ব্রাজিল বিশ্বকাপে ফিক্সিংয়ের শঙ্কা

আপডেট : ০১ জুন ২০১৪, ২২:৩৪
ব্রাজিল বিশ্বকাপে ম্যাচ-ফিক্সিং হতে পারে। গত বিশ্বকাপ নিয়ে ফিফার এক গোপন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এমন দাবিই করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। ফিফার একটি অপ্রকাশিত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে ব্রাজিল বিশ্বকাপে ফিক্সিং নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়ে গতকাল একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে পত্রিকাটি। ২০১০ সালের বিশ্বকাপের ফিক্সিং সংক্রান্ত ঘটনার ৪৪ পৃষ্ঠার ফিফার প্রতিবেদন এবং জুয়াড়ি ও রেফারিদের প্রভাবিত করতে পারে সংশ্লিষ্ট এমন কিছু বিষয়ের ভিত্তিতে এ খবর দেয় পত্রিকাটি। এ ব্যাপারে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং ফিনল্যান্ডের কর্মকর্তারা, রেফারি, জুয়াড়ি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের সাক্ষাত্কার নেয় নিউইয়র্ক টাইমস। ‘তালিকাভুক্ত ম্যাচগুলো কী পাতানো ছিল? সম্ভাব্যতার বিচারে হ্যাঁ’—ফিফার অপ্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এমনটাই জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। গত বিশ্বকাপের সময় ফিক্সারদের এক সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। তাদের নিযুক্ত রেফারির প্রদর্শনী ম্যাচগুলো ফিক্সিং করতো। একজন অফিসিয়াল এমন ম্যাচ পাতানোর ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে মৃত্যুর হুমকি দেয়া হয়েছিল বলে জানায় নিউইয়র্ক টাইমস। একটি উদাহরণও দিয়েছে পত্রিকাটি। ইব্রাহিম কেইবু নামের নাইজারের এক রেফারি ২০১০ সালের মে মাসে পলোকওয়ানে পিটার মোকাবা স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকা-গুয়েতেমালার মধ্যকার প্রদর্শনী ম্যাচে একটি সন্দেহজনক হ্যান্ডবল দিয়েছিলেন। তার আগেই একশো ডলারের নোট সম্বলিত কয়েক হাজার ডলারের একটি ব্যাগ নিয়ে ব্যাংকে যান কেইবুকে। জানিয়েছেন অপর এক রেফারি। যদিও কেইবু ম্যাচ পাতানোর এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ওই ঘটনার পর পরই অবসরের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কেইবুকে বেছে নিয়েছিল সিঙ্গাপুর ভিত্তিক সংগঠন ‘ফুটবল ফর ইউ ইন্টারন্যাশনাল’। ফিফা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় এটি আসলে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের চক্রের প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের আগে কম পক্ষে পাঁচটি বা আরো বেশি ম্যাচ পাতানোর চেষ্টা করেছিল ফিক্সাররা। যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচসহ ১৫টি ম্যাচে জুয়াড়িদের টার্গেট ছিল বলে ফিফার রিপোর্টের বরাত দিয়ে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। ব্রাজিল বিশ্বকাপের আগ মুহূর্তে চলতি সপ্তাহে প্রস্তুতিমূলক কিছু প্রদর্শনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বেশ কিছু ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রেও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান থেকে এটা আশঙ্কা করা যেতেই পারে- এসব ম্যাচেও ফিক্সিংয়ের মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। এ ব্যাপারে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ফিফার এক মুখপাত্র বলেছেন, ২০১০ সালের বিশ্বকাপের ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে। কিন্তু টাইমস জানিয়েছে, প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও জড়িতদের বিপক্ষে কোনো ধরনের শাস্তি বা নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নেয়নি ফিফা। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে রেফারি সরবরাহের দায়িত্বে ছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানিটি। বিনিময়ে রেফারিদের তারা দক্ষিণ আফ্রিকায় সফর, বাসস্থান, খাওয়া-দাওয়া এবং ম্যাচ ফি দিতো। এর ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা ফুটবল ফেডারেশন আর্থিক সাশ্রয় হতো। তবে ম্যাচে কোম্পানিটি দায়িত্ব প্রাপ্ত রেফারিদের নিজেদের মতো করে কাজে লাগাতো। দক্ষিণ আফ্রিকা ফুটবল ফেডারেশন সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওই কোম্পানিটি পাঁচটি ম্যাচের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। ফিফা রিপোর্টে ওই চুক্তিকে অপূর্ণাঙ্গ ও হাস্যকর অভিহিত করা হয়। একই সঙ্গে ওই চুক্তির ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তারা বোকামির পরিচয় দিয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয় ফিফার রিপোর্টে। দক্ষিণ আফ্রিকা-গুয়াতেমালা প্রদর্শনী ম্যাচে ৫-০ গোলে জয় পেয়েছিল স্বাগতিকরা। ম্যাচটিতে প্রতিপক্ষের দুইটি সন্দেহজনক হ্যান্ডবলে পেনাল্টিতে গোল পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। সঙ্গত কারণেই ম্যাচের পারফরম্যান্স খতিয়ে দেখার জন্য উদ্যোগী হয় ফিফা। ম্যাচটি সম্পর্কে ফিফার প্রতিবদেনে বলা হয়েছে, ‘আমরা এটা বলতে পারি যে, বেটিং এবং দালালির উদ্দেশ্যে ওই ম্যাচটি ব্যবহূত হয়েছে।’ ওই সময় স্টিভ গডার্ড দক্ষিণ আফ্রিকা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে ভারপ্রাপ্ত রেফারির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন তিনি ফুটবল ৪ ইউ ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা-ডেনমার্কের মধ্যকার প্রীতিম্যাচের দায়িত্ব থেকে কেইবুকে প্রত্যাহারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গডার্ড। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ায় ওই ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ার সময় কোনো একজন মোবাইল ফোনে মৃত্যুর হুমকি দিয়েছিল বলে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন এই ইংলিশ ম্যান। এই ঘটনায় ফিফা বা পুলিশ কেউই এ ধরনের হুমকির রিপোর্ট পায়নি। উল্টো গডার্ড পরের দিন দক্ষিণ কোরিয়া-নাইজেরিয়া প্রদর্শনী ম্যাচেও সিঙ্গপুরভিত্তিক ওই কোম্পানিকে ম্যাচে রেফারি নির্বাচন করার অনুমতি দেয়। ম্যাচটিতে ৩-১ গোলে জয় পায় নাইজেরিয়া। ফিফার প্রতিবেদনে ম্যাচটি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ম্যাচটিতে রেফারি অনাকাঙ্ক্ষিত লাল কার্ড এবং পেনাল্টি কিক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। গডার্ড নিউ ইয়র্ক টাইমসকে আরো বলেছেন, সিঙ্গাপুরের ওই কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়ার প্রদর্শনী ম্যাচটিতে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছিল; কিন্তু এর পরিবর্তে দক্ষিণ আফ্রিকান রেফারি দিয়ে এটি পরিচালনা করা হয়।