জাতিসংঘ শান্তি মিশনে নারী পুলিশ: প্রসঙ্গ বাংলাদেশ

আপডেট : ৩০ মে ২০১৪, ২১:১৭
অশান্ত হয়ে ওঠা এই নক্ষত্রে ব্যস্ত জাতিসংঘ। তাবত্ পৃথিবীর শান্তির ঝাণ্ডা মহাসচিবের হাতে! তারই আহ্বানে আমাদের নারী পুলিশের কঙ্গো গমন। অচেনা দেশ, অন্যরকম মানুষ, বিচিত্র পরিবেশ সব মানিয়ে শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের মেয়েরা। দৃঢ় প্রত্যয়ে বহন করে চলছে তিনটি প্রতীক- জাতিসংঘ, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ পুলিশের পতাকা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশ পুলিশবাহিনীর মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি। শুধু অংশগ্রহণ নয়, প্রথম থেকেই বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের সাফল্য ও কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। একজন নারী যখন পুলিশ হয় তখন তাকে দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে হয়। এর কোন বিকল্প হয় না। নারীকে তার পরিবার বা সংসার যেমন সামলাতে হয় তেমনি কর্মক্ষেত্রেও ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করতে হয়। নারীকে পরিবার-পরিজনসহ সন্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক্ষেত্রে সকল দিক ম্যানেজ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটাই সবচেয়ে কঠিন। পুরুষের ক্ষেত্রে যদিওবা একই বিষয় প্রযোজ্য তবু বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে মেয়েদেরকেই সন্তান লালন-পালন এবং তাদের দেখাশুনার বিষয়গুলো প্রায় শতভাগ সামলাতে হয়। সেক্ষেত্রে একজন নারী কর্মকর্তা নয়, একজন মা হিসেবে সন্তানকে সাময়িক বিচ্ছিন্ন করে চাকরি করা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে অনেকগুলো ফ্যাক্টর জড়িত। প্রথমত, সন্তানের দেখাশুনার ভার, লেখাপড়া এবং স্কুলে পাঠানো। এছাড়া মায়ের অনুপস্থিতিতে শূন্যতা পূরণ, সঠিকভাবে সন্তানের বেড়ে ওঠা সবকিছু মিলিয়ে যেন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা। এরপর যদি থাকে বাড়তি টেনশন যেমন- স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ী তাদের সমর্থন থাকবে কিনা সন্তানকে দেখাশুনার ভার কার উপরে ন্যস্ত করা হবে, একবছরের খরচাপাতি কে বহন করবে ইত্যাদি। মনে হতে পারে এগুলো খুবই ছোট বিষয় যা ধর্তব্য নয়। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এগুলোই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথায় যদি আসি তাহলে বলতে হয়, নারীরা অর্থ উপার্জন করছে তা কি সে স্বাধীনভাবে খরচ করতে পারছে? মেয়েরা বিয়ের পর তার বাবা-মাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারছে কি না? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতা তিক্ত। হয় স্বামীর হাতে বা পরিবারের অন্য কারো হাতে বেতনের পুরোটাই তুলে দিতে হচ্ছে। আর লুকিয়ে বা এদিক-সেদিক করে হয়তো সে নিজের চাহিদা পূরণ করছে। আর্থিক অসচ্ছলতাই কি এর কারণ, নিশ্চয়ই নয়। মানসিকতাই বড় বিষয়। এ সকল প্রতিবন্ধকতার মাঝে যে নারীর পথ পরিক্রমা ‘তার চোখে বিশ্ব দেখা’ .... যতটা শ্রুতিমধুর বাস্তবে ঠিক ততটাই বন্ধুর। এসবের পরও ভালো লাগে যখন দেখি নারীরা পারে তার প্রমাণ মেলে অনেকক্ষেত্রে। ইদানীং বাংলাদেশ পুলিশে নারী কর্মকর্তা এবং নারী সদস্যের সংখ্যা বাড়ছে। ব্যক্তিগত সাক্ষাত্কারে জানা যায় মেয়েরা নিজের নিরাপত্তা এবং পরিবারকে সাপোর্ট দেবার জন্য পুলিশ সার্ভিসে যোগদানে উত্সাহিত হচ্ছে। প্রতিকূলতার বেড়াজাল ভেঙ্গে নারীরা এগিয়ে আসছে। তাদের এই অগ্রযাত্রায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে সকলকে। প্রত্যেক নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে চাইলে তার অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এবং স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সম্পদে তার অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। এইরকম একটি ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে যখন একজন পুলিশ সার্ভিসে যোগদান করে তখন সে নারী, নারী থেকে পুলিশ হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যে কয়টি ফিমেল এফপিইউ আছে তার প্রত্যেকটিকেই নানা ঝুঁকির মধ্যেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। এবং অপারেশনাল সকল প্রোগ্রামে তাদেরকে অংশগ্রহণ করতে হয় বিশেষ গুরুত্বের সাথে। সব ক্ষেত্রেই নারীরা প্রশংসিত হচ্ছে। এটি নারী পুলিশ তথা বাংলাদেশ পুলিশের অর্জন। নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ পুলিশে নারীদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য প্রতিবছর যেমন পুলিশ সার্ভিসে যোগদানের হার বাড়াতে হবে তেমনি জাতিসংঘ মিশনেও নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি করতে হবে। এতে নারীদের অভিজ্ঞতা যেমন সঞ্চয় হবে তেমনি আত্মমর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাস দুইই বাড়বে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আসার জন্য মানসিক প্রস্তুতিই বড় বিষয়। আমাদের মত সরকারি চাকরিজীবী যারা নারী কিংবা পুরুষ আকাশে উড়া বা বিদেশ ঘোরার এই সুযোগ কী কম বড়! তাই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। প্রসঙ্গক্রমে বলা প্রয়োজন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আগমনের পূর্বপ্রস্তুতি ও পরিকল্পনা আরও গুরুত্বসহকারে হওয়া উচিত। আমরা কখনই চাইবো না ফিমেল এফপিইউ বন্ধ হয়ে যাক বরং বাংলাদেশ সাফল্যের সাথে এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। তবে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির জন্য আরো একটু সময় দেয়া প্রয়োজন। যেমন- প্রশিক্ষণটি যথাযথভাবে গ্রহণ করা সংশ্লিষ্ট এরিয়ার ভাষাজ্ঞান, মিশন চলাকালীন প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ও সরকারি সরঞ্জাম ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া দরকার। মিশন চলাকালে পুলিশ সদস্যদের খুব কম সংখ্যক ছুটিতে দেশে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে একবছরের জন্য প্রস্তুতি বড় বিষয়। কোন মিশন এরিয়াতে কি কি বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন প্রয়োজন বা উক্ত সময়ে কি কি কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে এ বিষয়ে পূর্ব ধারণা থাকলে মানসিক প্রস্তুতি ভালভাবে নেয়া সম্ভব। রোটেশন চেঞ্জের যুক্তিগ্রাহ্য সময়ের পূর্বেই পরবর্তী রোটেশনের প্রশিক্ষণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত যাতে নির্ধারিত সময়েই রোটেশন সম্ভব। কারণ সন্তান এবং পরিবারের জন্য কোন সুযোগ নেই তারপরও সত্যিকার অর্থে সময়ের শেষসীমায় পৌঁছালে দেশের প্রতি মায়া ও অস্থিরতা দুইই বেড়ে যায়। দেশে ফেরার এই ক্ষণ পিছিয়ে গেলে কর্মচঞ্চলতা কমে যায়। অন্যদিকে অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে পারিবারিক সমস্যাগুলো ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হয়ে পড়ে। তাই মিশনকালে প্রাসঙ্গিক ও পারিপার্শ্বিক এবং চলমান এসকল সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ পুলিশকে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে এবং সমস্যা সমাধানে সুষ্ঠু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বাধিক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের এবং সর্বোচ্চ সাফল্যের দাবিদারও বাংলাদেশ। বর্তমানে মোট ৭টি মিশন এরিয়াতে (সুদান ও সাউথ সুদান, মালি, আইভোরি কোস্ট, দারফুর, হাইতি, কঙ্গো এবং লাইবেরিয়া) বাংলাদেশ পুলিশ পেশাদারিত্বের সাথে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া এ মুহূর্তে হাইতি এবং ডিআর কঙ্গোতে দু’টি বাংলাদেশ ফিমেল ফরম পুলিশ ইউনিট সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা দিবস-২০১৪-এ প্রত্যাশা করি জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সফলতা অর্জন করুক। শান্তি মিশনে শান্তিকামী মানুষের জয় হোক আর সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাত দূরীভূত হোক। লেখক:এসি এ্যাডমিন, রমনা, ডিএমপি এবং ব্যানএফপিইউ-১, রোটেশন-৭, কিনসাসা, ডিআর কঙ্গো ফেরত।