বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা।
তোমার শ্যামল শোভার বুকে বিদ্যুতেরই জ্বালা \
তোমার মন্ত্রবলে পাষাণ গলে, ফসল ফলে
মরু বহে আনে তোমার পায়ে ফুলের ডালা \
মরোমরো পাতায় পাতায় ঝরোঝরো বারির রবে
গুরুগুরু মেঘের মাদল বাজে তোমার কী উত্সবে।
সবুজ সুধার ধারায় প্রাণ এনে দাও তপ্ত ধরায়,
বামে রাখ ভয়ঙ্করী বন্যা মরণ-ডালা
গ্রীষ্মের দাবদাহে দাহিত দগ্ধ উত্তপ্ত ধরণীকে শীতল বারিধারায় সিঞ্চিত করে এলো নববর্ষা। প্রায় প্রতিদিন অপরাহ্নে আকাশ সেজে উঠে কালো মেঘের ভেলায়। বিদ্যুতের চমক, গুরুগুরু গর্জন, এলোমেলো বাতাস বয়ে আনে নববার্তা, যে বার্তার মধ্যে রয়েছে আশ্বাস, রয়েছে বিশ্বাস। মাটি হয়ে উঠে উর্বর সরস, চারাগাছ পায় জীবনীশক্তি, পথের ধূলো নিমেষে বিলীন হয়ে যায়, গাছের পাতারা হয়ে উঠে সজীব সহাস্য। যেন কোন অলৌকিক যাদুস্পর্শে তাদের সকল কষ্ট হয় বিদূরিত।
নগরবাসীরা বৃষ্টিধারায় স্নাত হতে চান কি না জানি না, শুধু জানি আমার মতো অনেক প্রকৃতিপ্রেমিকই বৃষ্টির স্পর্শ নিতে কখনো বারান্দায়, কখনো ছাদে, কখনোবা পথে নেমে আসেন। এ যে আল্লাহ্তায়ালার নিয়ামত, একে বরণ করে নিতে হবে সানন্দে। আম্মা বলতেন, বৃষ্টির সময় প্রার্থনা করলে তা কবুল হবে। সেই বিশ্বাস আমি ছড়িয়ে দিলাম আমার কন্যা, তার কন্যা ও অন্যদের মনে। মুনাজাতের হাত, তাতে যুক্ত হলো নিজ পরিবারের সঙ্গে আরো দশটি পরিবার ও দেশের জন্য মঙ্গল কামনা।
পার্শ্ববর্তী দেশে হয়েছে নবসূর্যের উদয়। ঘিয়ে পাঞ্জাবির সঙ্গে হালকা বাদামী সদরিয়া পরিহিত সুঠামদেহী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতির ভবন প্রাঙ্গণে যখন শপথ নিলেন মনে হলো জনগণের জন্য কল্যাণকর কার্যধারা গ্রহণের ইচ্ছাই তাঁর চেহারায় উদ্ভাসিত। দারিদ্র্যে শৈশব অতিবাহিত জীবনে তিনি শিখেছেন ত্যাগ করার শিক্ষা।
বড়লোকের বিলাসব্যাসনে বড় হয়ে ওঠা সন্তানেরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে কিনা বুঝতে পারছি না। বিদ্যাসাগর, হাজী মুহাম্মদ মহসীন, আয়াতুল্লাহ খোমেনী দীনহীন জীবন-যাপন করেছেন, তাঁদের কর্ম নিয়ে গেছে সুখ্যাতির গগনে। সর্বোত্তম উদাহরণ ‘আনিসুল গারীবিন’ নবী করিম হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আরবের ধুধু মরু, উদার প্রকৃতি, পিতৃহীন নিঃস্ব শিশুকে আপন হাতে শিক্ষা দিয়েছে, তাঁর পাশে রয়েছেন সমগ্র বিশ্বের নিয়ন্ত্রক আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন। তাই তো তিনি হয়ে উঠলেন মানবশ্রেষ্ঠ, নবীশ্রেষ্ঠ, সমগ্র বিশ্বের মাখলুকাতের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ।
উপলব্ধি করা দরকার বিত্ত দিয়ে নয়, চিত্ত দিয়ে, সময় দিয়ে, স্নেহ দিয়ে মানুষ করে তুলতে হবে আপনার সন্তানকে। আমাদের জীবনে সময়ের যে বড় অভাব, সবটুকু সময়ই যেন স্বার্থচিন্তায় আবদ্ধ। গাড়ি-বাড়ি, শাড়ি-গয়না, মোবাইল এসএমএস স্কাইপ ইন্টারনেট কী ভয়ংকর রোগের মতো আমাদের দূষিত করে তুলছে। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর চেয়েও এদের পরিণাম ভয়াবহ। কালো মেঘে ছেয়ে থাকা আকাশেও একসময় সূর্যের আলো ঝিলমিলিয়ে ওঠে। আমাদের জাতীয় জীবনেও সেই আলোর প্রয়োজন। আঠারো কোটি মানুষের শক্তি তো কম নয়, সেখানে সুন্দরের, সত্যের, ন্যায়ের আলো জ্বালিয়ে দেয়া আমাদেরই কর্তব্য।
লেখক :শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক
[email protected]
