যদি কেউ প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় স্বাস্থ্যের স্বরূপ কেমন? আমি বলবো, মোটেই ভাল নয়। আমরা প্রতিনিয়ত খাদ্যের নামে কলা, আম, পেঁপে, টমেটো, আঙ্গুর ও তরিতরকারি খাচ্ছি সবই ফরমালিন যুক্ত। ফরমালিন ছিটালে ফলের রং উজ্জ্বল থাকে আর টমেটো ও অন্যান্য তরকারি শক্ত থাকে এবং দীর্ঘদিন রাখা যায়। তাহলে বলতে পারি, আমরা ফরমালিন যুক্ত মাছ, ফল, তরিতরকারির নামে খাচ্ছি বিষ ছাড়া আর কিছু নয়।
ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় আমরা দেখেছি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমে যাতে স্প্রে ছিটাতে না পারে তজ্জন্য পুলিশ ও বাগান মালিকরা পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে। বিষয়টি আমাদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু আম ঢাকায় আড়তে আসার পর সেখানেও যে বিষাক্ত স্প্রে ছিটানো হয় তার পাহারা কে দেবে? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বলছি, ১২০/১৩০ টাকায় কেজি ফজলি আম বাসায় এনে কাটলে দেখা যায়, ফজলি আমের স্বাদ দু’দিকে দু’রকম।
আবার কলা, বাজার থেকে আধা কাঁচা, আধা পাকা কলা বাসায় আনা হল, পরদিন দেখছি কলা পেকে হলুদ আকার ধারণ করেছে। রাসায়নিক উপাদান প্রয়োগের ফলে এই অবস্থা। একইভাবে আম, পেঁপে, লিচু, কুলসহ সকল ফলে রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগ করা হয়। এসব ফল খেয়ে মানবদেহে বিষাক্ত কেমিক্যাল ছড়িয়ে নানা অসুখ বিশেষতঃ নার্ভের সমস্যা হয়।
আমার ব্যক্তিগত সমস্যার কথাই ধরা যাক, বিগত কয়েক বছর যাবত্ আমার পায়ের তালুতে জ্বালাপোড়া আর হাঁটু থেকে পায়ের চুলগিরা পর্যন্ত ঝিমঝিম ও জ্বালাপোড়া করে। অনেক ওষুধ সেবন করেছি, কোন লাভ হয়নি। ডাক্তারের কাছে গেলে বলেছেন, এসব ভেজাল খাদ্যের প্রতিক্রিয়া। এ রোগ সারবার নয়। এবার সহজে অনুমান করতে পারেন, ফল, খাদ্যে ও মাছে ফরমালিন ও রাসায়নিক উপাদান মিশানোর পরিণতি মানবদেহে স্বাস্থ্যের জন্য কিরূপ মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের মতে, রাসায়নিক বিষ যুক্ত ফল ও খাদ্য সেবনের ফলে মানুষের লিভার ও কিডনি অকেজো করে দেয়। হার্ট দুর্বল করে দেয়। স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়। এমনকি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে।
ব্যবসায়ীরা কি মানুষ, নাকি মানুষ নামক জীব। শুধু ব্যবসায়িক লাভের জন্য তরিতরকারি ফল-মূলে ইউরিয়া আর মাছে ফরমালিন মারাত্মক বিষে পরিণত করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সিটি কর্পোরেশনের জনস্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বছরে ছয়মাসে বাজারে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়। কিন্তু অবস্থা তথৈবচ। বাজারে নিয়মিত কড়া নজরদারি একান্ত প্রয়োজন। এককালে ঢাকা জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট রোকনউদদৌলা ঢাকা শহরে ভেজাল বিরোধী অভিযান চালিয়ে বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন। জানি না তিনি এখন কোথায়? তার মতো বাজারে নিয়মিত ভেজাল বিরোধী অভিযান চালাতে ইদানিং দেখা যায় না।
অভিজ্ঞমহলের মতে, ভেজাল খাদ্য, মাছ, তরিতরকারি ও ফলে ফরমালিন এবং রাসায়নিক উপাদান কোথায় রাখা হয় তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগের গোয়েন্দা বিভাগ নিয়মিত খোঁজ-খবর নিয়ে এসে গুদামে অভিযান চালানো এবং অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করলে খাদ্যে ভেজাল রোধ অসম্ভব নয়। তাছাড়া এসব ফরমালিন ও রাসায়নিক উপাদান আমদানিতে বিধি-নিষেধ আরোপ একান্ত প্রয়োজন।
পরিবেশ আন্দোলনের গবেষণা অনুযায়ী জানা গেছে যে, ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে তিন লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগে আক্রান্ত হয় ২ লাখ মানুষ।
গর্ভবতী মায়েদের ভেজাল খাদ্যের জন্য ১৫ লক্ষ বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নেয় যার সংখ্যা ১৫ লাখ। খাদ্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল ও মাছে ফরমালিন মিশ্রণ বন্ধ না করলে দেশে ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা ১২ লাখে উন্নীত হবে বলে বিশেষজ্ঞদের আশংকা।
আমরা চাই সুস্থ সবল জাতি আর চাই রোগমুক্ত জীবন। যারা খাদ্যে ভেজাল দিয়ে দৈনিক মানুষ হত্যা করছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। কারণ এরা জনগণের ও মানুষের শত্রু। এ ব্যাপারে প্রশাসন থেকে যত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয় ততই দেশবাসীর মঙ্গল আর আমাদের সম্মিলিত সকলের প্রত্যাশাও তাই।
লেখক :বিশিষ্ট অনুবাদক, লেখক, কলামিস্ট
