মিসর পূর্ববত্

আপডেট : ৩০ মে ২০১৪, ২০:৪৮
মিসর নূতন প্রেসিডেন্ট পাইয়াছে। ঘুরিয়া ফিরিয়া অবশেষে সাবেক শাসক মুবারক-জমানাই যেন নূতনরূপে ফিরিয়া আসিতেছে। হোসনি মুবারককে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিসরীয়রা ইতিহাস গড়িয়াছিল। সেই দান এইবার উল্টাইয়া গেল। মিসরে গণতন্ত্রের আবাহনের প্রক্রিয়াটি পুনরায় মাটিচাপা পড়িল। তিন বত্সর পূর্বের আরব বসন্তের জুঁই বিপ্লবের সৌরভ ম্রিয়মাণ হইতে শুরু করিয়াছে আরও দেড় বত্সর পূর্বেই। অথচ মিসরের জনগণ হোসনি মুবারককে এইজন্য বিদায় করেন নাই যে, তাঁহার স্থলে কয়েক বত্সর পর পুনরায় তাঁহারই অন্যরূপ জাঁকিয়া বসিবে ক্ষমতায়। তাহা হইলে ২০১১ হইতে ২০১৪ অবধি এই মধ্যবর্তী সময়ে কেন নীলনদ রক্তলাল হইল? গণতন্ত্র ফিরাইয়া আনিবার ঢাক গুড়গুড় ঘটনার ঘনঘটারই বা কী দরকার ছিল? মিসরের নূতন প্রেসিডেন্ট আবদেল ফতাহ আল-সিসি বিপুল সংখ্যক ভোটে নির্বাচিত হইয়াছেন। তাহার ভোটপ্রাপ্তির হার ৯৩ শতাংশ। বিশ্বের কেহ তাহাতে বোধ করি অবাক হন নাই। এমনটাই সাধারণত হইয়া থাকে। শুধু মিসরের জনগণ ভোট কেন্দ্রে যাইতে দারুণ অনীহা বোধ করিয়াছেন। ভোট পড়িয়াছে সামান্যই। কিন্তু তাহাতে কী? আইনি প্রক্রিয়া তো সম্পন্ন করা সম্ভব হইল। মিসরে সামরিক বাহিনী সর্বাপেক্ষা সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ শক্তি। এই বাহিনীর জোরেই হোসনি মুবারক তাঁহার দীর্ঘ জমানা দাপটের সহিত চালাইতে পারিয়াছিলেন। তাঁহার অপসারণ ব্যক্তি একনায়কতন্ত্রের বিদায়ঘণ্টা বাজাইয়াছিল ঠিকই, উত্পাটিত করিতে পারে নাই প্রাতিষ্ঠানিক একনায়কতন্ত্রকে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি পরবর্তী সময়ে প্রথমাবধি জেনারেলরা বিদায়ী প্রেসিডেন্টের বিকল্পরূপে নিজেদের তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। গণজোয়ারের অভিঘাতে সেইসময় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হইলেও মিসরের জেনারেলরা ক্ষমতার মঞ্চ হইতে সহসা অবসৃত হইতে প্রস্তুত ছিলেন না। মুবারক অপসারিত হইবার পর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইয়াছিলেন মুহম্মদ মুরসি। তাহা ছিল ২০১২-এর জুন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই নিজের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করিবার অভিযোগ ওঠে মুরসির বিরুদ্ধে। অভিযোগ ওঠে যে, অনেকটা মুবারক জমানার মতোই একনায়কতন্ত্র কায়েম করিবার পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছেন মুরসি। কিছু কিছু ঘটনায় মুরসির দল মুসলিম ব্রাদারহুডও ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারাইতে থাকে। ‘মুরসি হটাও’ স্লোগান শুরু হইতেও বিশেষ সময় লাগে নাই। আর সেই স্লোগানকেই হাতিয়ার করিয়াছিলেন সিসি। ২০১৩-এর ৩ জুলাই ক্ষমতাচ্যুত করা হয় মুরসিকে। কথিত জনবিরোধী কার্যকলাপের জন্য মুসলিম ব্রাদারহুডকেও জঙ্গি সংগঠনের তকমা দেওয়া হয়। মুরসির দল ও নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা এখনও চলিতেছে আদালতে। বহু ক্ষেত্রে রায় দেওয়া হইতেছে মৃত্যুদণ্ডের। এত ক্ষয়ক্ষতি ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়া যে মিসরবাসী মুবারকের একনায়কত্ব হইতে মুক্তি পাইয়াছেন, তাঁহাদের পক্ষে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এই বিপ্রতীপযাত্রা মানিয়া লওয়া সম্ভব কি? স্বভাবতই তাঁহারা ক্ষুব্ধ। ইহা হয়তো মিসরবাসীর দুর্ভাগ্য যে, গণতন্ত্রের অভিযাত্রার মশাল ছিল ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর মুসরির মতো কট্টরপন্থী নেতার হাতে। যেই মিসর জ্ঞানে, শৌর্যে এবং বিজ্ঞানে এক সময় বিশ্বের প্রথম সারির দেশ ছিল, একনায়কতন্ত্র আর দুঃশাসনের ধারাবাহিকতায় সেই দেশের মানুষ আজ দিশাহারা। দীর্ঘ তিন দশকব্যাপী জরুরি আইনের ছায়াতলে জীবনযাপন, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, সীমাহীন দুর্নীতি বিবিধ কারণে মিসরীয়রা পরিবর্তন চাহিয়াছিল, সেই পরিবর্তনের জন্য রক্তও দিয়াছিল। কিন্তু যেকোনো কারণেই হউক, তাহাদের রক্তজাত ফসল নূতন রক্তের তৃষ্ণা জাগাইয়াছিল। এই রক্তের মূল্য পাইতে মিসরবাসীকে সম্ভবত আরও রক্ত ঝরাইতে হইবে। মিসরের গণমানুষের প্রত্যাশা পূর্ণ হইয়া ভূমধ্যসাগর তীরে গণতন্ত্রের জোয়ার হয়তো আবার আসিবে—কবে, তাহা কেহ বলিতে পারে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন