পরিত্রাণের পথ একটাই

আপডেট : ২৭ মে ২০১৪, ২২:১০
আত্মঘাতী হানাহানি থামিবার কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। বন্ধ হইতেছে না আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইবার বিপজ্জনক প্রবণতা। আমরা ইহার জন্য অব্যাহতভাবে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও প্রতিকারহীনতাকে দায়ী করিয়া আসিতেছি। সেই সাথে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইহাও বলিয়া আসিতেছি যে, আইনকে তাহার নিজস্ব গতিতে চলিতে দিতে হইবে। এমন পরিবেশ সৃষ্টি করিতে হইবে, যাহাতে জনগণ আইনি প্রক্রিয়ার উপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করিতে পারে। উন্নয়নশীল দেশে কাজটি এমনিতেই সহজ নহে। তদুপরি, ইতোমধ্যে সামগ্রিক পরিস্থিতি এতোটাই জটিল আকার ধারণ করিয়াছে যে, সরকারের কঠোর মনোভাব এবং সর্বোচ্চ সদিচ্ছাও যেন কাজে আসিতেছে না। প্রসঙ্গত লক্ষণীয় যে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় সারাদেশ যখন ক্ষুব্ধ, আলোড়িত— সরকারের অবস্থান যখন অত্যন্ত কঠোর, ঠিক সেই রকম অবস্থায় ফেনীতে ততোধিক নৃশংসতার সহিত প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হইয়াছে ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা একরামকে। আবার এই হত্যার সহিত জড়িত দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় এই ঘটনার জের ধরিয়া স্থানীয় একজন আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়াছে। রক্ষা পায় নাই তাহার আত্মীয়স্বজনের বাড়িও। ফেনী হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অনেকেই ইতোমধ্যে গ্রেফতার হইয়াছেন। বাকিদেরও চিহ্নিত করিয়া আইনের আওতায় আনিবার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। ইহাও সুবিদিত যে, আটককৃতদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী একাধিক নেতাও রহিয়াছেন। সরকারের এই কঠোর মনোভাব সত্ত্বেও আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইবার এই যে প্রবণতা— তাহাকে দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা হইতে বিচ্ছিন্ন ভাবিবার উপায় নাই। উন্নয়নশীল অধিকাংশ দেশের চিত্রও যে ভিন্ন নহে— তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না। প্রশ্ন হইল, কেন এই আত্মঘাতী প্রবণতা? ইহার শেষই-বা কোথায়? এইসব প্রশ্নের সদুত্তর পাইতে হইলে দর্পণে যেমন নিজেদের অবয়ব দেখিতে হইবে, তেমনি আমাদের চলমান রাজনীতিকেও দাঁড় করাইতে হইবে সেই দর্পণের সম্মুখে। দীর্ঘকাল যাবত্ যেই রাজনীতি আমরা প্রত্যক্ষ করিয়া আসিতেছি তাহা যে স্বাভাবিক অবস্থায় নাই— ইহা বুঝিবার জন্য বিশেষজ্ঞ বা পণ্ডিত হইবার প্রয়োজন পড়ে না। অন্যদিকে, ইহার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে সমাজের প্রায় সর্বত্রই দানা বাঁধিয়া উঠিয়াছে বিভিন্ন মাত্রার ক্ষোভ, হতাশা ও ক্রোধ। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারের বেপরোয়া মানসিকতা ইহাতে ঘৃতাহুতি করিয়া চলিয়াছে। রাজনীতির প্রয়োজনে ক্ষেত্রবিশেষে ইহার প্রয়োজনও যে আছে, তাহাও অস্বীকার করা যাইবে না। বিদগ্ধজনেরা বলিতে পারেন যে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা অতীতেও ছিল। এখনও আছে। ভবিষ্যতেও থাকিবে। কিন্তু তাহা প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করিয়া ফেলিবার মতো দানবীয় রূপ পরিগ্রহ করিবে কেন? ইহার উত্তরও নিহিত রহিয়াছে বিদ্যমান রাজনীতির বাস্তবতার মধ্যেই। নেতা-কর্মী-সমর্থকরা যাহাকে বা যাহাদিগকে দেখিয়া শিখিবেন, শীর্ষপর্যায়ের সেইসব নেতানেত্রীর মধ্যে দীর্ঘকাল যাবত্ যেই পারস্পরিক ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতার লাভাস্রোত বহিয়া চলিয়াছে, বাস্তবে তাহারই প্রতিফলন ঘটিতেছে মাত্র। গোটা তৃতীয় বিশ্বের চালচিত্রও প্রায় অভিন্নই বলা চলে। বস্তুত আমরা একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করিতেছি। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে যেই আত্মঘাতী হানাহানি এবং বেপরোয়া মানসিকতা পরিলক্ষিত হইতেছে— ইহাও যে এই ক্রান্তিকালেরই অনিবার্য চারিত্রলক্ষণ তাহাতে সন্দেহ নাই। পরিত্রাণের পথ একটাই। সেইটি হইল, রাজনীতিতে স্বাভাবিকতা ফিরাইয়া আনিতে হইবে। পরিহার করিতে হইবে ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতার পথ। কিন্তু সেই পথ কঠিন শুধু নহে, দীর্ঘও বটে। বিশ্বের কোনো দেশই রাতারাতি তাহা অতিক্রম করিতে পারে নাই। অতএব, ধৈর্যের যেমন বিকল্প নাই, তেমনি শুভ কাজ যে নিজগৃহ হইতেই শুরু করিতে হয় তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন