২৭ মে (২০১৪) একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘দলীয় উপাচার্যে ডুবছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক প্রতিবেদনে শিক্ষা নয়, রাজনীতি অনিয়ম দুর্নীতি রমরমা বলে দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে শিক্ষার পরিবর্তে অনিয়ম-দুর্নীতি আর রাজনীতিই প্রাধান্য পাচ্ছে সেখানে। দলবৃত্তির এই চর্চা শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতিকেও দিন দিন নাজুক করছে। হরহামেশা ঘটছে সহিংস ঘটনা। শিক্ষাবিদদের বরাদ দিয়ে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষার এ প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেয়া উচিত। উক্ত প্রতিবেদনে আরো লেখা হয়েছে, রাজনৈতিক নিয়োগের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক তালিকায় মানের দিক থেকে স্থান করে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং তার জন্য দায়ী সরকার।
উল্লেখ্য, দেশের ৩৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করেই অধিকাংশ উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে- এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। দলীয় আনুগত্যকে দীর্ঘদিনের রেওয়াজ বলাও অযৌক্তিক। কারণ উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে শেষ সিদ্ধান্ত প্রদান করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আর প্রত্যেকের জীবন বৃত্তান্ত, একাডেমিক সাফল্য পর্যালোচনা করেই তিনি সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁর মতামতকে গ্রহণ করেই উপাচার্যদের নিয়োগ দেয়। ‘যে দল ক্ষমতায় আসে সেই দলের অন্ধ সমর্থকরা এ পদে নিয়োগ পেয়ে থাকেন’- এ বক্তব্য যথার্থ নয়। প্রথমত উপাচার্যরা নিয়োগ পান একাডেমিক যোগ্যতায়। তারপর তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম ও সংস্কারমুক্ত মুক্তবুদ্ধির অনুসারী কিনা তা বিবেচনায় এনে প্রশাসনিক পদে পাঠান হয়। এসব চেতনায় অবিশ্বাসীরা কিংবা দুর্বল একাডেমিক রেকর্ড নিয়ে চাকরি প্রত্যাশীরাই মূলত উপাচার্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে থাকে যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ধরুন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্ট অনুসারে প্রশাসন পরিচালনায় উপাচার্যকে সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সেখানে সিনেট কিংবা অন্য কোনো পরিষদের(সিন্ডিকেট, ডিন) সদস্যদের জন্য নির্বাচনের ব্যবস্থা নেই।
সেক্ষেত্রে উপাচার্য প্রফেসর ড. মীজানুর রহমান তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রাখবেন এটাই স্বাভাবিক। প্রশাসন চালাচ্ছেন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুসারে কারো প্রতি অনুরাগ কিংবা বিরাগের বশবর্তী হয়ে নন। অনেক সময় দেখা গেছে সরকার দলীয় শিক্ষক কিংবা ছাত্র নেতাদের অযৌক্তিক দাবি মেনে নিতে অপারগ হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। উপাচার্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা বিরোধী দলের সমর্থক কেবল নয় নিজের দলের শিক্ষকদের ইন্ধনেও হয়ে থাকে, যা ন্যক্কারজনক। নিজেদের স্বার্থ রক্ষা পেলে উপাচার্য ভালো বনে যান আর নিজেদের আনডিউ স্বার্থ হাসিল না হলে তিনি মন্দ হিসেবে গণ্য হন। এ বাস্তবতায় উপাচার্যদের দলীয় আনুগত্যকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের রাজনীতিকে খারাপ বলার মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার চক্রান্ত করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। কারণ অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম পাথেয় ছিল। তার ধারাবাহিকতায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রাজনীতি চর্চা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট অনুসারে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগরে নির্বাচিত উপাচার্য নিযুক্ত রয়েছেন। সেদিক থেকে দাবি করা যেতে পারে যে, উপাচার্য নিয়োগে গণতান্ত্রিক ধারা, যোগ্যতার মাপকাঠি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এর সবকিছু একীভূত করা হোক। এ ধরনের ব্যবস্থা চর্চিত হলে উপাচার্যদের ছত্রচ্ছায়ায় দলীয় ছাত্র সংগঠনের বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ থাকবে না বলে আমাদের বিশ্বাস। তাছাড়া বর্তমান সরকার দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বজায় রাখা মন্ত্রণালয়ের জন্য কোনো ব্যাপার নয়। অবশ্য একথা ঠিক কোনো শিক্ষকের দলীয় মনোভাবে কাজ করা উচিত নয়।
যা কিছু করা দরকার, সব শিক্ষা ও জাতীর স্বার্থে করতে হবে। কিন্তু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের জন্য সকল উপাচার্যকে ঢালাওভাবে দায়ী করাও ঠিক নয়। কারণ কোনো উপাচার্যের দলীয় মনোবৃত্তি নিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। তবে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই সরকারের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কিছু সুযোগ-সুবিধা নিতে চায় এটাই স্বাভাবিক। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দলীয়করণের সুযোগ কম। কারণ শিক্ষা নিয়ে দলীয়করণ করলে শিক্ষার মান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ধরে রাখা সম্ভব নয়।
বস্তুত, চার দশকে শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মযজ্ঞ প্রসারিত হয়েছে। এরই পরিণতিতে স্থাপিত হয়েছে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়; নিযুক্ত হয়েছেন বিজ্ঞ উপাচার্যবর্গ। ব্যক্তির জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন বা কলাকৌশল আয়ত্ত করতে সহায়তা করার এসব প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যত্-প্রসারী ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমরা মনে করি। কারণ দলীয় প্রশাসক হলেও মানের দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমান্বয়ে উচ্চ স্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। নতুন নতুন বিভাগ ও মেধাবী শিক্ষকদের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। জ্ঞানের প্রসারিত দিগন্তে বিশ্বের যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বরেণ্য গবেষকদের সঙ্গে সমান্তরাল মেধা ও যোগ্যতা প্রদর্শনে সক্ষম এদেশের বর্তমান প্রজন্ম।
(লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,
[email protected]
