লোথার ম্যাথিউসের নেতৃত্বে ১৯৯০ বিশ্বকাপের শিরোপা জেতার পর পেরিয়ে গেছে দুই যুগ। এরপর প্রতিবছরই ফেবারিটের তকমা নিয়ে ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নামলেও প্রতিবারই শূন্য হাতেই ফিরতে হয়েছে জার্মানিকে। আর শেষ দুটি আসরে তারা ফিরেছে ফাইনালের ঠিক দোরগোড়া, তৃতীয় স্থানে থেকে। তবে টুর্নামেন্টের তিনবারের শিরোপাজয়ী দলটি এবার ব্যর্থতার সেই বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসবে বলেই বিশ্বাস অধিনায়ক ফিলিপ লামের। যদিও বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে পর্তুগালের বিরুদ্ধে তার মাঠে নামা হবে কিনা সেটা নিশ্চিত নয় এখনো। বাস্টিয়ান শোয়েনস্টেইগার, ম্যানুয়েল ন্যুয়ারের পাশাপাশি চোটে ভুগছেন বায়ার্ন মিউনিখের এই অধিনায়কও।
গত দুই বিশ্বকাপেই সেমিফাইনালে পরাজিত হওয়া জার্মানী শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিল এবং দুটি আসরেই দলের সঙ্গী ছিলেন লাম। জাপানের ইয়োকোহামায় ২০০২ সালের ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে পরাজিত হবার পরে ১২ বছর পার হলেও ফাইনাল পর্যন্ত যাওয়া হয়নি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম এই পরাশক্তির। জার্মান দলের সাথে এক যুগ কাটিয়ে দেয়া লাম তাই বদ্ধপরিকর ‘তৃতীয় স্থানের’ বাধা উপড়াতে। জার্মান দলের সঙ্গে থাকলেও এখনো পর্যন্ত অনুশীলন সেশনে যোগ দিতে না পারা এই রাইটব্যাক বলেন, ‘আবারো আমি সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে চাই না। ব্রাজিলে যাওয়াটা আমি স্বার্থক করতে চাই। আমার লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট। বিশ্বকাপ জিতেই আমি ঘরে ফিরতে চাই।’
শারীরিক দিক থেকে বরাবরই শক্তিশালী লাম সেই লক্ষ্য পূরণে জোড় দিয়েছেন মানসিক শক্তিমত্তার বিষয়ে। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে মানসিকতাই বড় ব্যবধান গড়ে দেবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিরোপা জয়ের সব ধরনের যোগ্যতা আমাদের আছে। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের নিশ্চিত করতে হবে নিজেদের প্রতিভা এবং দক্ষতা শুধুমাত্র দলীয় স্বার্থেই ব্যবহার করতে হবে।’ সেই সামর্থ্য যে জার্মানির আছে সেই বিষয়ে দ্বিমত করার লোক হয়তো খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। অধিনায়ক লামের ঠিক সামনেই খেলছেন আরেক অভিজ্ঞ তারকা শোয়েনস্টেইগার। উইংয়ে আছেন স্যামি খেদিরার মতো তারকা। আর শোয়েনির ঠিক উপরের জায়গাটি নেবেন আর্সেনাল সুপারস্টার মেসুত ওজিল। প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাটল ধরাতে স্ট্রাইকার হিসাবে আছেন টমাস মুলার, গোয়েতজের পাশাপাশি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হবার দারুণ সুযোগ সামনে নিয়ে ব্রাজিলের পথ ধরা মিরোস্লাভ ক্লোসাও।
অথচ এরপরেও কিনা ২৪ বছরের অপেক্ষা! সেই ১৯৫৪ সালে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের পরে দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষা জার্মান দলকে এর আগে করতে হয়নি। সর্বশেষ ইতালিতে ১৯৯০ সালে যখন জার্মানরা বিশ্বকাপ জয় করে তখন এবারের দলের সবচেয় কনিষ্ঠ খেলোয়াড় তারকা মিডফিল্ডার মারিও গোয়েতজের জন্মও হয়নি!
একারণেই হয়তো এবার দল বিশ্বকাপ দল গোছাতে বেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যদিয়ে গেছেন কোচ জোয়াকিম লো। চোট আর ফিটনেসের অভাবে হিমশিম খেতে থাকা বেশ কিছু তারকার মধ্য থেকে পছন্দের খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করতে বেশ সমস্যাই পোহাতে হয়েছে বলে জানালেন লো। ৫৪ বছর বয়সী এই কোচ বলেছেন, নমনীয়তা এবং বৈচিত্র্য নিয়ে আমাদের আরো কাজ করতে হবে। সবসময়ই একটি বিষয় মনে রাখতে হবে ম্যাচের প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তন করার মানসিকতা থাকতে হবে। কিন্তু একইসাথে কাউন্টার অ্যাটাকেও আমাদের দুর্বলতা রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকান বিশ্বকাপ এবং তার পরবর্তী বছরগুলোতে আমরা যেটা করেছিলাম তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারিনি।’
এদিকে, বিশ্বকাপের সময় আসলেই ইনজুরি যেন জার্মানীর নিত্যসঙ্গী হয়ে গেছে। ২০০৬ সালে অধিনায়ক মাইকেল বালাক কাফ ইনজুরিতে পড়েছিলেন। আর এবার বর্তমান অধিনায়ক লাম কনুইয়ের ইনজুরিতে ভুগছেন। ২০১০ এর চেলসির বালাক এফএ কাপ ফাইনালে ঘানা মিডফিল্ডার কেভিন-প্রিন্স বোয়াটাংয়ের একটি ফাউলে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েছিলেন। একই বছর প্রথম গোলরক্ষক রেনে আডলারের পাঁজরের হাড়ে চিড় ধরায় দল থেকে বাদ পড়েছিলেন। বালাকের অনুপস্থিতিতে দলের হাল ধরেন লাম এবং তখন থেকেই তিনিই জার্মানদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে লামের নিজের বিশ্বকাপই নিশ্চিত নয় এখনো। বিল্ডকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন, খেলা তো দূরে থাক হাঁটতেই সমস্যা হচ্ছেন তার! তিনি বলেন, ‘এখনো এ বিষয়ে বলাটা কঠিন। বিশেষ করে আমি যখন দৌড়াতেই পারছি না। এটা সময় নিচ্ছে। যদি আগামীকালই বিশ্বকাপ শুরু হয় তাহলে বলা যায় আমি খেলছি না। কিন্তু অনেক ধরনের চিকিত্সার মধ্যদিয়েই আমি যাচ্ছি।’
এদিকে, অনেকের মতেই বর্তমান বিশ্বের সেরা গোলরক্ষক বলে বিবেচিত ম্যানুয়েল ন্যুয়ারও ফিরতে পারেননি চোট কাটিয়ে। বায়ার্নের হয়ে গোলবারে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে যাওয়া এই গোলরক্ষকও অনুশীলনে যোগ দেয়ার দিন গুণছেন। বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে এই চোটে রীতিমতো বিরক্ত ন্যুয়ার রয়েছেন কাঁধের ইনজুরিতে। তবে কোন বাধাই তাকে জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপ যাত্রায় থামাতে পারবে না জানিয়ে বলে জানিয়েছেন তিনি। গতকাল আর্ম স্লিঙ্গার ছাড়া প্রথমবারের মতো মাঠে হাজির হওয়া এই গোলরক্ষক বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা (হাত ঝুলিয়ে রাখার অবলম্বন) আর লাগছে না। ঠিকভাবেই সুস্থ হয়ে উঠছি আমি। বিশ্বকাপ যাত্রা নিয়েও কোন সন্দেহ নেই।’ বিল্ড ও ওয়েবসাইট অবলম্বনে।
