[ স্ম র ণ ]

মানিক মিয়া : অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস

আপডেট : ৩১ মে ২০১৪, ২১:৫৬
উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক, তদানিন্তন পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপকার, ৬ দফা আন্দোলনের অগ্রসেনানী দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর তিনি ছিলেন মসি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তার অসি। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া দৈনিক ইত্তেফাকের মাধ্যমে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের মাধ্যমেই স্বায়ত্তশাসন ও ৬ দফা দাবিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। মানিক মিয়া ছিলেন ৬ দফা আন্দোলনের চালিকাশক্তি। ৬ দফা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়। মানিক মিয়ার পথ ধরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ কারণে বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে স্মরণ করে। ১৯৬৯ সালে ১ জুন তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে মৃত্যুবরণ করেন । প্রতিবছর তার মৃত্যুদিবসে জাতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানায়। তফাজ্জল হোসেন ১৯১১ সালে বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম মানিক মিয়া। অনেক চেষ্টা করেও তার সঠিক জন্ম-তারিখ পাওয়া যায়নি। তিনি যখন ম্যাট্রিক পাস করেন তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সার্টিফিকেটে বছরের উল্লেখ করত কিন্তু মাস তারিখ লেখা থাকত না। তার পিতার নাম মুসলেমউদ্দিন মিয়া। তাদের বাড়ি মিয়াবাড়ি নামে বিখ্যাত। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি ভান্ডারিয়া মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করে পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার চাচা আফতাবউদ্দিন আহমেদ পিরোজপুর বারের উকিল ছিলেন। তফাজ্জল হোসেন ১৯৩১ সালে ম্যাট্রিক পাস করে বরিশাল বিএম কলেজে ভর্তি হন। কলেজের অধ্যক্ষ শ্রী সতীশ চন্দ্র চ্যাটার্জী ছিলেন তখন বরিশালে রাজনৈতিক নেতা। ছিলেন একে ফজলুল হক, খান বাহাদুর, হেমায়েতউদ্দিন আহমেদ, হাশেম আলী খান, সতীন সেন, সরল দত্ত প্রমুখ। বিএম কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অশ্বিনী কুমার দত্তের আদর্শ-সত্য প্রেম, পবিত্রতায় তিনি প্রভাবিত হয়েছেন। তার সহপাঠী ছিলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, কবি আহসান হাবিব প্রমুখ। মানিক মিয়া ১৯৩৩ সালে আইএ এবং ১৯৩৫ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করে। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। এরপর তিনি পিরোজপুর মুনসেফ আদালতে চাকরি গ্রহণ করেন। তার চাচা আফতাবউদ্দিন ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা ও সোহরাওয়ার্দীর ভক্ত। ১৯৩৬ সালে নির্বাচনকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পিরোজপুরে আসেন। ১৯৩৭ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৪২ সালে সোহরাওয়ার্দী পিরোজপুরে এলে চাচা আফতাবউদ্দিন আহমদের মাধ্যমে মানিক মিয়া সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচিত হন। তার মেধা দেখে সোহরাওয়ার্দী তাকে প্রপাগাণ্ডা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৯৪৬ সালের ২৪ এপ্রিল শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এ সময় তিনি তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে কলকাতায় মুসলিম লীগের সহকারী দফতর সম্পাদক নিয়োগ করেন। ১৯৪৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর তিনি দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ময়মনসিংহের আবুল মনসুর আহমেদ। পত্রিকার সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। মানিক মিয়া ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্বাধীন বৃহত্তর বাংলা প্রস্তাবের সমর্থক। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। ১৯৪৯ সালের ৫ মার্চ সোহরাওয়ার্দী কলকাতা ত্যাগ করে করাচি আসেন। মানিক মিয়া ঢাকায় চলে আসেন। মুসলিম লীগ সরকার পত্রিকাটি পূর্ববাংলায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। তারপর ১৯৫০ সালে পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী-মুসলিম লীগ গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী, প্রকাশক ইয়ার মোহাম্মদ খান এবং সম্পাদক হলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। এ সময় ঢাকা থেকে মুসলিম লীগ সরকারের সমর্থক দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক মিল্লাত, মর্নিং নিউজ প্রকাশিত হত। বিরোধী দলের কোনো পত্রিকা ছিল না। জনগণের কথা, বাঙালিদের কথা বলার জন্য সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট প্রথম প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি ঢাকার ৯ নম্বর হাটখোলা রোডে অবস্থিত প্যারামাউন্ট প্রেস থেকে মুদ্রিত এবং ৯৪ নম্বর নবাবপুর থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। সোহরাওয়ার্দী, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পত্রিকার প্রকাশ ও প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সোহরাওয়ার্দী নিজের অর্থ দিয়ে হাটখোলায় ইত্তেফাক অফিসের জমি ও প্রেস ক্রয় করে দেন। মানিক মিয়া শাণিত লেখার মাধ্যমে পত্রিকাকে জনপ্রিয় করে তুলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার সংবাদ ইত্তেফাকে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় এবং তা সারা বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৯৫৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর সাপ্তাহিক ইত্তেফাক দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে। মানিক মিয়া পত্রিকায় মুসাফির নামে কলাম লিখে পূর্ব বাংলার জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেন। তখন মুসলিম লীগ সরকারের দুর্নীতি, ১৬ টাকা সের লবণ কেলেঙ্কারি, ৫২-র ছাত্র হত্যা, দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য তুলে ধরে বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেন। ১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় হয়। ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন করে। যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পিছনে ছিল মানিক মিয়ার সাহসী লেখা। ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত হয়। দলকে সংগঠিত ও অসাম্প্রদায়িক করতে মানিক মিয়া সাহসী ভূমিকা পালন করেন। মানিক মিয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণে তিনি দলের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসের ৭ তারিখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট সামরিক আইন জারি করে জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করেন। ইত্তেফাকের রাজনৈতিক মঞ্চে মুসাফির নামে মানিক মিয়া সামরিক আইনের সমালোচনা করতেন। সামরিক সরকার ১৯৫৯ সালে সামরিক আইন ভঙ্গের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে। ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি সরকার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে করাচিতে গ্রেফতার করে। তার গ্রেফতারের প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান ও মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করে। আইয়ুব খান ১৯৬২ সালের ১ মার্চ তার শাসনতন্ত্র ঘোষণা করেন। ১৯৬২ সালের ৮ জুন সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়। শেখ মুজিব ও মানিক মিয়াসহ অনেক রাজবন্দি মুক্তি পান। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৬২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান। গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য সোহরাওয়ার্দী ১৯৬২ সালের ৪ অক্টোবর ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিভ ফ্রন্ট (-এনডিএফ) গঠন করেন। মানিক মিয়া গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গা শুরু হয়। দাঙ্গা প্রতিরোধে ১৯৬৪ সালের ১৬ জানুয়ারি মানিক মিয়া তার পত্রিকা অফিসে এক জরুরি সভা আহ্বান করেন। সভায় মানিক মিয়াকে আহ্বায়ক করে প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয় এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শীর্ষক ইস্তেহার প্রচার করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান কমিটির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদসহ অনেককে গ্রেফতার করে। তিনি তার লেখনির মাধ্যমে দুর্বৃত্তদের হুঁশিয়ার করে দেন এবং হিন্দুদের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগের ৬ দফা আন্দোলনে মানিক মিয়া বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ৬ দফা রচিত হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে ৬ দফা ঘোষণা দেন। ৬ দফার মূল দাবি ছিল- সার্বজনীন ভোটে পার্লামেন্টের নির্বাচন, সংসদীয় গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন ও পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ। ৬ দফা ঘোষণার পর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান ভীত হয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার শুরু করে। আওয়ামী লীগ ৬ দফার দাবিতে ৭ জুন হরতাল পালন করে। পুলিশের গুলিতে মনুমিয়াসহ অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন। ৬ দফা আন্দোলনের মুখপত্র দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে ১৯৬৬ সালের ১৫ জুন গ্রেফতার করা হয়। ১৬ জুন মোনায়েম খান দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেন এবং নিউ নেশন প্রেস বাজেয়াপ্ত করে। পত্রিকার শত শত কর্মচারী আর্থিক সংকটে পড়েন। তারা অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হন। ঢাকা জেলে মানিক মিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা আইনে বিচার শুরু হয়। তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় যে, তিনি ৬ দফা আন্দোলন থেকে সরে এলে তাকে মুক্তি ও পত্রিকা প্রকাশনার অনুমতি দেয়া হবে। মানিক মিয়া আইয়ুব-মোনায়েম খানের নিকট মাথা নত করেননি। তিনি ৬ দফা ও বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চালিয়ে যান। শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জন বাঙালির বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু হয়। ১৯৬৬ সালের ২৯ মার্চ সরকার বাধ্য হয়ে মানিক মিয়াকে মুক্তি দেয়। কিন্তু ইত্তেফাক পত্রিকাকে মুক্ত করেনি। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানকালে ১০ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক পুনঃপ্রকাশের অনুমতি দেয়া হয়। ২ বছর ৭ মাস পরে আবার ইত্তেফাকের রাজনৈতিক মঞ্চে মুসাফির ফিরে এলেন গ্রাম-বাংলার সংগ্রামী মানুষের কাছে। তার লেখনি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ’৬৯ এর- ২৬ মে পাকিস্তানের পিন্ডি গমন করেন। সেখানে ১ জুন আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন। লেখক: ইতিহাসবিদ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন