আমি দীর্ঘ তেত্রিশ বছর ব্যাংকে চাকরি করে বর্তমানে অবসরে আছি। এই তেত্রিশ বছরের মধ্যে আমি প্রায় বাইশ বছর শাখা ব্যবস্থাপক ছিলাম। ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, সিরাজগঞ্জসহ আমি বিভিন্ন ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার শাখা ব্যবস্থাপক ছিলাম। চাকরি জীবনে হাজার হাজার কাস্টমারের সাথে আমার সম্পর্ক হয়। এখনো অনেকে আমাকে ফোন করে আমার সাথে ঐ সমস্ত কাস্টমাররা কুশল বিনিময় করেন। আমি যখন বিআরসির রিক্রুটমেন্টের মাধ্যমে প্রথম ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার ৫ম গ্রেডে চাকরিতে যোগদান করি তখন ব্যাংকের লেনদেন আওয়ার ছিল সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত। আর অফিস আওয়ার ছিল বিকেল ৫ টা পর্যন্ত। তবে ব্যাংকাররা সকাল সাড়ে ৮ টায় ব্যাংকে আসে আর অধিকাংশ দিনই রাত ৮টা সাড়ে ৮টায় বাসায় যায়। ব্যাংকের মাধ্যমেই দেশের সমস্ত ব্যবসা পরিচালিত হয়। আর যারা ব্যবসা করেন না তারাও তাদের আমানত ব্যাংকে রক্ষিত করার নিমিত্তে ব্যাংক লেনদেন করে থাকেন। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ব্যাংকের ভূমিকা প্রধান এবং অপরিসীম। ব্যাংকের লোকেরা খুব কম ছুটি কাটান। আমার ৩৩ বছর চাকরিতে আমার ৩৩ মাস অর্জিত ছুটি হয়েছে তবে আমি আমার চাকরি জীবনে সর্বমোট তিন মাসও অর্জিত ছুটি ভোগ করিনি। এমনকি বছরে ১৫ দিন ক্যাজুয়াল ছুটিও পুরাটা ভোগ করার সময় পাইনি। একটা আমার একার বেলায় প্রযোজ্য নয় সমস্ত ব্যাংকারের জন্য প্রযোজ্য। ব্যাংকাররা এমনকি ঈদের ছুটিও ঠিকমত ভোগ করতে পারে না। অনেক সময় দেখা যায় ঈদ উপলক্ষে সরকার তিনদিন ছুটি ঘোষণা করিলেও সপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ঐ ছুটি ৫/৬ দিন হয়ে যায়। কিন্তু ব্যাংকাররা একটানা ৫/৬ দিন ছুটি ভোগ করতে পারে না। ঐ ৫/৬ দিনের মধ্যে সরকার অন্তত ১দিন ব্যাংক খোলা রাখে। অতএব ব্যাংকাররা স্টেশন লিভ করে ঈদ করতে দেশের বাড়িতেও যেতে পারে না। ব্যাংকাররা এই সমস্ত বঞ্চনাও মেনে নেয়। শুধু কাস্টমারদের অসুবিধা হবে এ জন্য ব্যাংকাররা সমস্ত কষ্ট মাথা পেতে মেনে নেয়। ব্যাংকারদের আরো অনেক কষ্ট আছে যা বর্ণনা করতে গেলে আমার লেখা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই সংক্ষেপে কিছু কথা লিখব। যখন ব্যাংকের লেনদেন আওয়ার ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ছিল তখন ব্যাংকাররা দুপুর ১টার পরে নামাজ পড়ে দুপুরের খাবার শেষে আবার দু’টার দিকে অফিসের কাজ শুরু করতো। বিকেল ৫টায় ছুটি হলেও কাজ শেষ না করে ব্যাংকাররা অফিস ত্যাগ করতো না। কিন্তু এখন ব্যাংকের লেনদেন আওয়ার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আর অফিস সময় বিকেল ৬টা পর্যন্ত। লেনদেন আওয়ার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সরকার বলে দিয়েছে দুপুরে জোহরের নামাজ ও খাবার সময় ৪৫ মিনিট তবে তার মধ্যেও গ্রাহকদের লেনদেন অব্যাহত রাখতে হবে। তার মানে কি দাঁড়ায় ব্যাংকারদের জন্য কোন লাঞ্চ আওয়ার নেই। আমি চাকরি জীবনে দুপুরের খাবার কোনদিন বিকেল ৪টার আগে খেতে বসিনি। আমার অফিসের অন্য কেউই বিকেল ৪টার আগে দুপুরের খাবার খেতে বসেনি এবং বসে না। এর মধ্যে যদি কেউ খেতে বসে যায় সেখানে কিছু কিছু গ্রাহক এমন আচরণ করে যে ব্যাংকের লোকের আবার কিসের খাবার ? না খেয়ে হলেও আমার কাজটা দ্রুত শেষ করে দিক। এই হলো ব্যাংকারদের চাকরি জীবন। অথচ ব্যাংকের চাকরি হলো ইমারজেন্সী সার্ভিস-এর আওতায়। তাই আজ আমি প্রস্তাব করছি যে ব্যাংকের লেনদেন আওয়ার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত, তারপর দুপুর ১টা হইতে দুপুর ২টা পর্যন্ত ব্যাংকারদের নামাজ ও লাঞ্চ আওয়ার। এই সময় সমস্ত প্রকার লেনদেন বন্ধ থাকবে। আবার দুপুর ২টা ১ মি. হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত লেনদেন চলবে। তারপর বিকেল ৬টা পর্যন্ত ব্যাংকারদের অফিস আওয়ার পূর্বের মতই বহাল থাকবে। আমার এই প্রস্তাবনা অত্যন্ত মানবিক কারণে সরকারের বিবেচনা করার জন্য আমি সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। অন্যথায় বর্তমান অবস্থায় বিরাজমান থাকিলে ব্যাংকারদের প্রতি অমানুষিক আচরণ করা হবে। ব্যাংকাররা গ্যাষ্ট্রিক আলসার পেপটিক আলসারে ভুগে ভুগে তাদের আয়ু কমে যাবে। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা অত্যন্ত মানব দরদী বিধায় তাঁর সুবিবেচনায় ব্যাংকাররা এই মানবিক সুযোগটুকু পাবে।
লেখক:ব্যাংকার ও সাবেক ছাত্রনেতা
