মেয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের নৈতিকতা

আপডেট : ০১ জুন ২০১৪, ২২:১৪
শিক্ষার গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও তার বাস্তবায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক বিস্তার ভাবনা, গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। সেই অনুসারে পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নও হয়েছে এবং আজও হচ্ছে। এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা মাথায় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বেশ তত্পর। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই এই তত্পরতা দৃশ্যমান। নিঃসন্দেহে এ সত্যকে তারা কর্মতত্পরতায় দেখাতে সক্ষমও হয়েছেন। এখনও হচ্ছেন। যার দরুন শিক্ষার হার ক্রমশ উপরের দিকে এগুচ্ছে। বিবিধ প্রতিবেদনে এমনই প্রকাশ। পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার প্রতি নারীর আগ্রহ বেড়েছে। বেড়েছে অংশগ্রহণ। সাফল্য অর্জনে নারী শিক্ষার্থী অভাবনীয় দৃষ্টান্ত রেখেছে, রাখছে। বেশ পেছনের সামাজিক কুসংস্কার, প্রতিবন্ধকতা ভেঙ্গে বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কো-এডুকেশন শিক্ষা পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, শিক্ষার ক্ষেত্রে এতসব অর্জন, স্বস্তির পাশাপাশি এক চরম ব্যর্থতা, অস্বস্তির অবস্থান গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। উপযুক্ত শাস্তির অভাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বহীনভাবে মনোভাবের কারণে বিষয়টি চরম আকার ধারণ করছে। বলতে দ্বিধা নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হয়ত একদিন নিষিদ্ধ জোন হিসেবে অভিভাবকের কাছে প্রতীয়মান হবে। হবে বলছি কেন, ইতোমধ্যে এখন অনেক অভিভাবক তার কন্যাসন্তানকে স্কুলে পাঠাতে নিরাপদ বোধ করেন না। স্বস্তি পান না। যে বিষয়টির কথা বলছি, তা প্রায় প্রত্যহই পত্রিকার পাতায়, সংবাদমাধ্যমগুলোয় স্থান পাচ্ছে। এমন একদিন নেই যেদিন এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ পায় না। সচেতন পাঠক ও নাগরিকরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন বিষয়টি কি। বিষয়টি হল, কতিপয় শিক্ষক কর্তৃক নারী শিক্ষার্থীর যৌন হয়রানি। নিঃসন্দেহে এরা গোটা শিক্ষক সমাজের কলংক। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নারী শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন কৌশলে কিছু শিক্ষকের এমন অনৈতিক আচরণের শিকার হচ্ছে। ঐ সকল শিক্ষকের ব্যক্তিদুষ্ট অনৈতিক আচরণের কারণে শিক্ষক সমাজের মর্যাদা যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সবচাইতে বেশি মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে জাতির জীবনে শিক্ষার মত একটি পবিত্র ও অতীব গুরুতপূর্ণ অধ্যায়ের। এই সত্য অনুধাবনের ন্যূনতম বোধ আদৌ কারোর আছে কিনা সেই প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তায় আমাদের মনে উদ্রেক হয়। আবার এই মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবার পাশাপাশি অভিভাবকদের আতংকিত হবার মাত্রাও বাড়ছে অবিশ্বাস্য রকম। আমার এক পরিচিত আতংকিত হয়ে আমাকে জানালেন, পত্রিকার পাতায় শিক্ষক কর্তৃক মেয়ে শিক্ষার্থীর যৌন হয়রানির শিকারের যে সংবাদ আসে তার অধিকাংশই মফস্বলের, গ্রাম-গঞ্জের। কিন্তু শহরের বিশাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে ঘটনাগুলো ঘটছে তার প্রকাশ নেই। সামাজিক চক্ষুলজ্জা ও প্রভাবশালীদের কাছে পরাস্ত হতে হবে এই ভেবে দেয়ালে পিঠ না ঠেকা পর্যন্ত অভিভাবকেরা মুখ খোলেন না। জানা যায় সরাসরি যৌন হয়রানির পাশাপাশি পরোক্ষভাবেও ক্লাসে নারী শিক্ষার্থীদের এ ধরনের নিপীড়নে অতিষ্ঠ করছে ঐ সকল শিক্ষক। যদি স্কুলগুলোতে অভিভাবকের পরিচয় গোপন করে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু রাখা হতো, তাহলে এমন অভিযোগপত্রের স্তূপ জমে যেতো বলে অনেক অভিভাবক আক্ষেপ করলেন। এ বিষয়গুলো সংবেদনশীল হওয়ায় অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা প্রচার মাধ্যমে সহসাই চলে আসার সম্ভাবনা থেকে যায়। এতে স্কুল কর্তৃপক্ষ তার প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখবার পাঁয়তারায় হয়ত সেই শিক্ষার্থীকে ছাড়পত্র দিতে বাধ্য হবেন, এমন আশংকায় অভিভাবকরা নীরব থাকেন। মুখ খোলেন না। বাধ্যতামূলক কোচিং, ভাল ফলাফল করাবার অজুহাতে অপেক্ষাকৃত অসচেতন নারী শিক্ষার্থীদের নিভৃতে নিয়ে কোনো কোনো শিক্ষক নামধারী তাদের ঘৃণ্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের স্বাক্ষর রাখছে। আরও একজন অভিভাবক জানালেন, একজন শিক্ষক তার তেরো বছরের পিতৃহীনা ভ্রাতুষ্পুত্রীকে একটি মোবাইল ফোন উপহার দিয়েছে। আতংকিত হয়ে তিনি স্কুল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেও কোন সাড়া পাননি। এভাবে লজ্জা, সংকোচে না বলতে পারায় অনেক নারী শিক্ষার্থী স্কুলে যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। উল্লিখিত ঘটনার বাইরেও অনেক লোমহর্ষক ঘটনা আছে, যা আমরা পত্রিকার পাতায় দেখছি অহরহ। এ ধরনের জঘন্য ঘটনার ধরন, ধারণ, কৌশল, বিস্তার ইত্যাদি লিখে শেষ করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, রাজনৈতিক প্রশ্রয় আমাদের লেখা অশেষ করে রাখবার পথ সুগম করেছে। একটি শিক্ষিত জাতি দেখবার প্রয়াসে শিক্ষার হার বৃদ্ধি, পাসের হার বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী ঝরে না পড়া ইত্যাদি নিয়ে আমাদের সন্তোষজনক সক্রিয়তা রয়েছে। উত্সাহ রয়েছে। উদ্দীপনা রয়েছে। রয়েছে সন্তোষজনক অভিজ্ঞতা সন্তুষ্টির লক্ষ্যমাত্রাকে ঘিরে। আর এসব নিয়ে আছে নানাপদ, বহুপদ সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ, বিদেশ ভ্রমণ ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়গুলো। বলতে দ্বিধা নেই এসব জায়গায় পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে সংখ্যাগত অর্জন আর অর্জন। আবার অর্জিত না হবার কারণও বুলেট আকারে উপস্থাপন হয়। সুপারিশও আসে বুলেট আকারে। বুদ্ধিওয়ালাদের মূল্যবান কথা কোড হয়। কিন্তু বুলেট বিদ্ধ হয় না কোনভাবেই শিক্ষক কর্তৃক নারী শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির বিষয়টি। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে এ বিষয়টি পাওয়ারলেস হয়ে থাকে। কিন্তু বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আসা বাঞ্ছনীয় শিক্ষার পরিবেশ নিরাপদ, পবিত্র রাখার স্বার্থেই। এক্ষেত্রে বিজ্ঞজনদের বোধোদয়ে কেন জাগ্রত হয় না বিষয়টি বুঝি না। জানা নেই এ ধরনের ইস্যু নিয়ে এমন ধরনের কোন প্রতিরোধমুখী আলোচনা, পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে কিনা। এই অপ-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কোন বুদ্ধিওয়ালা, কোন নারীবাদী, কোন রাজনীতিক রাস্তায় নেমে সরকারকে বাধ্য করেছেন একটি সেল গঠনের, তাও জানা নেই। জানা নেই জোরালো প্রতিবাদে কোন অপরাধী শিক্ষকের কঠিন শাস্তি পেতে হয়েছে। যতটা না অবাক হই তারচেয়ে বেশি লজ্জিত হই এই ভেবে যে, শিক্ষিত জাতিতে আত্মপ্রকাশের যে মহা উদ্যোগ, ভাবনা, স্বপ্ন আমাদের, তাতে কতিপয় শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত হবার এই বিষয়গুলো কোনভাবেই মেনে না নেবার দাবি, প্রতিবাদ সোচ্চার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় না। কোথায় যেন একটা ফাঁক রয়ে যায়। নিজেদের অর্জন আর সফলতার গুণগানে সকলে এতটাই বিভোর থাকে যে, ব্যর্থতার পাশ দিয়ে তারা ভুলেও হাঁটেন না। দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি- ব্যক্তি, গোষ্ঠীস্বার্থে আঘাতে যে ধরনের মুভমেন্ট, মোবিলাইজেশন দেখা যায় বুদ্ধিওয়ালাদের, রাজনীতিকদের, এ জাতীয় ঘটনায় তার ছিটেফোঁটাও থাকে না। একজন শিক্ষকের ভেতর যদি নৈতিকতা, সততা, পবিত্রতা অক্ষুণ্ন না থাকে, তাহলে তার দ্বারা সুস্থ আগামী কখনোই গড়ে উঠতে পারে না। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘বাছাই’ পর্বটি অভিজ্ঞ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠী দ্বারা হওয়া জরুরি। এতে আপাততভাবে যাতে নিয়োগযোগ্য শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা বোঝা সম্ভব হয়। সামাজিক মূল্যবোধ, পেশার গুরুত্ব ও মর্যাদাবিষয়ক প্রশিক্ষণে এনে তাদেরকে এ সংক্রান্ত করণীয় সম্পর্কে অবহিত করা যায়। পাশাপাশি অপরাধে লিপ্ত শিক্ষকের কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার। যাতে এ ধরনের অপরাধ আর কেউ করতে সাহস না পায়। এ ধরনের অপরাধকে কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত করতে হবে। আইন সংশ্লিষ্টদের এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা জরুরি। আর যারা এমডিজির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর, তারা শিক্ষা সব শেষে নারীবাদীরা যারা নারী-পুরুষের সমঅধিকারের বিষয়ে সোচ্চার সর্বদা, তারা শিশু নারী শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেন। আর সরকার? শিক্ষার প্রতি তার যে অঙ্গীকার, তা শিক্ষার পরিবেশ পবিত্র রাখবার মধ্যদিয়েই তা প্রমাণ করবার সুযোগ পাবে। আর এই সুযোগ হল অপরাধী শিক্ষকদের কঠিন শাস্তি দেয়া। লেখক ঃ কথা-সাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন