গত ১৭ মে প্রকাশিত হল এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার রেজাল্ট। ১ লক্ষ ৪২ হাজার ২৭৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। সেদিন জিপিএ-৫ এর জোয়ারে ভাসছিল বাংলাদেশ। মানুষ এত জিপিএ-৫ এর আগে কখনো দেখেনি। আনন্দমুখর ছিল লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গেছে এ বছর। প্রতিবছরই জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বাড়ছে। তবে তার সাথে পাল্লা দিয়ে শিক্ষার মান কি বেড়েছে? প্রত্যেক বছর স্বাভাবিক হারে জিপিএ-৫ বৃদ্ধি পেলেও এ বছরের বৃদ্ধি অনেকটা আশ্চর্য ধরনের। এ যেন মেধার বিস্ফোরণ! শিক্ষিত সচেতন ব্যক্তিদের মনে প্রশ্ন জাগে গত বছরের তুলনায় হঠাত্ করেই এত বেশি জিপিএ-৫ বাড়লো কী করে? এক বছরে কি এতই শিক্ষার মান বাড়লো যে এভাবে মেধার বিস্ফোরণ ঘটতে বাধ্য হয়েছে? নাকি মেধা বিস্ফোরণের পিছনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কাহিনীটাই জড়িত? এটাকে অস্বীকার করা যায় না। এভাবে মেধাবীদের মূল্যায়ন করা যায় না। প্রশ্নপত্র ফাঁস করে ভালো রেজাল্ট প্রকাশিত হলে সেই রেজাল্টের মূল্যই বা কতটুকু রইলো। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভালো ছাত্রদের খারাপ রেজাল্ট হয়, খারাপ ছাত্রদের ভালো রেজাল্ট হয়। মেধাবীরা যখন শুনে প্রশ্নপত্র আউট হয়ে গেছে তখন তারা হতাশ হয়ে পড়ে। পরীক্ষায় অমোনযোগী হয়ে পড়ে। সারাবছর ভালো প্রস্তুতি নেয়ার পর পরীক্ষার এক-দেড় সপ্তাহ আগে যখন শোনে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে তখন হতাশ হওয়া ছাড়া আর কি থাকে। ভালো রেজাল্ট করলেই মেধাবী হওয়া যায় না, এই কথাটা কেবল এখনই বলা যায়, পরীক্ষার আগে কয়েকটি প্রশ্ন পড়ে জিপিএ-৫ পেয়ে গেলে তাকে কি আমরা মেধাবী বলবো? দেখা যাচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে হতাশায় আসল মেধাবীরা পিছিয়ে পড়ছে। এভাবে মেধাবীদের মূল্যায়ন করা যায় না। মেধাবীদের সঠিক মূল্যায়ন না করলে দেশ মেধা শূন্য হয়ে যাবে। দেশকে টিকিয়ে রাখতে হলে মেধাবীদের মূল্যায়ন করতে হবে।
দেশের অবস্থা এখন এমন যে, জিপিএ-৫ পাওয়াটা গর্বের বিষয় নয়, না পাওয়াটা প্রেস্টিজের বিষয়। সবাই জিপিএ-৫ পাচ্ছে আমি যদি না পাই তাহলে তো আমার প্রেস্টিজ নষ্ট হয়ে যাবে। এমনি একটা ভাব আমাদের মাঝে চলে আসছে। জিপিএ-৫ কি মামার হাতের মোয়া যে চাইলেই পাওয়া যাবে? হ্যাঁ, এখন এমনটিই বুঝা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক ভয়াল থাবার শিকার হচ্ছে পরীক্ষার রেজাল্টগুলো। প্রত্যেক সরকারই চায় তাদের সময় ভালো রেজাল্ট হোক। চাওয়াটা দোষের কিছু নয়। রেজাল্ট তো গ্রহণযোগ্য হতে হবে। শিক্ষার মান ভালো হচ্ছে কিনা সেটার উপর এত ভ্রূক্ষেপ নেই। রেজাল্ট ভালো দেখিয়ে সরকার তার সাফল্যের ঝুড়ি ভারী করতে চায়। ভালো রেজাল্ট হলেই শিক্ষার মান ভালো হয় না, এটা সরকারকে বুঝতে হবে। শিক্ষার মান বৃদ্ধি করে সাফল্যের ঝুড়ি ভারী করাটাই জ্ঞানীর কাজ হবে।
রেজাল্ট যেন ভালো হয় সে জন্য বোর্ড থেকে পরীক্ষকদের বেশি নম্বর দেয়ার আদেশ দেয়া হয়। এভাবে পরীক্ষার খাতার সঠিক মূল্যায়ন না করে অবমূল্যায়ন করে ভালো রেজাল্টের সুফল নেই। এরকম ভাবে ১০০ ভাগ পাসের কোন দাম নেই। দেড় লক্ষ জিপিএ-৫ পাওয়ারও কোন দাম নেই। এ বছর দেড় লক্ষ জিপিএ-৫ পেয়েছে বটে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবে কত হাজার? বাকি প্রায় এক লক্ষ এরও বেশি জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীরা কী করবে? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চান্স না হলে এত এত জিপিএ-৫ পাওয়ার মান-সম্মান থাকলো কোথায়?
আসলে আমরা ভালো রেজাল্টের পাশাপাশি ভালো মেধাবীও প্রত্যাশা করি। মেধাবীদের সঠিক মূল্যায়ন করে কেবল তাদেরকেই ভালো রেজাল্ট করার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। যারা মেধাবী তারাই যেন ভালো রেজাল্ট করে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষার খাতায় নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে মেকি মেধাবীদের আমরা প্রত্যাশা করি না।
এ বছর আমার ছোট ভাই এসএস সি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। মোবাইলে খবরটা শুনে আমি আনন্দিত হয়নি। যেখানে মেধাবী-অমেধাবী সবাই জিপিএ-৫ পাচ্ছে, সেখানে জিপিএ-৫ পেয়েছে শুনে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। আমার ছোট ভাই মেধাবী নাকি অমেধাবী তা জিপিএ-৫ পাওয়ার দ্বারা মূল্যায়ন করতে পারছি না। যেখানে জিপিএ-৫ পেয়ে মেধাবী-অমেধাবী সবাই এক কাতারে, সেখানে কিভাবে মেধাবীদের পার্থক্য করবো? আসলে জিপিএ-৫ তো মেধার কষ্টি পাথর হওয়া উচিত। যার দ্বারা একজন ছাত্র মেধাবী নাকি অমেধাবী তা বুঝতে পারবো। শুধু আমার ছোট ভাইকে মূল্যায়ন করতে পারছি না এমনটি নয়, দেশের লক্ষ লক্ষ ছোট ভাইদের ক্ষেত্রেও এই অবস্থা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলবো, আপনি নিজ উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধ করে দেশের প্রতিভাবান মেধাবীদেরকে বাঁচান।
লেখক :শিক্ষার্থী,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
