মাতৃমৃত্যুর পরোক্ষ কারণও হ্রাস করিতে হইবে

আপডেট : ০১ জুন ২০১৪, ২২:০৪
মে মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস পাইয়াছে। বিগত কয়েক দশকে এই হার হ্রাস পাইবার পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নেও অগ্রগতি হইয়াছে। প্রতিবেদনে ১৯৯০ হইতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মাতৃমৃত্যু ও মাতৃস্বাস্থ্য পরিস্থিতি তুলিয়া ধরা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিবেচনায় বিভিন্ন মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখ করিবার মতো। বিশেষত স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের অবস্থান মন্দ নহে। কিন্তু ইহা সন্তোষজনক, তাহা বলা যাইবে না। মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস পাইবার খবরটি যেমন সত্য, তেমনি পৃথক একটি গবেষণা হইতে, ইহার ভিন্ন একটি চিত্রও পাওয়া গিয়াছে। ঐ গবেষণা হইতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ কমিয়া আসিলেও গত ১০ বছরে পরোক্ষ কারণে মৃত্যুর হার ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। আর এই দুই কারণ মিলিয়া প্রতিদিন গড়ে ২১ জন মায়ের মৃত্যু হইতেছে। সরকারের এক জরিপ ও প্রভাবশালী চিকিত্সা সাময়িকী ল্যানসেট-এর বিশ্লেষণ হইতে এই চিত্র পাওয়া গিয়াছে। ল্যানসেট ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ১৮৮টি দেশের মাতৃমৃত্যুর তথ্য, প্রবণতা ও কারণ বিশ্লেষণ করিয়াছে। মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস পাইবার প্রবণতা বিশ্লেষণ করিয়া সাময়িকীটি বলিয়াছে, ২০১৫ সালের মধ্যে মাত্র ১৬টি দেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি-৫) অর্জন করিতে পারিবে, কিন্তু এই তালিকায় বাংলাদেশ নাই। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণগুলি হইলো রক্তক্ষরণ (৩১ শতাংশ), খিঁচুনি বা একলাম্পশিয়া (২০ শতাংশ), বিলম্বিত প্রসব (৭ শতাংশ), গর্ভপাত (১ শতাংশ), অন্যান্য প্রত্যক্ষ কারণ (৫ শতাংশ)। তবে পরোক্ষ কারণে মৃত্যু ঘটে ৩৫ শতাংশ মায়ের। পরোক্ষ কারণগুলির মধ্যে রহিয়াছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগ, ক্যানসার, স্থূলতা, যক্ষ্মা, রক্তস্বল্পতা, হেপাটাইটিস বি, বেশি বয়সে প্রথম সন্তান ও বেশি সন্তান নেওয়া, এইচআইভি, এইডস, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি। সর্বশেষ মাতৃস্বাস্থ্য বিষয়ক জরিপ, বাংলাদেশ মেটারনাল মরটালিটি অ্যান্ড হেলথ কেয়ার সার্ভে ২০১০-এ বলা হইয়াছে, প্রতি হাজার জীবিত সন্তান জন্ম দিতে গিয়া পরোক্ষ কারণে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন ৬৮ জন মা। অথচ একই বিষয়ে ২০০১ সালে প্রথম জরিপের তথ্য হইতেছে, একই কারণে মায়ের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৯। এই হিসাবে গত ১০ বছরে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাইয়াছে প্রায় ৩৯ শতাংশ। বাংলাদেশ সরকারের মাতৃমৃত্যু হার কমাইয়া আনিবার যাবতীয় উদ্যোগ প্রত্যক্ষ কারণগুলিকে ঘিরিয়া। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, এমডিজির লক্ষ্য পূরণ করিতে হইলে মাতৃমৃত্যুর শুধু প্রত্যক্ষ কারণ কমাইলেই চলিবে না, পরোক্ষ কারণগুলির দিকেও নজর দিতে হইবে। অর্থাত্ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি প্রাণঘাতী রোগগুলির প্রতিরোধ ও প্রতিকারের সেবা আরও অধিক হারে জনগণের দোরগোড়ায় লইয়া যাইতে হইবে। পাশাপাশি এইসব রোগব্যাধি বিষয়ক সচেতনতা কর্মসূচি অধিক কার্যকরভাবে হাতে লইতে হইবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সহিতও এইসব প্রাণঘাতী ব্যাধি দূরীকরণের সেবা ও প্রচারাভিযানকে সমন্বিত করিতে হইবে। বার্ষিক বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে এইসব কর্মসূচি প্রান্তিক ও গ্রামীণ পর্যায়ে ছড়াইয়া দিতে হইবে। তাহা হইলে মাতৃমৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ দূরীকরণের পাশাপাশি পরোক্ষ কারণগুলিকেও জয় করা সম্ভব হইবে।