আমরা আজ থেকে কয়েকশ’ বছর আগের কথা একটু ভেবে দেখি। তখন না ছিল ইলেকট্রিসিটি, না ছিল ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, স্মার্ট ফোন। সূর্য ওঠার সঙ্গে ঘুম ভাঙত, সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমাতে যেত মানুষ। মানুষের দেহঘড়ি হাজার হাজার বছর ধরে সেভাবেই তৈরি। কিন্তু বিজ্ঞানের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমরা উঠে-পড়ে লেগে গেলাম সেই দেহঘড়ির ছন্দকে ভাঙতে। কীভাবে সেটাকে আবার ফিরিয়ে আনা যায় তার ওপর দারুণ একটি নিবন্ধ বেরিয়েছে বিখ্যাত জার্নাল ‘নিউরোসায়েন্স’-এ।
প্রকাশিত নিবন্ধে বিষয়টি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, একটি বিশেষ তথ্যের জেরে ঘুম উড়ে গিয়েছে টেক-স্যাভি নামের একজন সচেতন মানুষের। ঘুমোনোর আগে নাকি ল্যাপটপ নিয়ে বসা যাবে না! সোশ্যাল মিডিয়ায় বাক্যালাপ করা যাবে না! এমনকী আইপ্যাড, আইফোনেও নিষেধ। কারণ, সামপ্রতিক গবেষণা বলছে, অনিদ্রার সবচেয়ে বড় কারণ এরাই! শুধু তাই নয়, ঘুম পাড়ানোর আরও এমনসব নিদান দিয়েছেন তারা যা শুনে চোখ কপালে উঠে যাবে তরুণ প্রজন্মের। সেই মান্ধাতা আমলের সব নিয়ম, লাইট নিভিয়ে ১০টায় শুয়ে পড়ো, ওঠো সকাল ৫-৬টায় ! শরীরে ঘুমের ঘড়ি নাকি এভাবেই সেট করা আছে! এবং সেটা আজও বহাল-তবিয়বে শরীরে টিকটিক করছে। কিন্তু সেই ঘুমের ঘড়ি বিভ্রান্ত হচ্ছে সভ্যতার যন্ত্রের যন্ত্রণায়।
বিষয়টির আবিষ্কার এভাবে শুরু—আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা জেডি মোয়ার ঘুমের সঙ্গে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে এক সময় শুরু করলেন পড়াশোনা। কীভাবে সহজে পরিপূর্ণ ঘুমোনো যায় তা খুঁজতে খুঁজতে তিনি দেখেন ব্রেনে যে ঘুমের ঘড়ি আছে, যে ঠিক করে কখন ঘুমের সময় আর কখন জেগে থাকার, তাকে বোকা বানাতে আলোই হল সবচেয়ে বড় ভিলেন। তা সে সূর্যের আলো হোক কি ল্যাপটপ, আইপ্যাডের আলো। আলো দেখলেই ঘুমের ঘড়ি ধরে নেয় এটা দিনের বেলা। কাজের সময়। ফলে ঘুমোনোর জন্য যে যে প্রস্তুতি চলার কথা ব্রেনে, তা না হয়ে সে কাজ করার জন্য উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। বারোটা বেজে যায় ঘুমের।
তিনি তখন শুরু করলেন এক মজার খেলা। সূর্য ডোবামাত্র ল্যাপটপ, স্মার্ট ফোন অফ করে, ঘরের লাইট নিভিয়ে, এমনকী ফ্রিজের মধ্যে যে আলো জ্বলে তা পর্যন্ত নিভিয়ে অন্ধকারে বসে গান শুনতে লাগলেন। খানিকক্ষণের মধ্যে অন্ধকার চোখে সয়ে গেল। ফলে বাথরুম-টাথরুম যেতেও আর আলো জ্বালতে হল না। এভাবে কাটল দু’-চারদিন। তেমন কিছু হল না। মধ্যরাত পার করেই ঘুম এল। তবে ছেঁড়া-ছেঁড়া ঘুম নয়, সকালে উঠে তরতাজা লাগে—এমন ঘুম। সপ্তাহ গড়িয়ে যাওয়ার আগেই ঘুমের সময় এগোতে লাগল। শেষমেষ দেখা গেল রাত ৯টায় তিনি ঘুমিয়ে পড়ছেন। ৮ ঘণ্টার পরিপূর্ণ ঘুম হচ্ছে তার এবং সকালে যখন উঠছেন, তিনি যেন এক নতুন মানুষ। আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যে মানুষকে তিনি ভুলে ছিলেন এত কাল। মায়ারের এই অভিজ্ঞতা ঘুম নিয়ে গবেষণার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর স্ল্লিপ অ্যান্ড সার্কাডিয়ান বায়োলজির ডিরেক্টর জানালেন, মোয়ারের অভিজ্ঞতা ও সামপ্রতিক গবেষণা থেকে যা জানা যাচ্ছে তা হল, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমিয়ে পড়া ও সঠিক সময়ে জেগে ওঠার যে ছন্দ আছে আমাদের শরীরে, যাকে বলে সার্কাডিয়ান রিদম, তাকে সত্যিই কিছুটা বোকা বানাতে পারে ল্যাপটপ, স্মার্ট ফোন ইত্যাদি থেকে বিচ্ছুরিত আলো। কাজেই কারও যদি ঘুমের অসুবিধে থাকে ঘুমের অন্তত দু-ঘণ্টা আগে থেকে এ সব ব্যবহার করা যাবে না।
আর ঘুমের প্রধান শত্রু হল আলো। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গোলমাল করে নীল রংয়ের আলো, যা আছে সূর্যের চড়া আলোয়, আছে ডেস্কটপ বা ল্যাপটপে, আইফোনে। কোনো চাষী, যিনি সারা দিন রোদে পুড়ে কাজ করেন বা রোদে ঘুরে মার্কেটিং করা যার কাজ তাদের তুলনায় অফিসে কৃত্রিম ও কম আলোয় বসে যিনি কাজ করেন, তার আলোর প্রতি সেন্সিটিভিটি অনেক বেশি থাকে বলে ঘুমের সমস্যাও তারই বেশি হয়। ঘুমের সমস্যা থাকলে এবং ল্যাপটপ, স্মার্টফোন শোয়ার সময়ও কাছে ছাড়া করা না হলে বিপদসমূহ। তাছাড়া ঘুমের বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকে রিল্যাক্সড হতে হবে। উষ্ণ পানিতে স্নান কিংবা মজার বই পড়ে বা হালকা পায়চারি করে অথবা গান শুনে মাথার ভার লাঘব করা যেতে পারে। কেউ মজার সিনেমা দেখেন, কেউ বা পর দিনের রুটিন ঠিক করে ঝাড়া হাত-পা হয়ে শুতে যাওয়া পছন্দ করেন। যাতে আপনার স্ট্রেস রিলিফ হয়, তাই করা দরকার ঘুমের কিছুক্ষণ আগে থেকে। এটা তো আমরা সাধারণ ভাবেই বুঝি, ঘুমোনোর আগে নিয়মিত জটিল কাজ-কর্ম করলে তা ঘুমের জন্য সহায়ক হবে না একেবারেই।
লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক
[email protected]
