[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

সামরিক ছোবলে থাইল্যান্ডের গণতন্ত্র

আপডেট : ০২ জুন ২০১৪, ২২:০৭
অবশেষে থাই সেনাবাহিনী আগামী একবছরের মধ্যে কোন নির্বাচন দেবেন না বলে ঘোষণা করেছে। গত ২২ মে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পর অনেকে থাইল্যান্ড ও গণতন্ত্রের মধ্যে দীর্ঘ দূরত্ব দেখতে পাচ্ছেন। অনেক বিশ্লেষক ভাবছেন দেশটির গণতন্ত্র একেবারে ধূলিসাত্ হয়ে গেল। অনেকে আবার বলছেন, গণতান্ত্রিক থাইল্যাণ্ডের পুনর্গঠনের দীর্ঘ কন্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হবে থাই জনগণকে। বাইরের থেকে দেখলে এমনই মনে হওয়ার কথা। তবে থাইল্যান্ডের গণতন্ত্রায়ণ প্রক্রিয়া অনুধাবনে থাই মডেলের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষিত হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় পূর্ব ধারণকৃত গণতন্ত্র-জ্ঞানের আলোকে থাইল্যান্ডের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলে থাইল্যান্ডের গণতন্ত্রের প্রকৃতি, পরিধি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বড় অজ্ঞতা রয়ে যাবে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যেতে পারে, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের নেপথ্যে গণতন্ত্রের বিকাশের সম্ভাবনাও লুক্কায়িত থাকতে পারে। গণতন্ত্রের একটু ধারণাগত পর্যালোচনা বিষয়টিকে সহজভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। আমরা গণতন্ত্র শব্দটিকে মূলত পুঁজিবাদী পাশ্চাত্যের মডেলে, মনোকাঠামোয় বুঝতে চেষ্টা করি। কোন দেশের গণতন্ত্রের কথা বললেই আমরা ইউরোপ-আমেরিকা,বিশেষত ব্রিটেনের গণতন্ত্রের চিত্র দেখতে পাই, তা ওয়েস্ট মিনিস্টার (Westminister) মডেলের হতে পারে, আবার মেজরিটারিয়ান (Majoritarian) মডেলেরও হতে পারে। এ দুটি মডেলের গণতন্ত্রে নির্বাচন প্রক্রিয়ার উপর বেশ জোর দেয়া হয়েছে। অর্থাত্ গণতন্ত্র শব্দটি সামনে আবির্ভূত হলে আমরা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নির্বাচিত হওয়ার ধরন নিয়ে বেশি কৌতূহলী ও উত্সাহী হয়ে উঠি। অর্থাত্ নির্বাচনই যেন গণতন্ত্রের সারমর্ম, এমন ধারণা আমরা সেই কবে থেকে অবচেতন মনোবলয়ে লালন করে রেখেছি, তা হয়ত আমরা নিজেরাও জানি না। একটা সময় ছিল, যখন গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন-নির্বাচন খেলা বুঝাতো। অর্থাত্ কোনভাবে নির্বাহী অংশকে নির্বাচিত করতে পারলেই গণতন্ত্র রক্ষা হলো বলে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হতো। সেই সুযোগে প্রায়শই কায়েমী স্বার্থচক্রে নির্বাচনের বেশভূষায় আচ্ছাদিত হয়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শোষণ-নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাতো। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ছকতাত্ত্বিকেরা (structuralists) এমন অনেক তত্ত্ব দিয়ে গণতন্ত্র ও নির্বাচনের মোড়কে শোষণ-বঞ্চনা জিইয়ে রাখার করুণ ইতিহাস লিখে গেছেন। ফুরটাডো (Furtado), ফ্যালেট্ট (Faletto), কার্দোজো (Cardoso), ফ্রাংক (Gnntter Frank), লেনিন (Lenin), ওয়ালারস্টেইন (Wallerstein) প্রমুখ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন কিভাবে গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে নির্বাচনের ঝুনঝুনি বাজিয়ে বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদীদের স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন। গণতন্ত্রের ধারণা দিতে গিয়ে দ্বিতীয় বিষয়টি যা মনে রাখা দরকার, তা হলো জনগণের স্বপ্নের বাস্তবায়নের তাগিদ। অর্থাত্ গণতন্ত্র মানে জনগণের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করার মডেল। মজার ব্যাপার হলো, গত প্রায় এক-দেড়শ’ বছর ধরে গণতন্ত্রের পাশ্চাত্য মোড়লরা নিজেদের সুবিধার জন্য গণতন্ত্রের খণ্ডিত ধারণা প্রাকটিস করেছেন। অর্থাত্ যে দেশে তারা নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়ক নির্বাচন করেছেন। সেখানকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার দিকে মনোনিবেশ করা হয়নি। আবার যেখানকার নেতৃবৃন্দের নির্বাচন করা হয়নি সেখানকার জনগণের কল্যাণের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রো-এশীয় আরব মুসলিম জাহানের রাষ্ট্র নেতারা নির্বাচিত নন বলে তাঁদের দ্বারা রাস্তাঘাট, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ অনেক নাগরিক সুবিধা অবারিত করা হয়েছে। লিবিয়া, মিশর, সৌদী আরবসহ অধিকাংশ আরব শাসকরা অনির্বাচিত, কিন্তু বিপুল জনগণের ইচ্ছের বিষয়টি তাঁরা কম গুরুত্ব দেন না। অন্যদিকে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করলেও জনগণের প্রত্যাশা পূরণের তাগিদ এখানকার গণতান্ত্রিক মডেলে থাকে না। উপরোক্ত দ্বিমুখিতা ঘিরেই গণতন্ত্রের ধারণা আবর্তিত হচ্ছে। মূলত গণতন্ত্রের ধারণায় নির্বাচনের সাথে সুশাসনের ধারণার ওতপ্রোত সম্পর্ক বিদ্যমান। এর একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি কল্পনা করা যায় না। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই আজ গণতন্ত্রের এ স্বচ্ছ মডেল ধারণ করতে যাচ্ছে। সদ্যসমাপ্ত ভারতের লোকসভা নির্বাচনে এ দু’টি অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে বিজেপির নরেন্দ্র মোদী ও কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর প্রস্তাবনা বিশ্লেষণ করে ভোট দিয়েছে ভারতীয়রা। ইরানও সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়ক নির্বাচিত করে তাদেরকে জনগণের সেবকে পরিণত করার মডেল চর্চা করে আসছে। এদিক থেকে জাপানের উদাহরণও প্রণিধানযোগ্য। থাই গণতন্ত্রের সাম্প্রতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, থাই জনগণ এমন একটি স্বচ্ছ, সুনিপুণ, জবাবদিহিমূলক, নির্মল গণতন্ত্রের অন্বেষণে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। দেশটির রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এ লক্ষ্যে নানা নীতি-কৌশল গ্রহণ করছে। থাই সেনাবাহিনী কিন্তু অতর্কিতভাবে ক্ষমতা কামড়ে ধরেনি, বরং ধীরে ধীরে সময় নিয়ে, পূর্ব ঘোষণা দিয়ে প্রথমে সামরিক আইন জারি করেছে গত ২০ মে এবং পরে ২২ মে ক্ষমতা দখল করে। থাই সেনাপ্রধান জেনারেল প্রায়থু চ্যান ওচা টিভি-বিবৃতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ ও সংবিধান স্থগিত করার ঘোষণা দিয়ে সেনাবাহিনীর ক্ষমতারোহণের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন গত ২২ মে বৃহস্পতিবার। থাইল্যান্ডের ক্ষমতাসীন দল পুয়া থাই পার্টি ও প্রধান বিরোধীদল ডেমোক্রাট পার্টি সমর্থিত বিক্ষোভকারীদের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে চলমান সংঘাতের কারণে নির্দিষ্ট বিরতিতে হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল সেনাবাহিনী। কিন্তু সরকার ও বিরোধীদল রাজনৈতিক সমঝোতায় উপনীত হতে ব্যর্থ হলে জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সুখ-শান্তি বজায় রাখার দৃপ্ত প্রত্যয় উচ্চারণ করে সামরিক ফরমান জারি করা হয়। থাই সামরিক বাহিনীর আচরণ বিশ্লেষণে একথা বলা যায় যে, রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার লক্ষ্যে সামরিক বাহিনীর যে ঐতিহ্যিক অভ্যুত্থান সংস্কৃতি প্রচলিত আছে, থাই সেনাবাহিনী সেই আচরণ প্রদর্শন করতে চায় না। রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপ-সমঝোতায় ব্যর্থ হওয়ার পর সামরিক আইন জারি করলেও সেনাবাহিনী রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুত রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের তাগিদ দেয়। গত ২১ মে বিবদমান পক্ষদ্বয়কে আর্মি অডিটোরিয়ামে আলোচনার টেবিলে আনা হয়। সেনা প্রধানের সভাপতিত্বে একাধিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক দলগুলো ঈপ্সিত সমাধান আনয়নে ব্যর্থ হয়। অগত্যা সেনাবাহিনী তাদেরকে বন্দী করে ক্ষমতা দখল করে। এরপর এক এক করে রেডিও, টিভি, নির্বাচন কমিশন প্রভৃতি স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় স্থাপনার উপর সেনা-নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। স্মরণ করা যেতে পারে, থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতাদখলের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ইতিপূর্বেও এমন নজীর দেখা গেছে। লক্ষ্য করার ব্যাপার হলো, রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ অন্যান্য অপরাধে লিপ্ত হয়ে যখন জনগণের আকাঙ্ক্ষা চুরমার করে দেয়, থাইল্যান্ডে ঠিক সেই মুহূর্তে সাধারণত সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে থাইল্যান্ড কখনো ঔপনিবেশিক শাসনে নির্যাতিত হয়নি। এখানকার সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেন থাইল্যান্ডের অভিজাত রাজা। ১৯৩২ হতে ১৯৭২ সন পর্যন্ত দেশটিতে সামরিক শাসন বহাল ছিল। ১৯৯৭ সনে থাই শাসনতন্ত্র প্রণীত হয়, যার অধীনে ২০০১ সনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে থাকসিন সিনাওয়াত্রার নেতৃত্বাধীন পার্টি বিপুলভোটে জয়লাভ করে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গণতন্ত্রের উষালগ্ন সূচনা করে। পরবর্তী মেয়াদেও এই দলের জয়ের ধারা অব্যাহত থাকে। কিন্তু টেলিকমিউনিকেশন খাতে দুর্নীতির অভিযোগে থাকসিনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করলে তিনি দেশত্যাগ করেন। অবশ্য এর অব্যবহিত পূর্বে থাকসিন সরকারকে উত্খাত করে সেনাসমর্থিত বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতায় বসানো হয়। তবে ২০১০ সালে উপর্যুপরি গণ-আন্দোলনের মুখে সেনাসমর্থিত সরকারের পতন ঘটে। ২০১১ সনের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন থাকসিনের বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু অচিরেই তাকে স্বীয় ভ্রাতার ভাগ্য বরণ করতে হয়। গত ২০১৩ সনের অক্টোবরে পার্লামেন্টে দায়মুক্তি বিল পাস করায় বিরোধীরা ইংলাক সরকারের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে তার পদত্যাগের দাবিতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তখন ইংলাক সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় সরকার গঠন করে নির্বাচনের রাজনীতির চর্চা করেন। কিন্তু জনপ্রত্যাশা তখনো সুদূর পরাহত। গত ৭ মে বিনা মেঘে বজ াঘাতের মত সাংবিধানিক আদালত কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হন ইংলাক সিনাওয়াত্রা। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও গঠন করা হয়। সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান, নির্বাচন কমিশনারসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপর বন্দীত্বের খড়গ নেমে এলো পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ সিনেট বিলুপ্ত ঘোষিত হলো এবং সংবিধান স্থগিত করা হলো। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ থাই সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলকে গণতন্ত্র বিকাশের পূর্বের প্রয়োজনীয় সতর্কীকরণ হিসেবে অভিহিত করে সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানকে নিছক সাময়িক হিসেবে বর্ণনা করেছে। আমরা একই সূরে অনতিবিলম্বে থাইল্যান্ডের পরিস্থিতি শান্ত করে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠায় থাই সামরিক বাহিনীর প্রতি উদাত্ত আহবান জানাই। লেখক : অধ্যাপক,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইমেইল:mramin [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন