আজকাল সমাজ ভাবনার ক্ষুধায় অগ্নিমান্দ্য চলছে। সমাজ ধাবিত হচ্ছে এক অপরাধী দায়িত্বহীন জীবনযাপনে। অবিশ্বাসী ও আত্মতৃপ্ত মানুষ শুধু আত্মস্বার্থ সিদ্ধির মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে। সমাজে চলছে প্রতিযোগিতা। পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, পূর্ণ আত্মবিকাশের জন্য যে প্রয়োজন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তা শুধু স্বার্থসিদ্ধিতে জাত হারাবে কেন? সংঘটিত লৌকিক ধর্ম, ফলিতবিজ্ঞান ও দর্শন আমাদের উপহার দিয়েছে নবজীবন-প্রণালী কিন্তু আমরা কিভাবে সুস্থ সমাজে বসবাস করতে পারি তার কোন সুস্পষ্ট দিশা দিতে সক্ষম হয়নি। সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে মমতা প্রাণিত চেতনা ও সংযোগ স্থাপনের যে শিক্ষা সুষ্ঠু সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন যে বিদ্যার্থীদের সুশিক্ষা, চারিত্রিক উত্কর্ষতা ও সামাজিক মানসিকতার জন্ম দিতে সমর্থ সে সম্বন্ধে আমরা একেবারে উদাসীন।
সমাজসেবা শিক্ষা বিদ্যালয়ে অবশ্য পাঠ্য না হলেও কিছু কিছু বিদ্যালয় স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সমাজসেবা যে করে থাকে সে সম্বন্ধে আমরা একেবারে যে অবহিত নই তা নয়। তবে সামান্য কিছু মাটি কাটিয়ে, রাস্তাঘাটে সাফাই অভিযান চালিয়ে, প্রাপ্তবয়স্কদের অক্ষর-জ্ঞান দিয়ে বা অনুরূপ কিছু করে যে সমাজসেবা করা হচ্ছে সেগুলোর পরিধি নিতান্ত অপ্রশস্ত ও একেবারে নগণ্য। এ প্রবন্ধে বিচার্য উন্নততর সমাজসেবার মানসিকতার অনুশীলন। সমাজসেবা বলতে এখানে মানবিক মমতা, সমাজের সার্বিক উত্কর্ষতা, জাতীয়তাবোধ, মানবীয় সম্পর্ক ও সহমর্মিতার মানসিকতা গঠনের শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে। আমাদের সমাজে যা প্রকট হয়ে উঠেছে সেটা হচ্ছে আত্মস্বার্থ পূর্তির প্রতিযোগিতা। সমাজ রয়েছে ব্যাক সিটে। প্রত্যেকটি শিক্ষার্থী আজ দেশ, সমাজ এমনকি নিজেদের পিতা-মাতাকে ভুলে প্রবাসী হচ্ছে। হারিয়ে ফেলছে নিজেদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা-আকর্ষণ। ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের অন্তরোস্থিত সমাজ ভাবনা। আমাদের উচ্চ মেধার শিক্ষার্থী প্রবাসে গবেষণা করে নানা পুরস্কার পাচ্ছে—এর নজির রয়েছে। এ ধারা বর্তমানে সমাজে চলছে। এভাবে রেনড্রেন যদি চলতে থাকে, তাহলে এমন দিন আসবে যখন আমরা এক সেকেন্ড গ্রেট জাতিতে পরিণত হব। এ দেশে উন্নতমানের ডাক্তার, সুনিপুণ ইঞ্জিনিয়ার, যোগ্য অধ্যাপক, সুদক্ষ প্রশাসক, সাহিত্যিক বা কর্মশীল রাজনীতিবিদের দেখা মিলবে না। এ অবস্থার আভাস আমরা এখন যে পাচ্ছি না তা নয়। দেশে অধুনা সরকারি বৃত্তি এবং গবেষণা করার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া সত্ত্বেও সম্পদ ও প্রতিপত্তির পূর্ণতা লাভের জন্য এ সমস্ত শিক্ষার্থী দেশ ও সমাজকে ত্যাগ করতে দ্বিধাবোধ করছে না। তারা পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে। যে দেশ ও সমাজ তাদের মানুষ হতে এত কিছু দিয়েছে তা তারা যেন বেমালুম ভুলে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আমাদের সরকারি কর্মকর্তারা যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী। লাল ফিতার বাঁধন, স্বজনপোষণ নীতি ও সর্বোপরি সর্বস্তরে ব্যাপ্ত দুর্নীতি, যোগ্য শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা পেতে প্রতিনিয়ত অন্তরায় সৃষ্টি করছে। ফলে তারা বিদেশমুখী হচ্ছে। তাছাড়া, পাশ্চাত্য জীবনধারায় অভ্যস্ত এবং অনুপ্রাণিত হয়েও ভ্রান্ত মূল্যবোধে আকর্ষিত হয়ে এ সমস্ত বিদ্যার্থী সমাজকল্যাণ উপেক্ষা করে ব্যক্তিস্বার্থ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছে। শিক্ষার মাধ্যমে সমাজের প্রতি দায়-দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার এবং সমাজে মানবিক সম্পর্ক রক্ষার কোন প্রচেষ্টা তাদের কাছে মান্যতা লাভ করছে না। প্রত্যেকটি মানুষ সৃষ্ট হচ্ছে সম্পদ সমৃদ্ধ এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। হারিয়ে ফেলছে হূদয়ের ঐশ্বর্য। তাই শিক্ষাবিভাগ ও শিক্ষকদের একটা বিশেষ দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন মানসিকতা গড়ে তোলা যাতে তারা পরবর্তীকালে সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ মানবিক জীবনযাপন করতে তত্পর হয়ে ওঠে। তাদের এ অবদান ভবিষ্যতে সামাজিক জীবনে অবশ্যই বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
বর্তমান শিক্ষারীতিতে সেবা, সমাজ ভাবনা ও মমতার আদর্শ শিক্ষার কোনো স্থান নেই। নেই শিশুদের অন্তরে সুপ্ত সমাজচেতনাকে বিকশিত করার কোন অনুপ্রেরণা। তাই বোধকরি ভোগবাদমুখর সতত চঞ্চল আধুনিক সমাজে এ সমস্ত তরুণমতি শিক্ষার্থী দল সমাজসেবার আদর্শ ও মানসিকতা পেছনে ঠেলে দিয়ে অর্থসর্বস্ব জীবনমুখী হয়ে পড়ছে। আত্মস্বার্থ উপেক্ষা করে পরার্থ কামনা তাদের কাছে উপহাসের বস্তু। ক’বছর আগে সরকার নির্দেশ জারি করেছিল যে প্রত্যেক ডাক্তারকে গ্রামে-গঞ্জে অন্তত দু’তিন বছর চিকিত্সার কাজে লিপ্ত হতে হবে—তাতে প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার সঙ্গে সমাজসেবার যে অবিচ্ছেদ্য সংযোগ তাই উচ্চারিত হচ্ছে। সমাজসেবা ভাবনা আমাদের সমাজজীবন থেকে নির্বাসিত বলে আইন করে সমাজসেবার আদর্শের কথা বলতে হচ্ছে। তবে এটি সত্য বিশেষ নিয়ম-কানুন করে স্বার্থান্বেষী মানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়—যদি না আদর্শগতভাবে তা গৃহীত হয়। সেজন্য শিক্ষাসূচির মধ্যে সমাজসেবার আদর্শ ও কর্তব্য আবশ্যিকভাবে সংযোজন করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। পরোপকারই জীবন। পরহিত চেষ্টার অভাব মৃত্যু। অপরের জন্য কিছু করলে ভেতরে শক্তির উন্মেষ হয় এ নীতিবোধ তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। তা না হলে সমাজে যে ট্রেন্ড বা ধারা চলছে তাতে আমাদের জাতীয় সত্তা অচিরে লুপ্ত হয়ে যাবে। আমাদের এ অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান আমরা কিভাবে প্রয়োগ করব তা আমাদেরকেই ভাবতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক
