা কি কেউ পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতার কারণ দেখিয়ে সমাজতন্ত্রের আদর্শ ও লক্ষ্য ত্যাগ করেছে? বাংলাদেশ তাহলে সমাজতন্ত্রের নীতি ও লক্ষ্য ত্যাগ করবে কেন?
মৌলিক আরেকটি প্রশ্ন এক্ষেত্রে থেকে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু শক্তিশালী সোভিয়েত সমর্থন পাওয়ার জন্যই কি আমরা সমাজতন্ত্রের নীতি ঘোষণা করেছিলাম? সমাজতন্ত্রের নীতি গ্রহণ করাটা কি নিছক একটা উপযোগিতার (expediancy)-র ব্যাপার ছিল, নাকি তা ছিল এদেশের গণমানুষের ধারাবাহিক গণসংগ্রামের প্রতিফলন, সমাজের নিজস্ব অভিজ্ঞতালব্ধ আদর্শিক উপলব্ধি? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, দীর্ঘদিনের সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার পথ হিসেবে তৃণমূল থেকেই ‘সমাজতন্ত্রে’র লক্ষ্যটি উত্থিত হয়েছে। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য পরিত্যাগ করাটা তাই হবে জাতির ইতিহাসের অর্জনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।
অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিত্সা ও বাসস্থান— এই পাঁচটি মৌলিক চাহিদা পূরণ করা এবং সক্ষম সব মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করাটা যে সমাজের এবং সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব— এই দাবি বহু পুরোনো। সেই চল্লিশের দশক-পঞ্চাশের দশকের গোড়া থেকে এই দাবি ব্যাপকভাবে উত্থাপিত ও উচ্চারিত হয়েছে। ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১-দফায় এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক, বীমা, বৃহত্ শিল্প জাতীয়করণের দাবি। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, পরিকল্পিত অর্থনীতি, সমবায়, ভূমিসংস্কার ইত্যাদি দাবিগুলোও ক্রমান্বয়ে যুক্ত হয়েছে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ভিত্তি ঐতিহাসিক ১১-দফাতেও এসব কর্মসূচি ও দাবি স্পষ্টভাবে ছিল। ’৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের ইশতেহারেও সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যসহ এসব কর্মসূচির কথা ছিল। দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যে কর্মসূচি, নীতি ও লক্ষ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, ‘পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতার’ একটি সাময়িক একপেশে ও মনগড়া ব্যাখ্যাকে যুক্তি হিসেবে দেখিয়ে তা থেকে সরে আসার কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হলে তা একটি দুরভিসন্ধিমূলক ও বিশ্বাসঘাতকতার ষড়যন্ত্র বলেই চিহ্নিত হবে।
অনেকে ভাবতে পারেন যে, ’৭২-এর সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ একটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষিত হলেও অর্থনৈতিক নীতি ও ব্যবস্থা সম্পর্কে সেখানে স্পষ্ট কোনো কথা হয়তো নেই। এই ধারণা যে কত বড় ভুল তা প্রমাণ করতে সংবিধান থেকে কতগুলো উদ্ধৃতি তুলে দেয়াই যথেষ্ট। ১৯৭২ সালে খসড়া সংবিধান-প্রণয়ন কমিটির রিপোর্টের ১২ নং প্যারায় বলা হয়েছে, “সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের কাছে আমাদের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কিত বিধানগুলোতে তার প্রতিফলন ঘটেছে। ... সমাজতান্ত্রিক অর্থ-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকল্পে যেসব আইন প্রণীত হবে, সেগুলো বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় পড়বে না”।
সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, “যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে... প্রাণোত্সর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল —জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।” প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হইবে... এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা— যেখানে ... রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।”
সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি প্রসঙ্গে একেবারে শুরুতেই ৮ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা— এই নীতিসমূহ... রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।” তারপরে ১০ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত, ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।”
১৩তম অনুচ্ছেদে মালিকানা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘উত্পাদনযন্ত্র, উত্পাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালীসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ এবং এই উদ্দেশ্যে মালিকানা-ব্যবস্থা নিম্নরূপ হইবে: (ক) রাষ্ট্রীয় মালিকানা, অর্থাত্ অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান প্রধান ক্ষেত্র লইয়া সুষ্ঠু ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি খাত সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের মালিকানা; (খ) সমবায়ী মালিকানা, অর্থাত্ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সমবায়সমূহের সদস্যদের পক্ষে সমবায়সমূহের মালিকানা এবং (গ) ব্যক্তিগত মালিকানা, অর্থাত্ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যক্তির মালিকানা”। লক্ষণীয় যে, সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে প্রাধান্য দিয়ে সমবায়ী ও ব্যক্তি মালিকানাকে আইনের দ্বারা সীমাবদ্ধকৃত অবশিষ্টাংশ সম্পদ (residual)- হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
তার পরে-পরেই ১৪তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে— কৃষক ও শ্রমিককে— এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি প্রদান করা।’ ২০তম অনুচ্ছেদে কর্মসংস্থান ও কর্ম সম্পর্কে বলা হয়েছে, “কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় এবং ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী’— এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।” উল্লেখ্য যে, এখানে ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে...কর্মানুযায়ী’ সংবিধানের এই কোটেশনে উদ্ধৃত অংশটি মার্কস-এঞ্জেলস রচিত ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ থেকে হুবহু উদ্ধৃত করা হয়েছে।
সংবিধান থেকে এ ধরনের আরো উদ্ধৃতি দিয়ে স্পষ্টভাবে দেখানো যায়, কোন ধরনের অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্য অনুসরণের স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। একথা পরিষ্কার যে, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক-সামাজিক দর্শন কী হবে সে সম্পর্কে সংবিধানে অস্পষ্টতা রাখা হয়নি। পরিকল্পিত অর্থনীতি, অর্থনীতির প্রধান প্রধান ক্ষেত্রগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানা, নাগরিকদের জীবন-ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, মেহনতি মানুষ তথা কৃষক-শ্রমিকের উপর শোষণের অবসান, অনুপার্জিত আয় ভোগ করার সুযোগ বন্ধ, কর্মক্ষম মানুষের জন্য কাজের অধিকার নিশ্চিতকরণ, সকলের জন্য কাজের গুণ ও পরিমাণ অনুযায়ী পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা, সুযোগের সমতা, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, সাম্যের সমাজ নির্মাণের লক্ষ্য— এসব কথা স্পষ্টভাবে সংবিধানে লেখা আছে। এগুলোই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্যের রূপরেখা। ‘মুক্তিযুদ্ধের’ বাংলাদেশে এই দিক-নির্দেশনা অনুসরণ করে রচিত বাজেট ব্যতীত ভিন্ন কোনো লক্ষ্য ও দর্শনকে ভিত্তি করে রচিত (সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর বাজার অর্থনীতির দর্শনভিত্তিক পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী ধারা অনুসরণ করে রচিত) কোন বাজেটকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা অনুসারী বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে না। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার’ পক্ষে বক্তৃতায় মুখে ফেনা তুলতে কোনো কার্পণ্য না করলেও গত প্রায় চার দশক ধরে বাজেট রচিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার বিরুদ্ধ পথে। এ এক প্রহসন ও প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের অর্থনীতির রূপরেখা রচিত হয়েছিল। দেশি-বিদেশি শোষকদের ষড়যন্ত্র ও আঘাতে তার বাস্তবায়ন হোঁচট খেতে পারে, অল্প-বেশি কাল রহিত হয়ে বিপথগামী হতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের-অর্থনীতির রূপরেখা বাস্তবায়নের পথকে চিরদিন রোধ করে রাখার ক্ষমতা কারো হবে না। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ আজো শেষ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত নবপর্যায়ের সংগ্রামে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার মধ্যদিয়েই ‘মুক্তিযুদ্ধের ধারায় বাজেট’ রচনার পথ সৃষ্টি করতে হবে।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)
[email protected]
