চলতি মাসের ২২ তারিখ হইতে ২৫ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের নির্বাচনের ফলাফলকে ঘিরিয়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) ভবিষ্যত্ লইয়া বিশ্লেষক মহলে নানাবিধ জল্পনা-কল্পনা শুরু হইয়া গিয়াছে। এইবারের নির্বাচনে ইউরোপজুড়িয়া ইইউ-এর গুরুত্ব হ্রাস করিবার পক্ষের দলগুলির অদৃষ্টপূর্ব সাফল্যের কারণেই এই আলোচনা শুরু হইয়াছে। উল্লে¬খ্য, ইউনিয়নভুক্ত ২৮টি দেশে একযোগে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ৭৫১ টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন এইবারও ইইউপন্থীদের দখলে আসিলেও, তিনশতের মত আসনে ইউনিয়ন বিরোধী মূলত কট্টর ডানপন্থী ও উগ্র ডানপন্থী দলগুলির জয় হইয়াছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে কট্টর ও উগ্র ডানপন্থীদের এত বড় বিজয় ইউরোপে আর কখনও দৃষ্ট হয় নাই। উল্লে¬খ্য, ১৯৭৯ সালে সরাসরি নির্বাচনের সূচনা হইতে ধরিয়া এইবারের নির্বাচনটি হইতেছে ইইউ পার্লামেন্টের অষ্টম নির্বাচন।
শুরু হইতেই মধ্য-ডান, মধ্য-বাম, বাম, উদারপন্থীরাই ইইউ পার্লামেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করিয়া আসিতেছে। ইহাতে উগ্র ও কট্টর ডানপন্থীদের অবস্থান নিতান্তই প্রান্তিক। ইহারা ইউনিয়নের দেশে-দেশে কড়া-জাতীয়তাবাদ প্রচার করিবার মধ্য দিয়া বৃহত্তর ইউরোপের ধারণার বিরোধিতা করিত। মহাদেশের অস্তিত্ব প্রধান হইয়া উঠিলে দেশের পরিচয় গৌণ হইয়া যাইবে ইহা ছিল তাহাদের প্রচারণার মূল কথা। দুই মহাযুদ্ধের মধ্যে দিয়া উগ্র জাতীয়তাবাদের ধ্বংসের অভিজ্ঞতা ধারণকারী ইউরোপের মানুষ অবশ্য এইসব কথাতে বিশেষ কর্ণপাত করিত না। কিন্তু কয়েক বত্সর পূর্বে অর্থনৈতিক মন্দার সূচনা হইবার পর হইতে উগ্র ও কট্টর ডানপন্থীদের অবস্থান ভালো হইতে শুরু করে। তাহারা এই মর্মে প্রচারণা করিতে শুরু করে যে, ইইউ নিজের আধিপত্য প্রমাণ করিবার জন্য ধনী দেশগুলির করদাতাদের অর্থে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলির স্বার্থ রক্ষা করিয়া চলিয়াছে। মন্দার সময়ে ইইউ এর অধিক ধনী দেশগুলির সাধারণ নাগরিকদিগের মধ্যে এই প্রচারণার ফল হইয়াছে মারাত্মক। ইহা ছাড়াও তাহারা অভিবাসন ইস্যুটিকে প্রচারণার কেন্দ্রে লইয়া আসে। ইইউ-এর বাহিরেরতো বটেই, এমনকি ইইউভুক্ত বিশেষত পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলি হইতে পশ্চিম ইউরোপ ও স্ক্যান্ডেনেভিয় দেশগুলিতে অভিবাসনের স্রোতকে ব্যাপক আক্রমণের বিষয়ে পরিণত করা হয়। তাহারা পূর্ব ইউরোপীয় অভিবাসন স্রোতের জন্য ইইউএর নীতিমালার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করে যে মন্দার সময়ে অর্থনৈতিক সমস্যাতে ভুগিতে থাকা পশ্চিম ইউরোপ ও স্ক্যান্ডেনেভিয় দেশগুলির সাধারণ মানুষ এই প্রচারণাতেও ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়াছে। ইংল্যান্ড কিংবা ফ্রান্সের ফলাফল দেখিলে এই প্রবণতা একেবারেই স্পষ্ট হইয়া যায়। কেবল মন্দার কবলে খুব একটা আক্রান্ত না হওয়া জার্মানিতেই উগ্র ও কট্টর ডানপন্থীরা খুব একটা সুবিধা করিতে পারে নাই।
কোন সন্দেহ নাই যে, এইবারের নির্বাচনের ফল ইউরোপের প্রধান সংগঠন হিসাবে ইইউ এর কার্যক্রমে রাশ টানিয়া ধরিবে। গত কয়েক দশকে সদস্য রাষ্ট্রগুলির উপরে ইইউ যেইভাবে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও নিয়মাবলী বাধ্যতামূলক করিয়া দিতে সক্ষম হইতেছিল, এইবার হয়তো উহাতে বিরাম পড়িবে। উগ্র ও কট্টর জাতীয়তাবাদীদের প্রচণ্ড প্রচারণার মুখে কোন কোন রাষ্ট্রের মধ্য ডানপন্থীরা নিজেদের রাজনীতি টিকাইয়া রাখিবার প্রয়োজনে এমনকি ইউনিয়ন হইতে বাহির হইয়া যাইবার সিদ্ধান্ত লইয়া ফেলিলেও অবাক হইবার কিছু থাকিবে না। অর্থনৈতিক সুদিন ফিরিয়া না আসিলে, ইউরোপ জুড়িয়া নূতন করিয়া তীব্র জাতীয়তাবাদ জাগিয়া উঠিবার সমূহ আশঙ্কা রহিয়াছে। আর তেমন জোয়ারের মুখে ইইউএর ভবিষ্যত্ যথেষ্ট উজ্জ্বল নয় বলিয়াই মনে হইতেছে।
