সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে, দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পেনশনের আওতায় আনিবার চিন্তাভাবনা চলিতেছে। ১৮ বত্সরের অধিক বয়সী যাহারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত, যাহারা কোনো পেনশন সুবিধা ভোগ করেন না, তাহাদেরকেই এই কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা হইবে। কর্মসূচির আওতাভুক্ত সদস্যরা ৫৮ বত্সর বয়স পর্যন্ত প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ৫০ টাকা করিয়া সঞ্চয় করিবেন। আর, এই বয়সসীমার পরে তাহাদের যেই পরিমাণ অর্থ সঞ্চিত হইবে তাহার দ্বিগুণ অর্থ সরকার পেনশনভোগীর সঞ্চয়ে জমা করিবে এবং তাহা হইতে প্রতি মাসে তাহাকে পেনশন প্রদান করিবে। ইতিমধ্যে পেনশন স্কিমের খসড়া নীতিমালা তৈরি করিয়াছে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং আগামী ২০১৪-১৫ অর্থবত্সর হইতেই কর্মসূচিটি চালু হইতেছে। তবে, প্রাথমিকভাবে দেশের ২০টি জেলায় কর্মসূচি শুরু করা হইবে বলিয়া জানা গিয়াছে।
ইহা ঠিক যে, দেশে মাথাপিছু আয় বাড়িতেছে। কিন্তু ইহাও তো ঠিক যে, জীবনযাত্রার ব্যয়ও দিন দিনই বাড়িয়া চলিয়াছে। সেইসঙ্গে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের এই যুগে প্রতিটি মানুষকেই তাহার বয়স্ককালীন নিরাপত্তার কথা ভাবিয়া উদ্বিগ্ন থাকিতে হইতেছে। পরিসংখ্যান বলিতেছে, বর্তমানে সারাদেশে বয়স্ক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৬৫ লক্ষ। কিন্তু, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, চিকিত্সা ইত্যাদি খাতে মানুষের সচেতনা বাড়িয়াছে, বাড়িয়াছে সুযোগ-সুবিধাও। ফলে, গড় আয়ুও বাড়িয়াছে। ফলে হিসাব করিলে দেখা যাইতেছে, আগামী ২০৫১ সাল নাগাদ দেশে ৬০ বত্সরের অধিক বয়সী জনসংখ্যা বাড়িয়া দাঁড়াইবে প্রায় ৩ কোটিতে, যাহা দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। ইতোমধ্যে, দেশের বয়স্ক ও দুঃস্থ জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে এবং দারিদ্র্য কমাইতে রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে একাধিক কার্যক্রম অব্যাহত আছে। এইগুলির মধ্যে রহিয়াছে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিএফ, দুঃস্থ নারী ভাতা ও অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা। আর, বর্তমানে বয়স্ক ভাতা প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ লক্ষ সুবিধাভোগী প্রতি মাসে ৩শত টাকা করিয়া ভাতা পাইতেছেন। কিন্তু তবুও এই ভাতার আওতার বাহিরে থাকিয়া যাইতেছে প্রায় অর্ধ কোটি বয়স্ক মানুষ। দরিদ্র পেনশন স্কিমের নীতিমালা অনুযায়ী অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষম এবং যাহার মাসিক আয় ৫ হাজার টাকার কম, এমন পেশাজীবীকেই এই কর্মসূচির আওতায় আনা হইবে। ওই ব্যক্তির বয়স ৫৮ বত্সর হওয়া পর্যন্ত সরকার ও ব্যক্তির উদ্যোগে যৌথভাবে ওই তহবিল সঞ্চিত হইবে। এই পরিস্থিতিতে, সরকারের এই উদ্যোগ নিশ্চিতভাবেই সাধুবাদ পাইবার যোগ্য।
দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য অবসরে যাওয়া বিলাসিতার নামান্তর। কবরে যাইবার আগে পর্যন্ত তাহাদের উদয়াস্ত খাটিয়া যাইতে হয়। রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে তাহাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার উদ্যোগ এখনও সীমিতই বলা চলে। সেইক্ষেত্রে সামাজিক পেনশান স্কিম নিশ্চিতভাবেই স্বল্প আয়ের মানুষের নিরাপত্তাবলয় অনেকটা শক্তিশালী করিবে। সামপ্রতিক সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ে আগ্রহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাইতে দেখা যাইতেছে। পার্শ্ববর্তী ভারতের বিভিন্ন রাজ্য সরকারের উদ্যোগে এইরকম স্কিম অনেক বত্সর আগে হইতেই চালু রহিয়াছে। অবশেষে বাংলাদেশ সরকার দেরিতে হইলেও ইহা চালু করিল। আমরা আশা করিব, এই কর্মসূচি সফলভাবেই আগাইয়া যাইবে এবং অচিরেই সবগুলি জেলায় ইহা চালু হইবে। সর্বোপরি, জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের যেই দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ব তাহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হইয়া উঠিবে এই প্রকল্প।
