মানুষ অসুস্থ হয়ে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হয়। হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সা নিতে জেতে হয়। কিন্তু কি নিষ্ঠুর পরিহাস! হাসপাতালে চিকিত্সক, রোগী ও নার্সদের মধ্যে চলছে এক অস্থিরতা। চিকিত্সা নিতে কেউ আসলে সে যে মৃত্যুবরণ করবে না- এমন গ্যারান্টি নেই। চিকিত্সকের অবহেলা ও ভুল চিকিত্সায়ও অনেকে মারা যায়। আস্থার স্থানটির অভাব দীর্ঘদিন অনুভূত হচ্ছে। চিকিত্সা এক মহান পেশা। সেখানেও ব্যবসা, অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিনবত্ব প্রতারণার জাল বিস্তৃত। চিকিত্সকের ভাল ব্যবহারে অর্ধেক রোগী ভাল হয়ে যায়। সেই চিকিত্সকরাই এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। চিকিত্সক, রোগী, সাংবাদিক ও নার্সদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি পরবর্তীতে সংঘর্ষ ভাংচুর, অনভিপ্রেত ঘটনা সমপ্রতি উদ্বেগের সঞ্চার করেছে। মিটফোর্ড হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে একটি টেলিভিশনের ছয়জন কর্মী হামলার শিকার হলে হৈচৈ পড়ে যায়। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে একটি টেলিভিশনের ফটোসাংবাদিকসহ ১০ জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে রোগীর স্বজনদের উপর চড়াও হয় চিকিত্সকেরা। বাড়ডেমে এক রোগীর মৃত্যুর পর হামলা, চিকিত্সকদের কর্ম বিরতি হয়েছে। রোগ ব্যাধীতে আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্যে শেষ ভরসাস্থল হাসপাতাল।
চিকিত্সকদের কর্মজীবন গ্রাম থেকে শুরু হওয়ার কথা। গ্রামে চাকরি মিললেও চিকিত্সকরা গ্রামের কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকে। গ্রাম শহর সর্বত্র বেসরকারি ক্লিনিকের ব্যবসা রমরমা। সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সকরা উচ্চ ফিস নিয়ে রোগী দেখে থাকেন। ক্লিনিকগুলোর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। অদক্ষ অশিক্ষিত কর্মী বাহিনী দ্বারা ক্লিনিকের ব্যবসা চলছে। রোগ নির্ণয় পরীক্ষার নামে ব্যবসার ব্যাপ্তি ঘটছে। ভুয়া চিকিত্সক, ভুয়া প্যাথলজিস্ট আর কম্পিউটার অপারেটর এই ক্লিনিকগুলো চালাচ্ছে। অনুমোদিত ক্লিনিকে ডাক্তারদের ডিগ্রি যা লেখা থাকে তা বিস্ময়কর। সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি অযত্ন, অবহেলায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। দেখার কেউ নেই। চিকিত্সক সংগঠনের চাপের মুখে দায়িত্তে অবহেলারত চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যায় না। ঢাকা শহরের নামীদামী হাসপাতালে চিকিত্সা নেয়ার সামর্থ্য অল্প মানুষের আছে। অধিকাংশ মানুষ নিওতির উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। চিকিত্সক ও নার্সদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও সংঘর্ষের খবর আমরা জেনেছি। চিকিত্সক ও নার্সদের মধ্যে সংঘর্ষ ও দূরত্যের সৃষ্টি হওয়া ভালো লক্ষণ নয়। চিকিত্সকের মহান পেশায় নিয়জিত ব্যক্তি সমাজে সেবার পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে অবিরাম পরিশ্রম করছেন, তার বেতন, সুবিধা ও আনুষংগিক সমর্থন বৃদ্ধি করা জরুরি।
পুরো বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিত্সক ও পেশাজীবীরা স্বস্ব শিবিরে বিভক্ত হয়ে যা করছে তা জাতির জন্য মঙ্গলজনক। সত্ মানুষের অভাব দিন দিন বাড়ছে। হিংস তা, বর্বরতা ও তাণ্ডবতার অবসান করতেই হবে। গবেষণার সুযোগ নেই। রুটিন দায়িত্ব পালন করে যাদের জীবনের সিংহভাগ কেটে যায়। অভাব, অনটন ও ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষা বঞ্চনা নিয়ে যাদের দিন কাটে তাদের কাছ থেকে আমরা কি সেবা ও ব্যবহার আশা করতে পারি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও বিনিময়ের ধৈর্য, সহনশীলতা ক্ষেত্র চিকিত্সক, রোগী, রোগীদের স্বজন ও নার্সদের সৃষ্টি করতে হবে। বঞ্চনা, দুর্ব্যবহার ও নিরাপত্তাহীনতার জন্য চিকিত্সকেরা দাবী জানাতেই পারেন। ইমারজেন্সি বিভাগ ও জরুরি চিকিত্সা কেন্দ্র যেন বন্ধ না থাকে।
আমদের সমাজে চিকিত্সকরা অনেক সম্মানিত। একজন চিকিত্সকের দায়িত্বশীল আচরণের কারণে একজন রোগীর বাঁচা-মরা নির্ভর করে। চিকিত্সকদের জীবনের নিরাপত্তা আলাদাভাবে দেয়া সম্ভব নয়। এ দেশে কারোর জীবনের নিরাপত্তা নেই। চিকিত্সকের কর্মবিরতি কিংবা ধর্মঘট দিয়ে অমানবিক আচরণ করে। সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সকদের বাইরে প্রাকটিস করার নিষেধাজ্ঞা একবার জারি হয়েছিল। পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। বিশেষায়িত হাসপাতালে নির্দিষ্ট ফি চিকিত্সকদের পরামর্শ নেয়ার সুযোগ এখন বহাল আছে। নীতিবোধ জাগ্রত থাকা একজন মানুষের স্বাভাবিক গুণাবলী। চিকিত্সকদের যদি নীতিবোধ বিসর্জনের বিষয়টি গুরুত্ব না পায় তা দুঃখজনক। প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা রাষ্ট্রীও সুযোগ বঞ্চনা যদি নীতিবোধ ও দায়িত্বশীল আচরণের পক্ষে কাজ করতে কাউকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে না। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে পেশাজীবীদের সংগঠন আছে। এসব সংগঠন প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ধর্মঘট, কর্মবিরতি চাকরি বিধি লঙ্ঘনের সামিল। সমাজে সম্প্রীতি, সহাবস্থান আগের মতো নেই। পরিবার, সমাজ থেকে আমরা ভালো আচরণের যে শিক্ষা পেয়েছিলাম তা আমাদের মানবিক গুণাবলীকে পরিপুষ্ট করতে পারেনি। আমাদের সন্তানেরা বিপদে এগিয়ে যাওয়া, পরমতসহিষ্ণু হওয়া, মানবিক গুণাবলিতে পুষ্ট হয়নি।
রাস্তায় বের হলে প্রতারণা, সড়ক দুর্ঘটনা ও আততায়ী মৃত্যুর কাছে সমর্পিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিনদিন অবনতিশীল হচ্ছে। ‘ভালো ব্যবহারে বংশের পরিচয়’ এই আপ্ত বাক্য আগে বাসে লেখা থাকত। এখন বংশ পরিচয়, ভালো ব্যবহার এসব মানুষের অভিধান থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। একতরফা কিছুই হয় না। চিকিত্সক-রোগীর সম্পর্ক উন্নয়নে পরস্পরকে এগিয়ে আসতে হবে। দীর্ঘসময় কর্মপালন বিরক্তি উত্পাদন ও কর্মবিমুখ করতে পারে। একঘেয়েমি কাজ ও হাজারো সমস্যা শুনতে শুনতে চিকিত্সকদের মানসিক বিপর্যস্ততা নিত্য সঙ্গী। তবু একজন চিকিত্সককে ভালো আচরণ, সু পরামর্শ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে অনেক মুমূর্ষু রোগী। মেধাবী ছাত্র ছাত্রীরা চিকিত্সকের পেশায় নিয়োজিত থাকে। এইসব মেধাবী মানুষ অন্য দশ জন মানুষ থেকে আলাদা নয়।
একজন চিকিত্সক তৈরি করতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়। জনগণের করের টাকায় হাসপাতালের ব্যয়ভার ও চিকিত্সকের বেতন মেটানো হয়। একজন অভিভাবকের স্বপ্ন, সাধারণ মানুষের আশা- আকাঙ্ক্ষা থেকে একজন চিকিত্সকের সৃষ্টি। তারা কেন বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে সামিল হবেন-কেন ক্রোধের আগুনে পুড়বে হাসপাতাল?
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক। [email protected]
