হাওরাঞ্চলে ‘আভুরা সড়ক’

আপডেট : ০১ জুন ২০১৪, ২২:০৫
যুগ যুগ ধরে হাওরবাসী উন্নয়ন কার্যক্রম হতে বঞ্চিত, উপেক্ষিত। তারপরও হাওরবাসী বিরূপ পরিবেশে সাহসী, সংগ্রামী ও স্বাধীনতার শক্তির ও প্রগতির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। স্বাধীনতা-উত্তর প্রত্যেকটি সাধারণ নির্বাচনে হাওরবাসী তার প্রমাণ রেখেছে। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিপরীত শক্তির কাছ হতে পেয়েছে অবহেলা আর বঞ্চনা। ‘ভাটির শার্দুল’ হিসাবে খ্যাত এডভোকেট আ. হামিদ আর জননেতা মরহুম আ. সামাদ আজাদের উদ্যোগে স্বাধীনতা-উত্তর প্রতিষ্ঠিত ‘হাওর উন্নয়ন বোর্ড’ কিছু কার্যক্রম শুরু করলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের গত টার্মের সরকারের সময় হাওর উন্নয়ন বোর্ড পুনর্গঠন এবং হাওরের জন্য যুগান্তসৃষ্টিকারী “ডুবা সড়ক” নির্মাণ উন্নয়ন কার্যক্রমের শুভ সূচনা করেছিল। এ ‘ডুবা সড়ক’ নির্মিত হওয়ায় হাওরের অনেক অধিবাসী প্রথমবারের মতো বাস্তবে যান্ত্রিক যান বা রিকশা দর্শন করেছেন। এরফলে যোগাযোগ, ফসল রক্ষা ও পরিবহনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আর বর্তমানে এ সরকারের আরেকটা পদক্ষেপ হচ্ছে হাওরে ‘আভুরা সড়ক’ নির্মাণ। সায়র সম হাওরের টলটলায়মান ভরা বর্ষার পানি ভেদ করে, পানির উপর ভেসে বেড়ানো ‘পানাস সাপে’র মতো “আভুরা সড়ক” টিকে থাকবে। স্রোতের অনুকূলে, হাওরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর সমান্তরালে, উত্তর-দক্ষিণমুখী এ সড়ক হবে পানির মাঝে, পানির সাথে সহবান্ধবসম। অনেকটা পানির অনুকূলে, স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত না করে নির্মিত হবে এ সড়ক। উন্নয়নের পূর্বসূত্র হচ্ছে বিদ্যুত্ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো। হাওরের বুকে এঁকে-বেঁকে চলা এ ‘ডুবা ও আভুরা’ সড়ক হবে হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রমের শুভ সূচনার মেরুদণ্ড ও রোডম্যাপ। আর গভীরভাবে খননকৃত নদীগুলো হবে দেহনালীর শিরা, উপশিরাসম। “আভুরা সড়ক” শুধু যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে এমনটা আমি মনে করি না। শুধু হাওরাঞ্চলে উত্পাদিত স্বাভাবিক কৃষিপণ্য ও মত্স্য সম্পদের সহজ পরিবহনই নিশ্চিত করবে না। এর ন্যায্য মূল্য ও টাটকা বাজারজাতও নিশ্চিত করবে। এ সড়ক হবে হাওরাঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রমের রোডম্যাপ। এ সড়ককে কেন্দ্র করে হাওরাঞ্চলের সার্বিক জীবনযাত্রার চিত্র বদলে যাবে। তাঁদের আয়, রোজগার, জীবনধারণ ও কর্মসংস্থান সবকিছুই বৃদ্ধি পাবে। লাঘব হবে অভাব, অনটন। আমরা সবাই জানি, হাওরাঞ্চলে এক একটা গ্রাম হচ্ছে দ্বীপসম। নতুন গ্রাম সৃজন সেখানে ব্যয়সাপেক্ষ ও অনেকটা দুরূহ, কষ্টসাধ্য ব্যাপার। গ্রাম সৃজন যত না সহজ তারচেয়েও কঠিন হাওরের উদাম, টর্পেডো ভীম, ভাসমান মাইনের মতো শক্তিমান দৈত্যসম ঢেউ থেকে একে রক্ষা করা। এজন্যে হাওরের ‘ভিটেমাটি’ ঢাকার মাটি থেকেও দামী, মহামূল্যবান। ফলে এ সড়ককে কেন্দ্র করে নতুন বসতি স্থাপনের হিড়িক পড়ে যাবে। এর দু’ধারে জনবসতি গড়ে উঠবে। এ জনবসতিকে কেন্দ্র করে এর দু’ধারে গড়ে উঠবে নতুন সবুজ তরতাজা ফলদ-বনজ বৃক্ষরাজি। সবচেয়ে বড় আয় বর্ধনকারী কার্যক্রম হবে এ সড়কের দু’ধারে গড়ে ওঠা মত্স্য, ডেইরি-পোল্ট্রি খামার ও ফলদ বাগান সৃজন। মাছ চাষও করা যাবে। আমরা জানি, এক কেজি মাছের দাম এক কেজি ধানের চেয়ে প্রায় দশ গুণ বেশি। ফল-মূলের দামও অনেক বেশি। আমার স্বপ্ন হচ্ছে, আল্লাহর অপার দান, হাওরের অব্যবহূত এ মিঠা পানি হয়ে উঠবে সোনা উত্পাদনকারী, সোনার ডিম পাড়া হাঁস। পরশ পাথরসম ‘সোনাজল’। বিরাট লাভজনক, বিশাল এ কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে বহুমুখী ও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের অপূর্ব ও অপার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সাগরসম সায়র, হাওরের বুক চিরে “আভুরা সড়ক” নির্মাণ সম্ভব কিনা প্রশ্ন উঠতে পারে। এর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে। উত্তর হচ্ছে, বাংলাদেশেই এরকম পরিবেশে এ ধরনের সড়ক রয়েছে। চলনবিলের বুক চিরে ঢাকা-রাজশাহী সড়কই এর বড় উদাহরণ। লাভ-ক্ষতির হিসাবে “আভুরা সড়ক” হাওরবাসীর জন্য আশীর্বাদ হিসাবে বিবেচিত হবে। তারপরেও “আভুরা সড়ক” নির্মিত হলে কিছু অসুবিধারও সৃষ্টি হতে পারে। কোথাও পানির ও স্বাভাবিক নৌ-চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে। কোথাও আবার জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে। এরফলে হাওরে বর্ষায় পানির উচ্চতা, স্ফীতি ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে স্বাভাবিক কৃষি ও মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে রোগ-বালাই বৃদ্ধি পেতে পারে। মাছের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে মাইগ্রেশন ও প্রজনন কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে। “সোনাজল” হতে উত্পাদিত “কাঁচা সোনা” প্রতিনিয়ত বৈরী প্রকৃতির সাথে সংগ্রামী হাওরবাসীর জীবনকে স্থবির/অলস করে দিতে পারে। জমিতে জলজ আগাছা বৃদ্ধি পাবে। জীব-বৈচিত্র্যের পরিবর্তনও ঘটতে পারে। পানির গুণাগুণের পরিবর্তন হতে পারে। সতর্কতা হিসাবে নদী-নালাগুলো গভীরভাবে খনন করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখতে পারলে এগুলো ওভারকাম করা যাবে। সড়কে পর্যাপ্ত পরিমাণে কালভার্ট, পুল থাকতে হবে। এগুলোর উপর সড়কের সফলতা নির্ভর করবে। আগামী বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ ও খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করছে দেশের অব্যবহূত উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত হাওরাঞ্চলের সম্ভাবনার সদ্ব্যবহারের উপর। আগামীদিনের খাদ্য ভাণ্ডার হাওর এলাকা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। হাওরাঞ্চলে বিনিয়োগ রিটার্ন দেবে শতগুণে। “আভুরা সড়ক” দিয়ে সৌভাগ্যের চাকা ঘুরে ভাগ্যলক্ষ্মী হাওরে ফিরে আসবে এ আশা আমরা করতে পারি। লেখক :সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার, সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন