তার পরিচয় দেওয়া বাহুল্য, তাকে চেনানোর চেষ্টা বাতুলতা। তার নাম উচ্চারণ করাই যথেষ্ট—পেলে।
সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার, তিন বারের বিশ্বকাপজয়ী এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো পেলেরও দুঃখ আছে। আর সব ব্রাজিলিয়ানের মতো আজও তার চোখ ভরে যায় সেই ১৯৫০ বিশ্বকাপের মারাকানা ট্রাজেডির কথা মনে পড়লে। বাবার চোখে দেখা সেই জল এবার আর কোনো ব্রাজিলিয়ানের চোখে দেখতে চান না। ফিফাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে বিশ্বকাপ নিয়ে বলেছেন পেলে
পেলে
আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকী; ব্রাজিলে আবার বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে। ১৯৫০ বিশ্বকাপের কিছু মনে আছে আপনার?
অনেক কিছু মনে আছে। তবে বিশেষ করে সবার মতোই মনে আছে, ব্রাজিলের সেই হার। সেই প্রথম আমি আমার বাবার চোখে জল দেখেছিলাম। আমার তখন নয় কী দশ বছর বয়স। মনে আছে, বাবা রেডিওর পাশে বসে কাঁদছেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কাঁদছ কেন, পাপা?’ বাবা শুধু ধরা গলায় বলেছিল, ‘ব্রাজিল বিশ্বকাপ হেরে গেছে, বাবা।’ ঈশ্বর আমার প্রতি খুব দয়ালু। কারণ, আট বছর পর আমি বিশ্বকাপ জেতা দলে ছিলাম। চারটি বিশ্বকাপ খেলেছি, তিনটি জিতেছি। আমি বলতে পারি, ঈশ্বর আমাকে সব দিয়েছেন।
আপনি আগেও বলেছেন, বাবার সেই কান্না আপনার ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলেছে। ঠিক কিভাবে, আরেকবার বলবেন?
আমার বাবাও ফুটবলার ছিলেন। সেদিন (মারাকানা ম্যাচের দিন) আমাদের কয়েকটা বন্ধুকে বাবা ডেকে রেডিওর সামনে বসিয়েছিলেন। আমি ছাড়া বাকীরা বাবার বন্ধুর ছেলে ছিল। আমরা অতো কিছু বুঝতাম না। শুধু বুঝলাম হঠাত্ পৃথিবী কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। একটা কথা মনে আছে, বাবাকে কাঁদতে দেখে বলেছিলাম, ‘কেঁদো না, বাবা। আমি তোমাকে বিশ্বকাপ এনে দেবো।’ হতে পারে এই কথাটাই আমার প্রতীজ্ঞা হয়ে গেছে।
উরুগুয়ের বিপক্ষে ওই হারটা কতোটা ধাক্কা দিয়েছিল ব্রাজিলকে?
আমি আমার ওইটুকু জীবনে প্রথম দেখলাম, এতো মানুষ একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে এবং কাঁদছে। এমনও শুনেছি, অনেকে আত্মহত্যা করেছে, হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। শুধু এই ভয়াবহ বেদনার কথা মনে আছে।
আপনি আর কিছুদিন আগে জন্মালে এই মারাকানার ট্রাজেডি বোধহয় ঘটতো না!
(হাসি)। এটা ভালো বলেছেন। হ্যাঁ, আমি সুযোগ পেলে ঈশ্বরকে বলতাম, আমাকে আর কিছুদিন আগে পাঠাও; এই ট্রাজেডি আমি ঠেকাতে চাই।
ব্রাজিলের পরাজয় নিশ্চিত করা ঘিঘিয়ার সেই গোলটা হজম করেছিলেন গোলরক্ষক বারবোসা। তাকে সারাজীবন এই নিয়ে ঘৃণা সহ্য করতে হয়েছে।
আমি ওনার অনেক সাক্ষাত্কার দেখেছি। উনি বলেছেন, লোকে ওনাকে এর জন্য শূলে চড়াতে চেয়েছে। উনি অনেক দুঃখ করেছেন। এটা খুব খারাপ। আমার ওনার জন্য কষ্ট লাগে। আসলে সমর্থকরা খুবই আবেগপ্রবণ হয়, তারা সবসময় জয় চায়। ফলে হারলেই খুব সমালোচনা হয়। এটা ফুটবলারের জীবন।
২০১৪ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে সেই ঘিঘিয়া এসেছিলেন। আপনার সঙ্গে কথা হয়েছে?
ওনার সঙ্গে আগেও কয়েকবার কথা হয়েছে। অবশ্যই ওই ম্যাচটা নিয়ে অনেক গল্প হয়েছে। উনি নিজেই বলেছেন, ওনারা কেউ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে তারা ব্রাজিলকে হারিয়েছেন।
একটু অন্য প্রসঙ্গ। আপনার প্রথম ও শেষ বিশ্বকাপ, ১৯৫৮ ও ১৯৭০ জয়ের মধ্যে তুলনা করবেন?
এটা করা খুব কঠিন। তবে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে আমার ওপর কোনো চাপ ছিল না; আমি ১৭ বছরের এক কিশোর তখন। আর ১৯৭০ সালে আমি ফর্মের তুঙ্গে। সে বছর আমাদের দলটা তো ছিল কিংবদন্তী এক দল। তবে আমার কাছে প্রথমটা অনেক কঠিন মনে হয়।
সময় কতো দ্রুত চলে যায়, তাই না?
অবিশ্বাস্য দ্রুত! টিভি ছিল না তখন; ১৯৫৮ সালে। বিশ্বকাপ জয়ের পর বাবাকে ফোন করতে সুইডেনের এক ট্রেন স্টেশনে যেতে হয়েছিল। আর আজ ছেলেরা গোল করে ক্যামেরার দিকেই চুমু ছুঁড়ে দিয়ে পরিবারকে জানিয়ে দেয়!
এখন তো ১৯৭০ সালের অনেক ফুটেজ পাওয়া যায়। কখনো দেখেন?
কখনো কখনো। টিভিটি দেখায়, লোকজন বের করে চালায়। তবে একটা কথা বলি, আমাকে খুব সতর্ক থাকতে হয়; নইলে প্রতিবার কেঁদে ফেলি।
কান্না দিয়েই শেষ করা যাক। আপনি বলেছেন, এবার আর ব্রাজিলিয়ানদের কাঁদতে দেখতে চান না। যদি ব্রাজিলকে এবার কেউ কাঁদাতে পারেন, সেটা কে? মেসি, নাকি সুয়ারেজ!
আমি দুঃখিত। আশা করছি, এবার আর কেউ ঘিঘিয়া হতে পারবে না। এবার ব্রাজিল আর কাঁদতে চায় না। আমি ভেতরের খেলা, ম্যাচে কী হল; কিচ্ছু বুঝতে চাই না। শুধু ব্রাজিলকে ফাইনালে দেখতে চাই এবং বিশ্বকাপ হাতে দেখতে চাই। আমি বিশ্বাস করতে চাই।
