একটি জরিপ অনুযায়ী নদী ভাঙ্গনের শিকার লোকসংখ্যা অনুমানিক ১০ লাখ। তন্মধ্যে ৩ লাখ গৃহহীন ও সহায়-সম্বলহীন মানুষ নদীর বাঁধ, সরকারি খাস জমি বা রাস্তায় ঝুপড়ি তৈরি করে বাস করে। বাকিরা বিভিন্ন শহরে বা গ্রামে পুনরায় বসতি স্থাপনের চেষ্টা করে। ১৬ কোটি লোকের মধ্যে ১০ লাখ অর্থাত্ লোকসংখ্যার ০.৬ শতাংশ মানুষ প্রতি বছর নতুনভাবে গৃহহীন ও সহায়-সম্বলহীন হলে দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়া কঠিন। সিইজিআইএসের পূর্বাভাস অনুযায়ী ৪,০০০ হেক্টর জমি ও বসত-বাড়ির মূল্যমান আনুমানিক ১,৫০০ কোটি টাকা। তত্সঙ্গে ১৪.৫ কিলোমিটার রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, হাট-বাজার, অফিস ইত্যাদির মূল্য আনুমানিক ১,৫০০ কোটি টাকা। কৃষিভূমি, বসতভিটার তাত্ক্ষণিক মূল্যমান ছাড়াও ১০ লাখ মানুষের কৃষি ও অন্যান্য পণ্য উত্পাদনের মূল্য যোগ করলে বছরে আরও ক্ষতি দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ১,০০০ কোটি টাকা। সে হিসেবে মোট আর্থিক ক্ষতি দাঁড়ায় আনুমানিক ৪,০০০ কোটি টাকা যা জাতীয় বাজেটে প্রাক্কলিত রাজস্বের শতকরা ২.০ভাগ। মুন্সিগঞ্জে গত ১৮ মে পর্যন্ত দৌলতপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ১০টি গ্রামে যমুনা নদীর ভাঙ্গনে পাঁচ শতাধিক বসতভিটা এবং ২,৫০০ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। এ তো কেবল যমুনা নদীর তাণ্ডব, আরও তো বড় বড় নদী রয়ে গেছে। বর্ষা শুরু হওয়ার পূর্বেই যদি এ পরিস্থিতি দাঁড়ায় তাহলে ভরা বর্ষায় ও বন্যার সময় এবং বন্যা পরবর্তী সময়ে ভাঙ্গন যে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে এবং সিজিআইসির পূর্বাভাস অতিক্রম করবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। দারিদ্র্য বিমোচনে বাজেটে বিরাট অংকের টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রতি বছর যদি নতুন করে ১০ লাখ মানুষ নিঃস্ব, দারিদ্র্যে পরিণত হয় তাহলে ১০০ বছরেও দেশের দারিদ্র্য ঘুচবে না। রোগ-শোক হলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিত্সা দিয়ে ছেড়ে দেয়া যায়, কিন্তু নদী ভাঙ্গা পরিবার যাদের একদিন খাওয়া-পড়ার চিন্তা করতে হতো না, তারা গৃহহীন হলে তাদের পুনর্বাসনে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। আহার, বাসস্থান ছাড়াও তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা ইত্যাদি মৌলিক সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। প্রাথমিকভাবে তাদেরকে চাল-ডাল সাহায্য দিলেও জমি ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা সহজ ব্যাপার নয়। বাসস্থান তৈরি করতে হলে ভূমির প্রয়োজন। ১০ লাখ মানুষকে প্রতি বছর সরকারি খাস জমি থেকে বাড়ি তৈরির জন্য ভূমি বরাদ্দ দেয়া সম্ভব নয়। এত জমি সরকারের হাতে নেই। এজন্য নদী ভাঙ্গন রোধ করাই ১০ লাখ লোকের নতুন করে দারিদ্র্যের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। নদী ভাঙ্গনে যে ক্ষতি হয় সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া কঠিন। তাই প্রতিকারই এর সমাধান। পাউবোকে আধুনিকায়ন করে নদী ভাঙ্গন রোধে আধুনিক কারিগরি পদ্ধতি প্রয়োগ করা প্রয়োজন। পাউবো’র দায়িত্ব হলো নির্মিত বাঁধ, স্পার, হার্ড পয়েন্ট ইত্যাদি সারা বছর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা ও নতুন ভাঙ্গন ঠেকানোর জন্য ব্যবস্থা নেয়া, কিন্তু সংস্থাটি বর্ষার সময়ই তত্পর থাকে বেশি। অস্থায়ী কার্যক্রম গ্রহণ না করে বিদেশিদের সাহায্যে স্থায়ী, টেকসই আর,সি,সি বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন বিধায় বিদেশি সাহায্য নিতে হতে পারে। বছরে একশ’ কিলোমিটারের পরিবর্তে পঞ্চাশ কিলোমিটার স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করে নদী ভাঙ্গনের ক্ষতি থেকে দেশকে ও দেশের মানুষকে বাঁচানো যেতে পারে। প্রতি বছর উন্নয়ন বাজেটে (এডিপি) স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখে বিদেশি প্রকৌশলী দ্বারা এসব বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। খরচের দিক বিবেচনা করলে সমীকরণ দাঁড়ায় এরকম যে, বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার জাতীয় ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে হলে অন্তত তার অর্ধেক পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ থাকা উচিত। তাতে প্রতি বছর নদ-নদীর দুই শতাংশ অংশে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করলে ৫০ বছরে নদী ভাঙ্গন ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে আসবে। নদী ভাঙ্গনকে ভয়াবহ দুর্যোগ এবং দারিদ্র্য বিমোচনে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করে তার স্থায়ী সমাধানকল্পে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অপরদিকে ভাঙ্গনের বিপরীতে কয়েক বছর পর নদীর বিভিন্ন জায়গায় চর জেগে উঠলে সেই চরের জমি যাতে ভাঙ্গনের শিকার জনগণের মধ্যে বরাদ্দ করা হয় সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। ভূমি দস্যুদের দ্বারা চর দখল হলে সম্পদের সুষম বণ্টন ব্যাহত হবে এবং দারিদ্র্য কখনও বিমোচিত হবে না।
লেখক : কথাশিল্পী ও এফসিএস
